প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: পরিবহন মালিকদের ‘ব্ল্যাকমেইল’ কৌশল এবং সরকারের দায়

প্রভাষ আমিন
জাহিদুর রহমান, এনটিভির বিশেষ সংবাদদাতা। তার কাজের ক্ষেত্র সাভার। কিন্তু সাভারের ছোট গন্ডিতে নিজেকে আটকে রাখেন না। জাতীয়-আন্তর্জাতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও সরব এই গণমাধ্যমকর্মী। দুই দফা এনটিভিতে কাজ করার সুবাদে তাকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। এখনো সাভারে বেড়াতে গেলে তার সঙ্গ পাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সক্রিয় এই গণমাধ্যমকর্মী। সকালে তার একটি পোস্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বৃহস্পতিবার থেকে সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বসে ভাড়া সমন্বয়ের ঘোষণা না আসা পর্যন্তু সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ব্ল্যাকমেইলিং। অনেকে এটাকে ধর্মঘট বলছেন বটে, তবে এটা কোনোভাবেই ধর্মঘট নয়, পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও ধর্মঘট বলছেন না। এটা আসলে স্রেফ ব্ল্যাকমেইল করে দাবি আদায়ের চেষ্টা। সব সভ্য দেশেই কিছু আইন-কানুন আছে। আমরা যেহেতু নিজেদের সভ্য দাবি করি, তাই আমাদেরও কিছু আইন-কানুন আছে। কিন্তু দাবি করলেও আমরা আসলে সভ্য নই, কারণ আমরা আইন-কানুন মানি না। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নানা সংগঠন আছে, সেগুলো নিবন্ধিতও। বিভিন্ন দাবি আদায়ে এসব সংগঠনের ধর্মঘট ডাকারও অধিকার আছে। তবে ধর্মঘট ডাকারও কিছু নিয়ম আছে। দাবি আদায়ের জন্য যৌক্তিক সময়ের আল্টিমেটাম দিয়ে তবেই ধর্মঘটে যাওয়া যায়। কিন্তু এমন বিনা নোটিশে ধর্মঘট ডাকা যায় না। ডাকলে তাদের নিবন্ধনও বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই তারা ধর্মঘট ডাকে না।

ফোনে ফোনে কথা বলে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখে। নিয়ম মেনে, সময় দিয়ে ধর্মঘট ডাকলে মানুষের দুর্ভোগ কম হয়। হঠাৎ গাড়ি চালানো বন্ধ রাখলে মানুষের কষ্ট বেশি হয়। আর এই কষ্ট বেশির দোহাই দাবিও দ্রæত আদায় করা যায়। এই বø্যাকমেইল কৌশলের আবিষ্কারক শাজাহান খান। তিনি যখন নৌ পরিবহন মন্ত্রী, তখন তার বাসা থেকে সারাদেশে ফোন করে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। আমার ধারণা পরিবহন মালিকদের এই বø্যাকমেইল কৌশলে সরকারের সায় আছে। শিগগিরই পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলবেন, জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করেই তাদের দাবি মানতে হলো। অথচ যারা বিনা ঘোষণায় গাড়ি চালানো বন্ধ রাখলো, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিলো। আমাদের দেশটা আসলে মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। এখানে সাধারণ মানুষকে যে যতো বেশি কষ্ট দিতে পারে, সেই ততো ক্ষমতাশালী। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বাস মালিকরা অবশ্য এতো কৌশলী নন, তেলের দাম বেড়েছে ২৩ ভাগ, তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন ৩৯ ভাগ। তাদের দয়ার শরীর মাত্র ৩৯ ভাগ বাড়িয়েছেন। ৫০ ভাগ বাড়ালেও তো কারও কিছু বলার বা করার ছিলো না। মুল্লুকটা তো আসলে মগের।

বলছিলাম জাহিদুর রহমানের কথা। সকালে ফেসবুকে তিনি তুলে ধরেন হঠাৎ যান চলাচল বন্ধে মানুষের দুর্ভোগের কথা, ‘সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সংবাদের পেছনে ছুটছি আর কাছ থেকে দেখছি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব। টিকটিক করে ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে আর টেনশনে অনেকে ঘামছেন। অস্থির হয়ে একে অন্যকে ফোন করছেন। আহারে! এসব দেখে খুব মায়া লাগছিলো। একপর্যায়ে হাতে থাকা কলেজে ভর্তি আর সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র হাতে নিয়েই গর্জে ওঠলেন তারা। এতোদিন ধরে পরীক্ষার হলে যাওয়ার কতোশত প্রস্তুতি! অথচ ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েই মুহূর্তের অনিশ্চয়তায় সব ভুলে হয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সেসব প্রস্তুতি ঝরে পড়লো নিশ্চল সড়কে। একদিকে নির্লিপ্ততা! অন্যদিকে  বিক্ষোভ। এই বৈপরীত্যের মাঝে চোখের সামনে বিলীন হয়ে যাওয়া তারুণ্যের ছোটবড় স্বপ্নগুলোকে দেখছিলাম তছনছ হয়ে যেতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের স্নাতক শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও ১৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো আজকের দিনটি।
পথে নেমেই আকস্মিক ধর্মঘট। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারাদেশে এই ধর্মঘট ডেকেছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। নিমিষেই স্বপ্ন পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। একপর্যায়ে প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে নিজেরাই সড়কে নেমে বিক্ষোভ করলেন। ওদিকে ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ঘুরছে তো ঘুরছেই। আচ্ছা এই মানুষগুলোর দোষ কী? হায়রে নিয়তি! কে দেবে তাদের সান্ত¡না?’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমরা জানি না। সরকার কোনোদিন জানবেও পরিবহন মালিকদের হঠাৎ ব্ল্যাকমেইলে কতো তরুণের শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে। কতো যুবকের চাকরির স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। এই পরীক্ষাগুলোর তারিখ বদলাবে না। যারা তাদের স্বপ্ন ভেঙে দিলো, তাদের শাস্তি তো হবেই না, উল্টো দ্রত তাদের দাবি মেনে নেওয়া হবে। লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত