প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান: জাপানি ভিসা -৩ ইনঞ্জিনিয়ার/আন্তর্জাতিক ব্যবসা (Engineer/ Specialist in Humanities/ International Services) ভিসা

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান: জাপানে যে সকল বিদেশি স্থায়ী/অস্থায়ী চাকরি করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিদেশি এই ইনঞ্জিনিয়ার/আন্তর্জাতিক ব্যবসা (Engineer/ Specialist in Humanities/ International Services) ভিসায় নিয়ে বসবাস করে। এটি জাপানের সাধারণ শ্রেণির একটি চাকরি ভিসা। জাপান সরকার বিদেশী নাগরিকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বসবাসের জন্য বিভিন্ন ধরণের ভিসা প্রদান করে থাকে। এদের মধ্যে ইনঞ্জিনিয়ার/আন্তর্জাতিক ব্যবসা (Engineer/ Specialist in Humanities/ International Services) ভিসা হচ্ছে অন্যতম।

এই ভিসা প্রাপ্ত বিদেশিরা জাপানের সকল নাগরিক সুবিধা ভোগ করে থাকে এবং একটা নিদিষ্ট সময়ের পরে এরা জাপানের নাগরিক কিংবা স্থায়ী বসবাসের জন্যও যোগ্য হয়ে যায়। বিদেশীরা জাপানের সরকারী/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয়/বিদেশী কোম্পানিতে চাকুরীরত আবস্থায় এই ভিসা পেয়ে থাকে।

কোনো বিদেশি জাপান অথবা জাপানের বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী কিংবা ডিপ্লোমা ডিগ্রী নিয়ে কোন সরকারি/বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী পেলে তাদের এই ভিসা দেয়া হয়। এই ভিসাকে গোলআলু সাথে তুলনা করলেও মন্দ হবে না। কারণ গোলআলু যেমন মাছ, মাংস থেকে শুরু করে সকল তরকারিতে ব্যাবহার করা যায় তেমনি এই ভিসা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, পরামর্শক, মার্কেটিং, বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী পেশার জন্য এই ভিসা কার্যকর। জাপানে স্থায়ী বসবাস কিংবা চাকুরীর জন্য এই ভিসা অনেক কমন এবং অনেকটা নিরাপদও বটে।

২০১৩ সালে আমি যখন প্রথম জাপানের একটা কোম্পানিতে চাকুরী পাই তখন আমি ৫ বছরের জন্য এই ভিসা পাই । এটাই আমার জাপান জীবনের প্রথম ৫ বছরের ভিসা। পরে অবশ্য আমি এই ভিসা থেকে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা (High Skilled Professional) ভিসায় পরিবর্তন করি। জাপানে প্রবেশের পর সকল বিদেশীদের ভিসা থাকে একটি কার্ডে। এই কার্ডে জাপানে বসবাসের ভিসার মেয়াদ, ভিসার ধরণ, জাতীয়তা, বর্তমান ঠিকানা, এবং তার ভিসা কি ধরণের কাজের জন্য প্রযোজ্য সবই লেখা থাকে। একে জাইরিয়ু কার্ড বা বসবাসের (রেসিডেন্স)কার্ড বলে। জাপানে বসবাসরত অবস্থায় সকল বিদেশীদের এই কার্ড দেয়া হয় এবং পরিচয় পত্র হিসেবে ব্যাবহার করা হয়।

যেমন, মোবাইল ফোন কেনা, বাড়ি ভাড়া নেয়া, গাড়ি ভাড়া করা, ইত্যাদি সাধারণ কাজে বাংলাদেশর জাতীয় পরিচয় পত্রের মত ব্যাবহার করা হয়। বিদেশীদের এই কার্ড সর্বসময় সাথে রাখা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ জাপানের পুলিশ যে কোন সময় যে কোন বিদেশীর কাছ থেকে এই কার্ড দেখতে চাইতে পারে। বিশেষ করে টোকিও সহ বড় শহরগুলোতে অনেক সময় সাদা পোশাকের পুলিশ বিদেশীদের কাছে এই কার্ড দেখতে চায়। আমি যখন ছাত্র ছিলাম একবার একটা গবেষণা মিটিং এ টোকিও এসেছিলাম তখন একজন সাদা পোশাকের একজন পুলিশ আমার কাছে এই কার্ড দেখতে চেয়েছিল। উল্লেখ্য যদি কোন বিদেশী এই কার্ড সাথে না রাখে তাহলে জাপানের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

যাই হোক, যদি কেউ জাপান থেকে কিংবা জাপানের বাইরে থেকে এই ইনঞ্জিনিয়ার/আন্তর্জাতিক ব্যবসা (Engineer/ Specialist in Humanities/ International Services) ভিসার জন্য আবেদন করতে চান তাহলে তাকে কি করতে হবে সেই বিষয় নিয়ে কথা বলি। প্রথমেই আপনাকে জাপানের সরকারী / বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠান, কিংবা কোন কোম্পানি থেকে স্থায়ী অথবা খণ্ডকালীন কাজের (চাকুরীর)জন্য নিয়োগ পেতে হবে। আপনি যেই প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োগ পত্র পাবেন সেই প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ পত্র, আপনার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সকল কাগজ পত্র সহ জাপানের ইমিগ্রেশন এবং স্থানীয় দুতাবাসে এই ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আপনার এবং আপনাকে নিয়োগ দেয়া প্রতিষ্ঠানের কাগজ পত্রে কোন ভুল কিংবা মিথ্যা তথ্য না থাকলে আপনি এই ভিসা পেয়ে যাবেন। যদি আপনি জাপানের বাইরে থেকে এই ভিসার জন্য আবেদন করতে চান তাহলে প্রথমে আপনাকে নিয়োগ দেয়া প্রতিষ্ঠান আপনার পক্ষে জাপানের ইমিগ্রেশনে COE(Certificate of Eligibility)এর আবেদন করবেন এবং সাধারণত একমাসের কাছাকাছি সময়ে এই ভিসার COE(Certificate of Eligibility)হয়ে যায়। এরপর জাপানের ইমিগ্রেশন থেকে পাওয়া COE(Certificate of Eligibility) এর মূলকপি সহ স্থানীয় জাপান দুতাবাসে নিয়োগ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ পত্র, আপনার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সকল কাগজ পত্র সহ আবেদন করলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভিসা হয়ে যাবে।

আবার আপনি যদি আগে থেকেই জাপানে ছাত্র (College Student) ভিসা কিংবা অন্য কোন ভিসায় নিয়ে বসবাস করে থাকেন তাহলে আপনার জন্য নতুন করে COE(Certificate of Eligibility) করতে হবে না। আপনাকে জাপানের ইমিগ্রেশনে ইনঞ্জিনিয়ার/আন্তর্জাতিক ব্যবসা (Engineer/ Specialist in Humanities/ International Services) ভিসা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে হবে। এই আবেদন করার সময় আপনি যেই প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়োগ পত্র পেয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ পত্র ও আপনার যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার সকল কাগজ পত্র সহ জাপানের ইমিগ্রেশনে ভিসা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে হবে। জাপানের ইমিগ্রেশন আপনার এবং আপনার নিয়োগ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাগজ পত্র যাচাই বাচাই করে ভিসা পরিবর্তন করে দেবে।

এই ভিসা আপনার এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ১ বছর, ৩ বছর, কিংবা ৫ বছর জন্য হয়ে থাকে। ভিসার মেয়াদ কত দিন হবে সেটা নির্ভর করে আপনি যেই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন তার প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা, আপনার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা এবং তার চেয়ে আরও একটা বিষয় জরুরী হচ্ছে আপনার নিয়োগের মেয়াদকাল কতদিন। যেমন আপনার নিয়োগ যদি হয় ১ বছরের জন্য সে ক্ষেত্রে আপনার ভিসার মেয়াদও এক বছরই হবে। কিন্তু যদি চুক্তির মেয়াদ নবায়নের কোন সম্ভবনা থাকে সে ক্ষেত্রে নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে ১ বছর, ৩ বছর, কিংবা ৫ বছরের ভিসা হতে পারে।

এই ভিসা প্রাপ্ত বিদেশিগণ তাদের পরিবারসহ জাপানে বসবাস করতে পারেন। এই ভিসা প্রাপ্ত বিদেশীদের থেকে জাপান সরকার সকল প্রকার ট্যাক্স, বীমা, পেনশন প্রতি মাসে তার বেতন থেকে নিয়মিত পররিশোধ করে নেয়। জাপানের ট্যাক্স, বীমা, পেনশন ইত্যাদির টাকার পরিমান নির্ভর করে তার আগের বছরের বেতনের পরিমানের উপর। যেমন কেউ মাসে ২০ হাজার ইয়েন দিচ্ছে আবার কেউ ১ লক্ষ ২০ হাজার ইয়েন দিচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে জাপানের সকল নাগরিকের জন্য একই রকম কোন পরিবর্তন নাই।

উল্লেখ্য, এই ভিসা পাওয়ার জন্য জাপানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পড়াশুনা করতে হবে এমন কোন শর্ত নেই। বিশ্বের যে কোন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে জাপানের কোন সরকারী / বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা কোম্পানি থেকে স্থায়ী অথবা খণ্ডকালীন কাজের (চাকুরীর)জন্য নিয়োগ পাবেন তারা এই ভিসা জন্য যোগ্য হবেন। এই সকল বিদেশী নাগরিক পাঁচ বছর চাকুরী করার পর জাপানের নাগরিকত্ব এবং দশ বছর বসবাসের পর একা কিংবা সপরিবারে জাপানে স্থায়ী বসবাসে(PR➡Permanent Residency) আবেদন করতে পারবেন। এতে করে সে এবং তার পরিবার সাড়া জীবন জাপানে বসবাস করতে পারবেন।

আমার আগের লেখাতেও উল্লেখ করেছি জাপানের ভিসা অন্য দেশের তুলনায় সহজ এবং সাধারণত কোন কারণ ছাড়া ভিসার আবেদন বাতিল হয় না। তাই বাংলাদেশের সকলকে অনুরোধ করব জাপানের ভিসার আবেদন করার সময় আপনার এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের (জাপানের যেই প্রতিষ্ঠানে আপনি আসবেন) কাগজ পত্র গুলো ভাল ভাবে পরীক্ষা করে নিন। প্রয়োজনে স্থানীয় দুতাবাসের কিংবা কোন অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ নিন তাহলে আপনি জাপানের ভিসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। ইনশাল্লাহ আগামীতে আবার জাপানের অন্য ধরণের ভিসা নিয়ে অলোচনা করব।

টোকিও, জাপান।

সর্বাধিক পঠিত