প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমিনুল ইসলাম: ছেলেমেয়েদের স্মার্ট বানাতে গিয়ে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার পথটাই বন্ধ করে দিচ্ছেন নাতো?

আমিনুল ইসলাম
এক মা তার দুই সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন। অনেকদিন ধরে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন। তিনি চান তার সন্তান দুটো আমার সঙ্গে খানিক সময় কথা বলুক। দিন কয়েক হয় দেশে এসেছি। তাই এবার আর না করতে পারিনি। তার এক ছেলের বয়স সাত-আট হবে। বড় মেয়েটির বয়স ১২-১৩ হবে। দু’জনই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। তো তারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে নিজেরা নিজেদের মাঝে কথা বলছে ইংরেজিতে। মা তার সন্তানদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছে। সন্তানরাও তার মায়ের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি বাসায়ও নিজেদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেন? না, বেশিরভাগ সময় বাংলাতেই বলি। বাসায় মাঝে মাঝে ইংরেজিতে বলি। তাহলে এখন কেন নিজদের সঙ্গে ইংরেজিতে বলছেন? কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছে না। আমি নিজ থেকেই ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছি। দেশে আসার পর থেকেই এমন দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। রেস্টুরেন্টে গেলে বাচ্চারা বাবা-মায়ের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ ফেসবুকে নিজেদের ভিডিও আপলোড দিচ্ছে ইংরেজিতে। তারা মনে করছে এটাই স্মার্টনেস।

আমি বিদেশে থাকি ১৭ বছরের ওপর। নানান দেশে থেকেছি। ঘুরে বেড়িয়েছি। কোথাও দেখিনি কেউ তাদের নিজের ভাষায় কথা বলাকে আনস্মার্ট মনে করে। এর মানে কি তারা ইংরেজি শেখে না? তারা তো আমাদের চাইতেও অনেক ভালো ইংরেজি বলে। কিন্তু ইংরেজি বলাকে তারা স্মার্টনেসের মানদÐ বানিয়ে ফেলেনি। বর্তমান বিশে^ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে টিকে থাকার জন্য আপনাকে ইংরেজি জানতে হবে। আপনি ইংরেজি শিখুন। কিন্তু তাই বলে নিজ ভাষাকে ছোট করে নিশ্চয় নয়। আপনি বাইরে বের হয়েছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। ছোট্ট বাচ্চাগুলোকে শেখাচ্ছেন- সবার সামনে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে। এই বাচ্চাটা তাহলে কী শিখছে? সে শিখছে নিজের ভাষায় কথা বলা মানে ‘ক্ষেত’ কিংবা আনস্মার্ট। এভাবে চলতে থাকলে তো একটা প্রজন্ম দাঁড়িয়ে যাবে যারা মনে করবে বাংলায় কথা বলা আনস্মার্ট। বাংলা সংস্কৃতির চর্চা করা আনস্মার্ট। তারা তো নিজ দেশে থেকে নিজদের সংস্কৃতি, নিজদের মানুষকেই ঘৃণা করবে। আমি আমার উদাহরণ দিই। আমি তো আজীবন বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি। এরপর বিদেশে গিয়ে পড়েছি। আমাকে তো আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় ইংরেজিতে কথা বলতে হয়নি। আমার ছাত্রছাত্রীরা তো ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়তে আসে। তারা তো আমার কথা বোঝে। এ জন্য তো আমাকে ইংরেজদের মতো করে কথা বলাও রপ্ত করতে হয়নি। আমি ইংরেজি বলতে পারি এবং বুঝতে পারি। সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট।

আমি যেই দেশে থাকি, তারা যেকোনো সাধারণ বাংলাদেশির চাইতে ভালো ইংরেজি বলে। কই, তাদের তো কখনো দেখনি বাইরে বের হয়ে নিজ ভাষা বাদ দিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে। তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েদের কেন আপনারা এই শিক্ষা দিচ্ছেন? এটা কোন ধরনের শিক্ষা? ইংরেজি একটু ভালো বলে কেন স্মার্ট হতে হবে? এটা কেমন স্মার্টনেসের সংজ্ঞা আপনারা নির্ধারণ করেছেন? আমি তো বরং সেই মানুষটাকে স্মার্ট বলবো, যে নিজের ভাষায় সুন্দর করে কথা বলতে পারে। সেই ভাষায় কথা বলে গর্ব অনুভব করে। নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। চর্চা করে। এই বাচ্চাগুলোকে আপনারা যে শিক্ষা দিচ্ছেন, সেই শিক্ষা একদিন আপনাদের জন্যই বুমেরাং হবে। তারা থাকবে দেশে। কিন্তু দেশে থাকা সাধারণ বাংলায় কথা বলা মানুষদের তারা ঘৃণা করবে। মনে করবে নিচু শ্রেণির মানুষ। আপনারা তো আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্মার্ট বানাতে গিয়ে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার পথটাই বন্ধ করে দিচ্ছেন। Aminul Islam-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত