প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] পুলিশের আইডি কার্ড দিয়ে বিক্রয় ডটকমে মোবাইল বিক্রির কথা বলে অর্থ হাতাতেন তারা!

সুজন কৈরী : [২] পণ্য কেনা-বেচার অনলাইন প্লাটফর্ম বিক্রয় ডটকমে বিজ্ঞাপন দিয়ে পুলিশের আইডি কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকের আস্থা অর্জনের পর মোবাইল বিক্রির কথা বলে ই-ট্রাঞ্জেকশনের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ওই চক্রের তিন সদস্যকেও গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

[৩] গ্রেপ্তার তিনজন হলেন- সোজায়েত আহমেদ শিখন, আল আমিন ও শাহিনুর রহমান বিপ্লব। তাদের কাছ থেকে ১২টি মোবাইল, ২৭৯টি সিম, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ১৬টি বুকিং বই, বুকিংয়ের ১০টি সিল, ২টি ল্যাপটপ ও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৮টি মোবাইল জব্দ করা হয়।

[৪] গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, প্রতারণার শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগী রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তভার গোয়েন্দা ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের কাছে আসে। পরে তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতারক চক্রের ওই তিন সদস্যকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা এলাকা হতে গ্রেপ্তার করা হয়।

[৫] সোমবার ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের এডিসি জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করতে প্রতারক চক্রটি দুটি অভিনব পথ বেছে নিয়েছিলো। প্রথমত পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে ক্রেতার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র পাঠানো। দ্বিতীয়ত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বুকিং স্লিপ পাঠানো। জাতীয় পরিচয়পত্র তারা প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলো। আর সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের আসল বুকিং বই টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করেছিলো। বিক্রয় ডটকমে বিজ্ঞাপন দিয়ে মোবাইল ফোন বিক্রির নামে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

[৬] চক্রের সদস্যদের ব্যবহৃত সব সিমই ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা। এসব সিম তারা বিভিন্ন উৎস ও ভাসমান সিম বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে কিনেছেন। সিম বিক্রয় প্রতিনিধিরা চক্রের সদস্যদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যেই সাধারণ মানুষের সিম রেজিস্ট্রেশনের সময় একাধিকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে রাখতেন। পরে তাদের নামে সিম তুলে প্রতারক চক্রের সদস্য আল আমিনের কাছে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করতেন। আল আমিন চক্রের মূল হোতা সোজায়েত আহমেদ শিখন ও শাহিনুর রহমান বিপ্লবের কাছে এই সিম বিক্রি করতেন ৫০০ টাকায়। এছাড়া আল আমিন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে কুরিয়ারটির বুকিং বই সংগ্রহ করতেন। প্রতিটি বইয়ের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৫ হাজার টাকা দিতেন। এ বইয়ের জন্য তিনি সোজায়েত ও শাহিনুরের কাছ থেকে নেন ৩৮ হাজার টাকা।

[৭] ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা সিম দিয়ে জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুলতো চক্রের সদস্যরা। ওই জিমেইল ও ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা ফোন নম্বর ব্যবহার করে বিক্রয় ডটকমে অ্যাকাউন্ট খুলতো। বিভিন্ন সময় ৭২০টি ভুয়া জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুলেছে এ চক্র। বিক্রয় ডটকমে বিভিন্ন মোবাইল ফোনের ছবি আপলোড করে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতো। এসব পোস্ট দ্রুত ও বেশি প্রচারের উদ্দেশ্যে ওই প্রতিষ্ঠানকে পোস্টপ্রতি ২০৯ টাকা দেওয়া হতো অধিক প্রচারের তালিকায় রাখতে।

[৮] প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রতারনার কাজে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে পুলিশ সদস্যদের ৩ থেকে ৪ জনের আইডি কার্ড সংগ্রহ করেছিলো। তাছাড়া বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট ও এ্যাপস দিয়ে এনআইডি জেনারেট করতেন। ভুক্তভোগীরা একের অধিক রির্পোট করলে বিক্রয় ডটকম পোস্ট ডিলিট করে দিতো এবং অনেক সময় নিজেরাই পোস্ট ডিলিট করে দিতো।
ক্রেতার কাছে চক্রের সদস্যদের কেউ পুলিশ সদস্য সাজতো, কেউ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয় দিতেন। ফলে প্রতারকরা দ্রুত কাস্টমারদের সাড়া পেতেন। কাস্টমাররা প্রতারকদের পোস্টের ইনবক্সে মোবাইল কেনার জন্য আগ্রহ জানালে বিস্তারিত যোগাযোগের জন্য প্রতারক চক্রের সদস্যের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা সিমের নম্বর দিতো এবং ওই নম্বরের ইমোতে যোগাযোগ করতে বলতো। মোবাইল হস্তান্তরের মাধ্যম হিসেবে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস ও টাকা লেনদেনের জন্য ই-ট্রাঞ্জেকশন ব্যবহার করার কথা কাস্টমারকে জানাতো। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মোবাইল পাঠানোর আগে ই-ট্রাঞ্জেকশনের মাধ্যমে মোবাইল মূল্যের ৫০ শতাংশ টাকা অগ্রিম দিতে হবে ও বাকি ৫০ শতাংশ টাকা মোবাইল পাঠানোর জন্য সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে বুকিং দেওয়ার পর বুকিং স্লিপ দেখানোর পর পরিশোধ করতে হবে বলে জানাতো।

[৯] অগ্রিম টাকা পাঠানোর প্রস্তাবে রাজি না হলে কাস্টমারের বিশ্বাস অর্জনের জন্য নিজেকে পুলিশ দাবি করতো ও ইমো মেসেজ ইনবক্সে পুলিশের আইডি কার্ডটি পাঠাতো। ফলে কাস্টমাররা মোবাইলের মূল্যের ৫০ শতাংশ টাকা ই-ট্রাঞ্জেকশনের মাধ্যমে অগ্রিম দিতো ও মোবাইল পাঠানোর জন্য তাদের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ইমোতে দিতো। এরপর মোবাইল মূল্যের বাকি ৫০ শতাংশ টাকা আত্মসাৎ করার জন্য তারা অসৎ উপায়ে কুরিয়ার সার্ভিসের বুকিং বই ব্যবহার করে কাস্টমারের দেওয়া নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ইত্যাদি লিখে প্রতারক চক্রের তৈরি করা কুরিয়ার সার্ভিসের সিলমোহরযুক্ত একটি বুকিং স্লিপ তৈরি করতো। ওই স্লিপে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের যোগাযোগ নম্বর হিসেবে প্রতারক চক্র সদস্যদের ভুয়া নিবন্ধিত সিম নম্বর দিতেন। কাস্টমারের আরও বিশ্বাস অর্জনে ওই সিম থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি সেজে প্রতারক চক্রের সদস্যরাই কথা বলতেন। কাস্টমাররা বুকিং স্লিপে দেওয়া নম্বরে কল করে তার বুকিং বিষয়ে আবারও নিশ্চিত হওয়ার পর মোবাইলের মূল্য বাবদ বাকি ৫০ শতাংশ টাকা ই-ট্রাঞ্জেকশনের মাধ্যমে পাঠাতেন ক্রেতা।

[১০] সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও পার্শেল না পাওয়ায় বুকিং স্লিপে উল্লিখিত নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কাস্টমাররা সেটি বন্ধ পেতেন। পাশাপাশি বিক্রয় ডটকমে পোস্টদাতার মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পেতেন ক্রেতারা। ভুক্তভোগীরা একের অধিক রিপোর্ট করলে বিক্রয় ডটকম পোস্ট ডিলিট করে দিতো। অনেক সময় নিজেরাই পোস্ট ডিলিট করে দিতো চক্রটি। এরপর ভুক্তভোগী ক্রেতারা বুঝতে পারেন যে তারা প্রতারিত হয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত