প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] দেশের শিল্প এলাকায় ১১টি মডার্ন ফায়ার স্টেশনের নির্মাণকাজ চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সুজন কৈরী: [২] ‘মুজিববর্ষে শপথ করি, দুর্যোগে জীবন-সম্পদ রক্ষা করি’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাদেশে শুরু হয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০২১।

[৩] বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে অগ্নি-গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ- ২০২১ এ গৃহীত সকল কর্মসূচির সাফল্য কামনা করে আনুষ্ঠানিক সারাদেশে এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

[৪] অনুষ্ঠানে সরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, প্রতিবছরের মতো এ বছরও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমি মনে করি এটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। আমি এ জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। প্রতিটি দেশে দিন দিন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এ জন্য সরকারে আসার পর থেকেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

[৫] ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার সময় দেশে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ছিল মাত্র ২০৪টি। বর্তমানে দেশে চালু ফায়ার স্টেশন হলো ৪৫৬টি। অর্থাৎ আমাদের সরকারের সময়ে দেশে নতুন ২৫২টি ফায়ার স্টেশন চালু করা হয়েছে। আগামী অর্থ বছরের মধ্যে আরও ১০৯টি নতুন ফায়ার স্টেশন চালু করা হবে। তখন ফায়ার স্টেশনের মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৬৫টি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের শিল্পঘন এলাকা এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় ১১টি মডার্ন ফায়ার স্টেশনের নির্মাণকাজ চলছে।

[৬] এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের গ্যাপ এরিয়ায় আরও ১৫৫টি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যে ৩টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা ৭২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পা রাখার অভিপ্রায়ে কাজ করে যাচ্ছি। শিল্প কারখানা প্রসারিত হচ্ছে। সেজন্য ফায়ার স্টেশনের সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে।

[৭] তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের জনবল বৃদ্ধিতেও আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছি। ২০০৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানের মোট জনবল ছিলো মাত্র ৬ হাজার ১৭৫ জন। বর্তমানে এই জনবল হয়েছে ১৩ হাজার ৪০০। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জনবলের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ নির্দেশনা অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের জনবল ২৫ হাজারে উন্নীত করার জন্য অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠনের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

[৮] স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও আমরা বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সার্ভিসের ১ হাজার ১৬৯জন সদস্যকে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে সুবিধা সংবলিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফায়ার একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার ১০০.৯২ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলে এখানে একসাথে ফায়ার সার্ভিসের ১ হাজার সদস্যকে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে। একাডেমি হলে আমরা বিদেশের লোক এখানে এনে উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে পারবো। ফায়ার সার্ভিসের সেই সক্ষমতা সৃষ্টি হবে।

[৯] তিনি বলেন, আমরা অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধার সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ২০০৯ সালে যেখানে ফায়ার সার্ভিসের বহুতল ভবনে কাজ করার মতো ১টি ৪৭ মিটারের পুরনো গাড়ি ছিলো, সেখানে আমরা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বহুতল ভবনে অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধারের মোট ২১টি উঁচু মইয়ের গাড়ি এনেছি। ফায়ার সার্ভিসের এখন ৬৪মিটার বা ২০ তলা পর্যন্ত অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধারকাজ করার সক্ষমতা হয়েছে। এছাড়া ৬৮মিটার উচ্চতার লেডার সংবলিত গাড়ি ফায়ার সার্ভিসের বহরে যোগ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। আগামী অর্থবছর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা ২২ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে।

[১০] ফায়ার সার্ভিস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে প্রধানমন্ত্রী ২০ কোটি টাকার অনুদান দিয়েছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ৬৩টি থেকে ১৯০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। দেশের সব স্টেশনে পর্যায়েক্রমে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কেমিক্যাল টেন্ডার, হাজমত টেন্ডার, এমনকি আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধার রিমোট কন্ট্রোল ফায়ারফাইটিং ইউনিট এবং ড্রোন পর্যন্ত আমরা এনেছি, যা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিশেষ পানিবাহী গাড়ি ও ক্যামিক্যাল টেন্ডারসহ বিশেষ ধরনের গাড়ি ছিলো মাত্র ৫টি। আর এখন আধুনিক সুবিধা আছে এমন বিভিন্ন ধরনের বিশেষ গাড়ির সংখ্যাই বর্তমানে ১০৮। সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমরা এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা- কর্মচারীদের সুবিধা বৃদ্ধিতেও কাজ করেছি। সকল সদস্যের জন্য পূর্ণাঙ্গ রেশন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আমরা এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার ৪০০টাকা পর্যন্ত ঝুঁঁকিভাতা চালু করেছি, কর্মীদের জন্য ৩ রঙের মর্যাদাপূর্ণ নতুন পোশাক প্রবর্তন করা হয়েছে, পদকের সংখ্যা ৮ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০টি এবং সম্মানী ১০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।

[১১] মন্ত্রী বলেন, ফায়ারম্যানসহ ৫টি পদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আমরা আজীবন রেশন সুবিধার আওতায় আনার কথা চিন্তা করছি। সকল জেলায় ফায়ার সার্ভিসের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার পদ সৃজনসহ এই প্রতিষ্ঠানের জন্য আরো যা যা প্রয়োজনীয়, আমরা পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করবো। সক্ষমতা বাড়ানোয় এই প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জান-মাল রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের তিনজন কর্মী অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজের সময় মারা গেছেন। রাজশাহীতে জঙ্গি দমন অভিযানে ফায়ারফাইটার আব্দুল মতিন, বনানীর এফআর টাওয়ারে ফায়ারফাইটার সোহেল রানা, প্রধানমন্ত্রী যাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছিলেন এবং সবশেষ দিনাজপুরে ডুবন্ত লোক উদ্ধার করতে গিয়ে ডুবুরি মতিন মারা গেছেন। এসব কারণে একসময় ‘দমকল’ বলে অবহেলা করলেও এখন সবাই প্রতিষ্ঠানকে দুঃসময়ের বন্ধু মনে করে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে।

[১১] এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পৌঁছানোর পর তিনটি সুসজ্জিত কনটিনজেন্টের সদস্যরা তাকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানান। এ সময় তিনি প্যারেডের সালাম গ্রহণ করেন ও বেলুন উড়িয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহের উদ্বোধন করেন।ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত সব কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিভিন্ন অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং সংস্থার কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

[১২] অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, সারাদেশে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রতি বছরের মতো এ বছরও ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহ উদযাপন করা হচ্ছে।তিনি আরও জানান, আজ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে এ উপলক্ষে মহড়া ও গণসংযোগ আয়োজন, ক্রোড়পত্র প্রকাশ, যান্ত্রিক শোভাযাত্রা, লিফলেট ও পোস্টারসহ নানা প্রচারপত্র বিতরণ এবং বিভিন্ন পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হবে।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত