প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফ ভূইয়া : একটি ওভারপ্রাইসড হসপিটালিটি সেক্টরের গল্প

আরিফ ভূইয়া : বাংলাদেশের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এদেশের হসপিটালিটি সেক্টরও বড় হয়েছে। সেবার মান কোথাও কোথাও খুব ভালো হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গড়পড়তা। সেবার মান ভালো না হলেও অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি চার্জ দিতে হয় এখানে। সেদিন দেখলাম যমুনা টেলিভিশনে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, ভারত, নেপালকে নিয়ে কয়েকটি পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে এবং সেখানে বাংলাদেশ হসপিটালিটি সেক্টরকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেটির আবার পক্ষে-বিপক্ষে কয়েকটি মতামত দেখলাম। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা অনুযায়ী এদেশের হসপিটালিটি সেক্টর অত্যন্ত ব্যয়বহুল। খুব বেশি না, কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ দিই তাহলে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হবে।
[১] রেস্তোরাঁ: বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা ইনকাম থেকে আয়ারল্যান্ডের পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ৩৫ গুণ বেশি। এখানে ১০-১২ ইউরো (১০০০-১২০০ টাকা) দিয়ে খুব ভালো মানের রেস্তোরাঁয় পেট পুরে খাওয়া যায়, ৫-৭ ইউরোতেও (৫০০-৭০০ টাকা) ভালো মানের বার্গার পাওয়া যায়। বাংলাদেশের একটি নরমাল রেস্তোরাঁয় বার্গার খেতেও এর কাছাকাছি সমান টাকা লাগে। কসমো নামক হাইফাই এই রেস্তোরাঁর বুফেতে ১৫ ইউরোতে যে খাবার খাওয়া যায়, বাংলাদেশের সে খাবার খেতে মিনিমাম ৩,০০০ টাকা (৩০ ইউরো) দিতে হতো আমি নিশ্চিত। একটা স্টেইক খেতে বাংলাদেশে প্রায় ২,০০০ টাকা লাগে, এর চেয়ে মাত্র কয়েকশো টাকা বেশি দিলে এখানে অনেক ভালো স্টেইক খাওয়া যায়।

[২] হোটেল: একবার দেশে গিয়ে কক্সবাজারে একটা মোটামুটি ভালো মানের রিসোর্টে গিয়েছিলাম পরিবারসহ। প্রতি রুমে প্রায় ৮,০০০ টাকা গুনতে হয়েছে প্রতিরাতে। আহমরি তেমন কিছুই মনে হয়নি। কয়েক মাস আগে এখানে এধষধিু নামের একটা শহরে যাই, চার তারকা না হলেও এই সমপরিমাণ টাকায় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক অনেক ভালো রুমে থেকেছি। আমি এই লেখাটি লেখার আগে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের ৪ তারকা এবং আয়ারল্যান্ডের ৪ তারকা হোটেলের খরচ সম্পর্কে বুকিং.কমে খোঁজ নিলাম। একই তারিখে দুই দেশের, প্রায় সমান জনপ্রিয় জায়গায় হোটেল খরচে খুব বেশি পার্থক্য দেখলাম না। বাংলাদেশের হোটেলে এতো বেশি খরচ হওয়ার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পেলাম না। বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা ট্যুরে গিয়ে হোটেলে যে টাকা দেয়, ইউরোপীয় ছাত্রছাত্রীরাও বোধহয় এতো টাকা হোস্টেলে দেয় না।

[৩] অভ্যন্তরীণ বিমান: আরেকটি ওভারপ্রাইসড সার্ভিস। ঢাকা থেকে চিটাগং যেতে মাত্র ৩০ মিনিটেরও কম সময় লাগে। কক্সবাজার যেতেও খুব বেশি লাগে না। কিন্তু ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার ভাড়া দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এখানে রায়ান এয়ার নামের একটি বিমান সংস্থা আছে, আমি নিজে সেই বিমানে ডাবলিন থেকে যুক্তরাজ্যে ৫ ইউরোতেও (৫০০ টাকায়) গিয়েছি। এটা স্পেশাল ফেয়ার ছিলো কিন্তু এমনিতেও সেই বিমানে করে ১২-১৫ ইউরোতে (১,২০০-১,৫০০ টাকায়) এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া যায়। আরেকটু ভালো ভালো এয়ারলাইন্স কোম্পানির সেবা নিলেও সেটির আন্তর্জাতিক ভাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভাড়ার চেয়েও কম অনেক ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের জিডিপি পার ক্যাপিটা ২,৫০০ ডলার, সেখানে আয়ারল্যান্ডের জিডিপি পার ক্যাপিটা প্রায় ৮২,০০০ ডলার। আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা অনেক কম, তাই জিডিপি পার ক্যাপিটা বেশি হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এর পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক মজবুত তাই এখানে জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে ইউরোপের অনেক দেশের চেয়েই সচ্ছল। তবুও এই সচ্ছল দেশে থেকেও দেশে গেলে বাংলাদেশের হসপিটালিটি সেক্টরকে ওভারপ্রাইসড মনে হয়। বাংলাদেশের এই সেক্টরের অনেক প্রতিষ্ঠানকেই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাকারী এবং অতি মুনাফার মোহে আচ্ছন্ন মনে হয়। এই ফিলিংসটা শুধু যে আমার একার, তা নয়। আমি আয়ারল্যান্ডে থাকা অনেক বাংলাদেশির সঙ্গেই কথা বলেছি এই স্পেসিফিক ব্যাপারটাতে এবং প্রত্যেকেই বাংলাদেশের এই ইন্ডাস্ট্রিকে মারাত্মকভাবে ওভারপ্রাইসড বলে বর্ণনা করেছেন।

একদিকে অনেকের পকেটে অসৎ টাকা, তাই তারা পরোয়া করে না। অন্যদিকে অনেকেই সৎ কিন্তু বাইরের সঙ্গে কম্পারিজন জানেন না, তাই এটাকে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছে, অনেকেই আবার শো অফ হিসেবে এসব মেইনটেইন করছেন উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও জবাবদিহিতা নেই। এই কারণগুলোর জন্যই এই সেক্টর এখনো এতোটা ওভারহাইপড।

মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠান লাভবান হলেও তাতে কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রি কোনোভাবেই সার্বিকভাবে লাভবান হচ্ছে না। ইন্ডাস্ট্রির এই ইনফ্লেশনারি আচরণ সার্বিকভাবে এটিকে মনোপলি বা অলিগোপলির দিকে ধাবিত করছে। ফলশ্রতিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রতিষ্ঠান এখানে প্রচ রকম গেইন করে (কয়েকজন ধুমধাম উঠে যায়) কিন্তু বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই আস্তে আস্তে সেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে (দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়)।
লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী ব্যাংকার  চ্যার্টার্ড একাউন্টেন্ট।

সর্বাধিক পঠিত