প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] বন্ধুত্ব ও মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত: মানসিক ভারসাম্যহীন শিকলবন্দি কৃষিবিদ বজলুর পাশে দাঁড়িছে তার বন্ধুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: মানসিক ভারসাম্যহীন প্রায় দেড় যুগ যাবৎ শিকলবন্দি কৃষিবিদ বজলু বন্ধুদের সহায়তায় অমানবিক জীবন থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে পেয়েছেন স্বাভাবিক জীবন। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের টুংরাপাড়া গ্রামে প্রায় দেড় যুগ ধরে নিভৃত পল্লীর নির্জন একটি কক্ষে শিকলবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন সাফল্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ হতে ১৯৯৬ সালে বিএসসিএজি পাস করা একজন মেধাবী কৃষিবিদ মৃত আব্দুল মালেকের পুত্র বজলুর রহমান। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারনে প্রায় ১৮ বছর আগে জোর করে বজলুর পায়ে পরানো হয় শিকল। একটি অন্ধকার ঘরের ভিতরে উলঙ্গ শরীরে পাতলা কাপড় জড়িয়ে শিকলবন্দী বসে থাকতে দেখা যেত তাকে। মেঝের মাঝখানে পুঁতা একটি বাঁকা লোহার সাথে আনুমানিক দেড়ফুট লম্বা শিকল পায়ের সাথে লাগানো ছিল। স্বাভাবিকভাবে শোবার সুযোগ ছিল না, সারাক্ষণ বসে থাকতে হত, ঘরের মধ্যেই মলমুত্র ত্যাগ করতে হত। অযত্ন, অবহেলা আর অপুষ্টিতে শরীরে বাসা বেধেছিল বিভিন্ন রোগ বালাই, চেহারায় পড়েছিল বার্ধক্যের ছাপ। যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন এই মেধাবী ব্যক্তি। কিছু জানতে চাইলে প্রলাপ বকতেন। স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ায় নিজ পরিবারের কথাও বলতে পারতেন না। এক চরম অমানবিক জীবনের জলন্ত উদাহরণ যেন এই বজলু।

উল্লেখ্য যে, কৃষিবিদ বজলু শিকল বন্দী সংক্রান্ত বিভিন্ন শিরোনামে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রি: তারিখে দুপুরে ১৯৮৮-৮৯ ব্যাচের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহতে বিএসসিএজি অনার্স পড়ুয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোঃ শাহ কামাল খান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রকল্প পরিচালক (উপ-সচিব) মো. আতাহার হোসেন, উপ-পরিচালক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ঢাকা এ কে এম ইউছুফ হারুন, উপ-পরিচালক বিএডিসি জামালপুর রিয়াজুল ইসলাম টুটুল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম ফারুক মানিক, ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান বাকৃবি ময়মনসিংহ খাইরুল আলম নান্নু বজলুকে দেখতে যান। এক থেকে দেড় ফুট শিকলবন্দী বজলুর সাথে উপস্থিত কর্মকর্তারা কথাবলার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের অবতারনা ঘটে। তার এ অবস্থা দেখে অনেকেই কেঁদে ফেলেন।

বজলুর চিকিৎসা ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ শাহ কামাল খান। তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রায় ১৭-১৮ বছর যাবৎ দেড় হাত শিকল দিয়ে হাত পা বাঁধা অবস্থায় একটা শূন্য ঘরের মেঝেতে আবদ্ধ থেকে অমানবিক জীবন যাপন করছিল বজলু- সেই করুন পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরে তিনি জরুরী ভিত্তিতে সহপাঠিদের সাথে মিটিং করেন, বিষয়টি শেয়ার করেন এবং স্বশরীরে বজলুকে দেখতে আসেন। বজলুর করুন পরিস্থিতির কথা বর্ননা করতে গিয়ে আবেক ধরে রাখতে পারলেন না, তাঁর দু’নয়ন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোটা অশ্রু জল। অনেকেই বলেছিলেন, দীর্ঘদিনের মানসিক রোগী বজলুকে চিকিৎসা করে লাভ নেই, সে কখনও সুস্থ্য হবে না। সেই নির্মম পরিস্থিতি থেকে ওকে মুক্ত করে তারা বন্ধুরা হাসপাতালে ভর্তি করে সুচিকিৎসাসহ সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন, বজলু পায় এক নতুন জীবন, অন্ধকার ভেদ করে আশার আলো দেখেন উনি। কৃষিবিদ শিকলবন্দী বজলুর রহমানকে ময়মনসিংহ ভালুকা উপজেলা ধীতপুর টুংরাপাড়া থেকে ১ অক্টোবর ২০১৯ খ্রি: মঙ্গলবার ভোরে নেওয়ার পর ঢাকা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (শেরে বাংলা নগর) এ ভর্তি করা হয়। সে কেবিন: ৪-এ -তে থেকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মোঃ আবদুল মুহিত এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহণ করে। বজলুর রহমান পরের দিন অর্থাৎ ২ অক্টোবর ২০২০ খ্রি: তারিখে দিবাগত রাতে প্রায় ৬ ঘন্টা ঘুমায়। যার স্বাদ সে হয়তো বিগত ১৭-১৮ বছর পায়নি। ৩ অক্টোবর ২০১৯ খ্রি: তারিখে দিনের বেলায়ও ঘুমিয়ে সকলকে অবাক করে এবং আশার আলো সঞ্চার করে। তাকে নিয়মিত ঔষধ ও খাবার খাওয়ানো হয়। স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি ফলমূল ও তরল খাবারের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। তার বন্ধু ড. মোঃ শাহ কামাল খান নিয়মিতভাবে খোঁজ খবর নিতেন, সংশ্লিষ্ট ডাক্তারগণের সাথে যোগাযোগ সাপেক্ষে পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা নিতেন, বন্ধুদের সাথে সমন্বয় করে অর্থের সংস্থান করতেন এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতেন। এমনকি ড. কামাল শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ হাতে বজলুকে খাওয়ায়ে এবং সঙ্গ দিয়ে আত্মতৃপ্তি পেতেন।

বজলুর দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা চালাতে কোন সমস্যা হয়েছে কিনা সে প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারের মন্তব্যে এটুকু স্পষ্ট যে, তার অনেক দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। আমাদের বন্ধুদেরও এতে স্বদিচ্ছার কোন ঘাটতি ছিল না। তবে এতে একটা অভিনব চ্যালেন্জের সন্মুখিন হতে হয়েছিল, সেটি হলো- বজলুকে সার্বক্ষনিক দেখাশুনা করার জন্য তার তিন ভাইয়ের একজনকে হাসপাতালে রাখা। নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের avoid করার প্রবনতা লক্ষ্য করার মত। তিনিও নাছোড় বান্দা। উদ্বুদ্ধকরণসহ নরম-গরম নানা কথার মাধ্যমে এমনকি প্রশাসনের সহযোগিতায় ওদের যে কোন একজনকে পর্যায়ক্রমে বজলুর সাথে অবস্থান করাটা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বজলুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হওয়ার পর বিগত ২০/৩/২০ খ্রি: তারিখ থেকে বজলু ময়মনসিংহে ভালুকার নিজ বাড়ীতে পৌঁছে দেয়া হয় এবং তখন থেকে সে সেখানেই অবস্থান করছে। ওকে সেবা শুশ্রূষার কাজটি সুন্দরভাবে চালিয়ে যাচ্ছে ওর ছোট ভাই মোঃ হারুন অর রশিদ। দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তারের সাথে পরামর্শক্রমে ওকে যথারিতি ঔষধ ও পথ্য দেয়া হচ্ছে। ওর সার্বিক তত্বাবধায়নসহ ঔষধ ও পথ্যের জন্য ড. কামাল ও তাঁর বন্ধুরা যথারীতি খরচ বহন করে যাচ্ছেন। ওর পা অনেকখানি সোজা হলেও ‘ও’ এখনও হাটতে পারে না যা সত্যিই ব্যাদনাদায়ক। ওর চলাফেরার জন্য হুইল চেয়ার ক্রয় করে দেয়া হয়েছে। হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে পেরে ‘ও’ ভিষণ খুশি। ওর বেডরুমে এ্যাটাস্ট বাথ ছিল না, সম্প্রতি সেটি নির্মান করে দেয়া হয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতে বজলুর অবস্থা সন্মন্ধে জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, বর্তমান করোনার মহাসংকটে নিজের ও পরিবারের পাশাপাশি যার জন্য মনটা ভিষণ ব্যাকুল ও শংকিত সে আর অন্য কেউ না সে তাঁর বন্ধু বজলু। করোনার মহাসংকটে বজলুকে নিয়ে তিনি খুব টেনশনে থেকেছেন, একটা অজানা আশংকায় বুকটা দুরুদুরু কম্পমান থেকেছে, কায়মনে মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করেছেন ‘ও’ যেন ভালো থাকে, নিরাপদে থাকে। করোনাকালীন বজলুকে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়েছে। মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বজলু ভাল আছে।

বজলুর বর্তমান অবস্থা সন্মন্ধে জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, “বজলুকে দেখার জন্য সম্প্রতি ভালুকার নীজ বাড়ীতে গিয়েছিলাম। বজলুর সাথে অনেক কথা হলো। একটুকরো কাগজ ও কলম এগিয়ে দিয়ে ওকে স্বাক্ষর দিতে বললাম। ‘ও’ সুন্দর করে ইংরেজীতে ওর নাম লিখলো। ওর ছোট ভাই হারুনের সাথে বজলুর সার্বিক পরিস্থিতি জানলাম। ‘ও’ বর্তমানে ক্ষুদা লাগলে খাবার চায়, টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হলে বলে বা নিজেই যায় যা সত্যিই আশাব্যান্জক। একপর্যায়ে বজলু অত্যন্ত অবাকভরা কন্ঠে অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাকে প্রশ্ন করল, আমি কি কখনও হাটতে পারব না? ওর প্রশ্নে আমি চমকে উঠলাম, চক্ষুযুগল অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। ওর মানসিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হলেও ‘ও’ এখনও হাটতে পারে না যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। দীর্ঘদিন ছোট্ট শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে ওর এই করুন পরিনতি -পুরনো ব্যাথাটা আবারও নতুনভাবে অনুভূত হলো।

অর্থোপেডিক্স ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক পায়ের বিশেষ ব্যায়াম অব্যাহত রয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ/আতংক কমলে বজলুকে ঢাকায় নিয়ে এসে একটা প্রসিদ্ধ ক্লিনিকে ফিজিওথেরাপি প্রদান করা হবে। যাহোক, ‘ও’ এখন নিকট আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের চিনতে পারে। ওকে মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই ওর বড় মেয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকে। ওর বড় মেয়ে সিফাত ও তার দুই ছেলে এগিয়ে এলো। মেয়ে ও নাতিদ্বয়কে দেখে বজলু ভিষণ খুশি হলো, নাতিদ্বয়কে আমরা কোলে নিয়ে আদর করলাম। বজলুর মা অর্থাৎ খালাআম্মাও এগিয়ে এলেন, তিনিও ভিষণ খুশি। আমরা সবাই মিলে ছবি তুললাম- পরিবারের সবাই খুশি- এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আমার যে কি আনন্দ- তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না! বজলুর সফলতা যেন আমার সফলতা! বজলুর হাসি-কান্না-আনন্দ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া কেন যেন আমার মনের দর্পনে এক অন্যরকম প্রতিফলন ঘটায়!! জানি না, কেন? বজলু পরিপূর্ণ সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত আমি তার সাথে আছি এবং থাকব। ওর সাথে এবং ওর পরিবারের সাথে আমার এক আত্মিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ওর পরিবারকে আমার নিজের পরিবার মনে হয়। যাহোক, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ, শ্রম, সময়, উৎসাহ ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন বা করে চলেছেন। সংশ্লিষ্ট সকলকে ১৯৮৮-৮৯ ব্যাচের বন্ধুদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ও শুভ কামনা। ওর দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য সকলের নিকট দোয়া ও আন্তরিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য!!”

ড. শাহ কামাল একটি জনদরদি, পরপোকারী ও ভাল বন্ধুর নাম। এ প্রতিবেদন নিশ্চয়ই অনেক ব্যক্তিকে জনহিতকর কর্মকান্ডে উৎসাহিত করবে সেই প্রত্যাশা রইল। জয় হোক বন্ধুত্বের, জয় হোক মানবতার!!

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত