প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: ‘অপূর্ববাবু’

ড. সেলিম জাহান
‘অপূর্ববাবু’, চেঁচিয়ে উঠে সিরাজ- সলিমুল্লাহ হলে আমার ৩৩ নম্বর কক্ষের পার্শ্ববর্তী ৩৫ নম্বরের কক্ষবাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সিরাজুল ইসলাম। সিলেটের বাসিন্দা সে। গত সপ্তাহে হলের মাঠে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ দেখানোর পরে এ নামেই ডাকছে সে আমাকে- ছবির ‘অপুর’ বাড়িওয়ালার সেই সংলাপ ‘কথা তো বহু কিছুই থাকে না, অপূর্ববাবু’ নকল করে। অমন করে আমাকে ডাকার পেছনে সিরাজের যুক্তি ছিলো দু’টো- [এক] আমার কথা নাকি ‘অপুর সংসারের’ অপুর মতো পরিশীলিত এবং [দুই] আমার চেহারা নাকি অপুর মতো। পুলকিত হয়েছিলাম শুনে এবং অস্বীকার করবো না, আমার অহমও স্ফীত হয়েছিলো। আহা! অহম স্ফীতিরই তো বয়স সেটা। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই যে সেই প্রথম আমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত কোনো ছবি দেখি। সত্যজিতের ছবি সম্পর্কেও একই কথা- সেই প্রথম সত্যজিতের ছবিও দেখি। আসলে আমার শৈশব-কৈশোর ছিলো উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবিতে ঠাসা। বরিশাল শহরে তাঁদের অভিনীত ছায়াছবিই আসতো বেশি- ‘সবার উপরে’, অগ্নি-পরীক্ষা, ‘হারানো সুর, ‘শিল্পী’, ‘শাপমোচন’, পথে হলো দেরী’ কোনটা রেখে কোনটা বলি। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের কারণে কলকাতার ছবি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসা বন্ধ হলে সেই সূত্র ছিন্ন হয়ে যায়।

কিন্তু ষাটের দশকে সৌমিত্র অভিনীত কোনো ছবি না দেখলেও তাঁর সম্পর্কে জানতাম নানান সিনেমা পত্রিকার কল্যাণে। সৌমিত্রের ছবি ও লেখা দেখতাম সেখানে এবং সেই সঙ্গে সত্যজিতের ওপরে লেখা পড়লেই দেখা পেয়েছি সৌমিত্রের- নামে, ছবিতে, বিশ্লেষণে। ফলে একদিকে যেমন ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপুর সংসার’, ‘চারুলতার’ সঙ্গে পরিচয়, তেমনি নাম জেনেছি শর্মিলা ঠাকুর, মাধবী চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৭২ এ ‘অপুর সংসার’ দেখার পরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আমার মনজুড়ে বসলেন তাঁর উজ্জ্বল বিদগ্ধতা, সংযত কিন্তু সংহত অভিনয়সৌষ্ঠব, স্বাভাবিক ভাবভঙ্গি, পরিশীলিত নিঁখুত উচ্চারণের কারণে। শিশির ভাদুড়ীর কাছে তালিম পাওয়া সৌমিত্র তাঁর গুণাবলীকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে গেলেন। যৌবনে নিজেকে অনেকটা সৌমিত্রের মতোই গড়ে তুলতে চাইতাম- কথা-বার্তা, চলনে-বলনে। তাঁকে আমার নায়কের চাইতেও বেশি অভিনেতা বলে মনে হতো। সৌমিত্রের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পরে আর পেছন ফিরে তাকাইনি- দেখে গেছি একের পরে এক তাঁর অভিনীত ছবি।

ছায়াছবি ‘চারুলতা’ দেখে অভিভ‚ত হয়েছি- তুলনা করেছি গল্প ‘নষ্টনীড়ের’ সঙ্গে। ‘ঘরে-বাইরেতে’ সন্দীপের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়েছি। ‘অরন্যের দিনরাত্রি’ দেখে মোহাবিষ্ট ছিলাম। অশনিসংকেত’ দেখে সৌমিত্রকে গঙ্গা পÐিত ভিন্ন অন্য কিছু ভাবতে পারিনি। ‘সোনার কেল্লার’ ফেলুদা’কে ভালোবেসেছি। ‘বেলা-শেষে’র সৌমিত্রকে দেখে মন যেন কেমন করে উঠেছে। সৌমিত্রের আবৃত্তি আমার ভালো লাগতো, কিন্তু সে আবৃত্তির আমি ভক্ত ছিলাম না। রবীন্দ্রনাথের নানান কবিতার আবৃত্তি আমি তাঁর কণ্ঠে শুনেছি। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্র কবিতার পাঠ আমার কাছে কিছুটা প্রাচীনপন্থি বলে মনে হতো। কিন্তু তাঁর নিঁখুত পরিশীলিত উচ্চারণ ও স্বরক্ষেপণ আমার কাছে অপূর্ব মনে হতো। তাই ‘শেষের কবিতায়’ অমিত রায় হিসবে তাঁকে ছাড়া আর কাউকেই ভাবতে পারি না। লেখক হিসেবেও সৌমিত্র সার্থক। তাঁর লেখা আমার ভালো লাগে। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখা, সমাজ-সংসারের বিশ্লেষণ, সাহিত্যবিষয়ক লেখা আমাকে আকৃষ্ট করে ভীষণভাবে। চলচ্চিত্র বিষয়েও লিখেছেন অনেক তিনি। জানি ‘নক্ষত্রদেরও চলে যেতে হয়’। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও তার ব্যত্যয় নন। তিনদিন আগে ১৫ নভেম্বর তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী বড় যেন নীরবে চলে গেলো। শোনা যায়, ‘একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর’ এবং সেই সঙ্গে এও মানি যে, প্রতিদিন আমার হৃদয়ের আঙ্গিনায় তাঁর ‘নিত্য আনাগোনা’ ঘটবে না। কিন্তু এটা নিশ্চিত জানি যে, প্রথম যৌবনে পরিচিত হওয়া ‘অপূর্ববাবু’ চিরকাল আমার চিন্তা-চেতনায় অপূর্বভাবেই বিরাজ করবেন।
লেখক : অর্থনীতিবিদ

সর্বাধিক পঠিত