প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান মাহবুব: ঢাকার সিনেমা হলের কোনো একটা যুগের অবসান ঘটছে

হাসান মাহবুব: মিরপুরের সবচেয়ে পশ জায়গা সম্ভবত এখন সনির আশপাশটা। ওখানে এখন সিনেপ্লেক্স, পিজ্জা হাট, কেএফসি, বার্গার কিং, ওপাশে আড়ং, সুপ্রিম ডাইনার্স! সিনেপ্লেক্সে এখনও যাওয়া হয়নি। এই সপ্তাহেই হয়তো যাবো রেহানা-মরিয়ম-নূর দেখতে। এর আগে সনি সিনেমা হল ছিলো যখন, তখন সেখানে সিনেমা দেখেছিলাম তিনটি। শাবনূর, ওমর সানির প্রেমের অহংকার, সুবর্ণা মুস্তফার রাক্ষস, আর মান্না-মুনমুনের রাজা নাম্বার ওয়ান।

প্রেমের অহংকার দেখার কাহিনিটা মজার। তখন আমি নয় ক্লাসে পড়ি। দুপুরবেলায় সবাই মিলে নিয়ম করে রেডিওতে গানের অনুষ্ঠান শুনি। তো সেদিন দুপুরে রেডিওতে সিনেমার গান শুনতে শুনতে হঠাৎ সবার ইচ্ছা হলো একটা বাংলা সিনেমা হলে গিয়ে দেখে আসলে কেমন হয়! তখন আমরা, মানে কাজিনরা আর দুলাভাই মিলে গেলাম সিনেমা দেখতে। জাহিদ ভাই (দুলাভাই) সবাইকে দেখালেন সিনেমা। সিনেমার কাহিনি তেমন কিছু মনে নেই, তবে মনে আছে শাবনূরকে অসম্ভব সুন্দর লেগেছিলো ওখানে। তখন থেকেই শাবনূর আমার প্রিয় নায়িকা। আর বেচারা ওমর সানি, তাকে লাস্টে কী কারণে যেন এক বোতল সায়ানাইড খাইয়ে দেয়া হয় হত্যা করার জন্য। কিন্তু তাও সে বেঁচে যায়। দৃশ্যটা আমাদের মধ্যে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিলো।
‘রাক্ষস’ রানা ভাইয়ার সাথে এক সন্ধ্যায় হুট করে দেখতে যাওয়া। আমার নানুবাড়ি থেকে একটু হাঁটলেই সনি হল। সেখান থেকে গিয়েছিলাম ম্যাটিনি শো দেখতে। রাক্ষসী ছিলো গ্রাম থেকে শহরে আসা সুবর্ণা মুস্তফার সংগ্রামের গল্প। সেখানে একটা সিনে সুবর্ণাকে যখন শহুরে ভাবীরা অপমান করছিলো, তখন সে শুদ্ধ ইংরেজিতে জবাব দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিলো। সেই সময় দর্শকের সে কী তুমুল করতালি!

রাজা নাম্বার ওয়ান যখন দেখতে যাই তখন আমি লায়েক হয়েছি। খুলনায় পড়ালেখা করতে গেছি তখন। ছুটিতে ঢাকায় এসেছি। শুনলাম মুনমুন অভিনীত রাজা নাম্বার ওয়ান সিনেমাতে নাকি বিশেষ কিছু দৃশ্য আছে। তাই একাই চলে গেলাম দেখতে। না, তেমন কিছু ছিলো না। তবে মুনমুনকে খুব ভালো লেগেছিলো। কাটপিস যুগের নায়িকাদের মধ্যে মুনমুন আমার ফেভারিট ছিলো। তার সঙ্গে মেহেদী নামক এক নায়কের নাচগুলোর জন্য অপেক্ষা করতাম।

সনি হলের পাশেই ছিলো সনি মার্কেট। সেখানে কিছু ক্যাসেটের দোকান ছিলো, আর ছিলো প্রচুর ভিডিও গেমস খেলার দোকান। দুই টাকা কয়েন। তিন কয়েন পাঁচ টাকা। দশ টাকা দিলে পুরা গেম। আমাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য দেওয়া হতো ত্রিশ টাকা রিকশা ভাড়া। আমি মাঝেমধ্যে হেঁটে সনিতে গিয়ে পুরো টাকা দিয়ে সারাদিন ভিডিও গেম খেলে চলে আসতাম। যারা ভিডিও গেমগুলো বানিয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবনত হয়ে যেতাম। মাত্র দুই টাকা দিয়ে এই অসাধারণ আনন্দের অনুভূতি পাওয়া যাচ্ছে, মনে হতো যে আমার প্রতি তারা দয়া করছেন!

দুই টাকার দিন শেষ। এখন চড়া দামে আনন্দ কিনতে হয়। সনি হল এখন অতীত। তারপরেও যখন রিকশাওলাকে বলবেন, আপনার গন্তব্য, সনি হলই বলতে হবে। তারা কেএফসি অথবা সিনেপ্লেক্স চিনবে না। এই যেমন এখন শ্যামলী হল ভেঙে শ্যামলী স্কয়ার হয়ে গেছে, কিন্তু বাস থেকে নামার সময় আপনাকে ‘হল শ্যামলী’তেই নামতে হবে! এশিয়া হলে বহুদিন ধরে সিনেমা আসে না। ওটা নিয়েও নিশ্চয়ই মালিক ডিপজল ভায়ার কোন পরিকল্পনা আছে। সিনেমা হলের আসলে কোথাও কোনো ভবিষ্যত নেই। বিশেষ করে ঢাকা শহরে তো একদমই নেই।

ঢাকার সিনেমা হল নিয়ে আমার তেমন কোনো স্মৃতি নেই, কাতরতাও নেই। তারপরেও কোনো একটা যুগের অবসান ঘটছে, নতুন এসে সব দখল করে নিচ্ছে, এই পালাবদলের মধ্যে যে বিষণ্নতার সুর বাজে, সেটায় আমি নিজেকে কিছুটা নিমজ্জিত হতে দিতে আপত্তি করবো না একদম। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত