প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মনজুরুল হক: পাকিস্তানের পরাজয়ের পোস্টমর্টেম

মনজুরুল হক: ‘এই পাকিস্তানকে হারানো প্রায় অসম্ভব: রমিজ রাজা’। সেমিফাইনাল হারলো পাকিস্তান, আর করাচি-লাহোর ছাপিয়ে কান্নার রোল উঠলো কারওয়ানবাজার ও বসুন্ধরায়। ক্যায়া আজিব কিসিম কা গারিব বাৎ ইয়ে। কারওয়ানবাজার শিরোনাম করলো, ‘ওয়েডের ব্যাটে পাকিস্তানের হৃদয় ভাঙলো অস্ট্রেলিয়া’ এবং ‘সেই ক্যাচ ছাড়াতেই হেরেছে পাকিস্তান।’ এই যে তারা পাকিস্তানের হৃদয় ভাঙা নিয়ে শোকে মুহ্যমান, পাকিস্তানিরা কিন্তু ততোটা নয়, জুনিয়র দর্শকরাও বললো, ‘পাকিস্তান যে সেমিফাইনালে ওঠেছিলো সেটাই অনেক কিছু’। তার মানে পাকিস্তানি দর্শকরাও জানতো খুব ভালো কিছু নয়, কয়েকটা ‘হ্যাপেন্স’ একসঙ্গে ক্লিক করেছে। আর তাতেই পাকিস্তান সেমিতে। বাবর আজম হাসানের ক্যাচ ছাড়াকে দায়ী করলেও সেটাই একমাত্র কারণ বললেন না, সেখানে এই বদলে দেওয়া কাগজটি ‘সেই ক্যাচ ছাড়াতেই হেরেছে পাকিস্তান।’ বলে ক্ষান্ত হলো না, হাসনের ক্যাচ ছাড়ার ছবি দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলো, ‘তুই ব্যাটাই পাকিস্তানকে কাঁদালি’। তাদের একবারও মনে হলো না ৪১ বছর বয়সী ‘প্রফেসর’ সাহেব দুই ড্রপে বল করায় ১ বল থেকেই ৯ রান আসে। শোয়েব মালিক ১ রানকে ২ বানিয়ে দেয়।

আর বসুন্ধরা পাড়ায় শিরোনাম হলো- ‘পাকিস্তানকে কাঁদিয়ে ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া’, যোগ করলো খুচরা খবর-‘শঙ্কা কাটলো, আজ খেলবেন শোয়েব-রিজওয়ান’, ‘রিজওয়ান-ফখরের ব্যাটে পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর’, ‘পাকিস্তানের শুভ সূচনা’, ‘পাকিস্তান ফাইনালে ওঠলে দুবাই যাবেন ইমরান খান’, ‘ইনশাআল্লাহ ফাইনাল খেলবো: হেইডেন। ‘এই পাড়ায় আজ কবরের নিস্তব্ধতা। স্টেপ বাই স্টেপ শিরোনাম দেখলেই বোঝা যাচ্ছে তারা ধরেই নিয়েছিলেন-পাকিস্তান ফাইনালে। সঙ্গে ৯২ সালে ট্রফি জয়ী ইমরানের একটা ছবিও দিয়েছে। ‘শঙ্কা কাটলো, আজ খেলবেন শোয়েব-রিজওয়ান’। আহা! যেন এই দু’জন খেলতে পেরেছে বলে আর কোনো শঙ্কা নেই। এখনেই শেষ নয়। দেশের একমাত্র স্পোর্টস চ্যানেলের সাংবাদিক পাকিস্তান সমর্থকদের সাক্ষাৎকার নিলো ১০ মিনিট ধরে। একপর্যায়ে ‘চাচা’খ্যাত সেই পরিচিত বয়স্ক ফ্যানের কাছে অনুভূতি জানতে চাইলে চাচা দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘হামলোগ ইন্ডিান য্যায়সি রোতি নেহি। খোদাকি ফজলমে বাচ্চালোগ আচ্ছে খেলা, হার গিয়া তো ক্যায়া হুয়া?’ এই যে ‘ইন্ডিয়ানদের মতো আমরা কান্নাকাটি করি না’, এই কথাটিই দরকার ছিলো চ্যানেলটির। এটুকু পেয়ে তাদের বিমলানন্দ। ভাবখানা ‘জগতে যে জেতে জিতুক, ইন্ডিয়া যেন না জেতে।’

এবার যৎসামান্য ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা: ১৭৬ রান দুবাইয়ের পিচে ডিফেন্ড করার মতো সন্দেহ নেই। পাকিস্তান প্রথম ওভারে অ্যারন ফিঞ্চকে তুলে নিয়ে আঁটোসাঁটো বোলিং করে সে পথে ছিলোও, কিন্তু ‘ক্রিকেট ইজ আ ফানি গেম’, বিশেষ করে শর্টার ভার্সন ক্রিকেট, যেখানে একটা ওভারই ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারে। কারওয়ানবাজার আর বসুন্ধরা পাড়া দুটো সেই টাস্ক নিতে শেখেনি। শিখলে বলতে পারতো- ‘ডেভিড ওয়ার্নার আউট ছিলো না, আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে ফিরে গেলেন। রিভিউ নিলেন না, কারণ ব্যাটের জয়েন্টে খুট করে শব্দ হয়েওছিলো। তিনি মনে করলেন এজড। পরে দেখা গেলো ব্যাটে লাগেইনি।’ আবার পাকিস্তান ইনিংসের সময় তৃতীয় ওভারেই বাবরের ক্যাচ ছাড়লো দুর্দান্ত ফিল্ডারখ্যাত ওয়ার্নার। আরও একবার একটু কঠিন ক্যাচ ছাড়লো অ্যাডাম জাম্পা। ম্যাথু ওয়েডও একটা এজড-ক্যাচ মিস করলো। এতো সব না হলে পাকিস্তান ১৫০ এর কাছাকাছিতে শেষ হতে পারতো।

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ভুল একটা মিডিওকার বোলারকে ‘আনপ্লেবল’ ধরে নেওয়া। ভারতের দুই ব্যাটিং স্তম্ভ রাহুল আর রোহিতকে তুলে নিয়ে ম্যাচ জেতানোর পর থেকেই শাহীনকে বিশাল মাপের বোলার মনে করেছে তারা। শুধু তারা কেন, অনেকেই মনে করেছিলো। আসলে তো সে এক্সপেরিয়েন্সলেস মিডিওকার। বড় ম্যাচে সবচেয়ে দরকার এক্সপেরিয়েন্স আর টেম্পারামেন্ট। এই ছেলে নতুন বলে ভালো ইনস্যুইং পায়। খুব ভালো ইনস্যুইং ইয়োর্কার দিতে পারে। সমস্যা হলো সেটা কাদের বিরুদ্ধে কাজ করে আর কখন করে? এই সূত্রটাই বাবর আজম বুঝতে পারেননি। খেয়াল করলে দেখা যাবে ভারতের প্রথম দুই উইকেট নেওয়ার পরে আর কোনো ম্যাচেই সে ভালো করেনি। এমনকি অখ্যাত দল দুটোর বিরুদ্ধেও নয়। কারণ বাম হাতির বিরুদ্ধে তার ইনস্যুইং ইয়োর্কার আউটস্যুইং হয়ে যায়। ফলাফল-ব্যাট ছোঁয়ালেই থার্ডম্যান, গালি বা কাভার দিয়ে চার এবং সে ডেপথ ওভারে ভালো করে না। কারণ তখন স্যুইং পায় না।

বাবর আজমের আরও বড় ভুল ১৯তম ওভারটা শাহীনের জন্য তুলে রাখা। হাফিজ ১ বলে ৯ রান দিলেও তাকে দিয়ে ১৮ কিংবা ১৯ নম্বর ওভার করাতে পারতো। বাবরদের কাছে ‘ইসলাম ধর্ম’ শিখতে চাইলেও ম্যাথু হেইডেন তাদের ম্যাথু ওয়েড সম্পর্কে বলেনি। তাই তারা ওয়েডকে রিড করতে পারেনি। মিরপুরে যারা ওয়েডের ব্যাট দেখেছেন তাদের মনে আছে নিশ্চয়ই তার শাফল করে অফে চলে গিয়ে লেগস্ট্যাম্পে বোল্ড হওয়া। লেগ গালিতে লোপ্পা ক্যাচ দেওয়া। আফ্রিদী তাকে আউটস্যুইং ইয়োর্কার দিতে চেয়েছে। সে শাফল করে স্ট্যাম্প ছেড়ে লেগ সাইডে ফ্লিক করেছে। আর যে বলটা স্ট্রেইট ৬ মেরেছে সেটা গুডলেংথের বল। ডেপথ ওভারে লেংথে বল দিলে তার রেজাল্ট এটাই হবে। যে দুটো ৬ সে স্কুপ করে মেরেছে সেই দুটো বলই অফ-অফের বাইরের বল। শেষেরটা তো ফুলটস। এরকম মোটা মাথার বোলারকে কীভাবে খেলতে হয় সেটা চরম প্রফেশনাল ওয়েড দেখিয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া লিগে ওয়েড ওপেনার। হাসানের ক্যাচ ছাড়া অবশ্যই দায়ী, কিন্তু ওই ক্যাচে ওয়েড আউট হলেও প্রান্ত বদলে স্টয়নিস স্ট্রাইকে যেতো। নামতো কামিন্স। হয়তো যে কাজটা ওয়েড করেছে সেটাই স্টয়নিস করে দিতো। কারণ তারও ডেপথ ওভারে ৬ মারার রেকর্ড আছে। দিন শেষে বাবর আজমের আনাড়ি ক্যাপ্টেনসি, বাজে ফিল্ডিং, মালিক-হাফিজের রেকলেস শটে আউট হওয়া এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে পেশাদারিত্বহীন ক্রিকেটের কারণেই পাকিস্তান হেরেছে। আর এর উল্টোটা অস্ট্রেলিয়া। ১ রানে ক্যাপ্টেনকে হারিয়েও পেশাদারিত্ব ছাড়েনি। শেষ করি ইমরান খানের কমেন্ট দিয়ে- ‘আহত বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে তোমরা’। তো আহত বাঘ আর কতো শিকার করবে? আহত-ক্লান্ত হয়ে একসময় জিভ বের করে হাঁপাতে থাকবে। লেখক ও ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট

সর্বাধিক পঠিত