প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রবিউল আলম: ইতিহাসের পাতায় পাতায় জাতীয় চার নেতা

রবিউল আলম
১৯১৫ সালের ১৫ আগস্ট কিংবা ৩ নভেম্বর জেলহত্যাখুন করার পরে তারা পৃথিবীর বাদশা মনে করতো। জিয়াউর রহমান তাদের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলো। জনতার রায়ের কাছে খুনের পরিকল্পনাকারী আমেরিকাও এখন খুনিদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করছেন। বাঙালি জাতির পিতাকে সপরিবারে হারিয়ে হতভাগা হয়েছে জাতি। ৩ নভেম্বর জেল হত্যার পরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো গোটা দেশ। বাঙালি জাতি কান্নাও ভুলে গিয়েছিলো। রাস্তায় বের হতে পারতাম না, প্রতিরোধ করার মতো কোনো নেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। মোশতাকের মন্ত্রিসভার আমন্ত্রণ, জেলখানার বন্দীদশায় মানসিক যন্ত্রণা, আত্মরক্ষায় নেতাদের পলায়ন। আমাদের মতো নিরীহ মুজিব সৈনিকরা নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম। মন থেকে আদর্শ বিচ্যুত করতে পারিনি, মানবতাও হারিয়ে যায়নি। ৩ নভেম্বর ভোরে বিবিসির খবরে জেলখানায় ৪ নেতার হত্যার খবর প্রচারিত হচ্ছিলো। শত শত মানুষ রেডিওর সামনে, তখনকার বিবিসি ছিলো আলোচিত গণমাধ্যম। ৪ নেতার নামের তালিকায় তাজউদ্দীন আহমদের নাম থাকায় কিছুটা বিস্মিত হলাম। বাকি তিন নেতাকে চিনতাম না, কাছে থেকে দেখারও সৌভাগ্য হয়নি। রায়েরবাজার, মধুবাজার কাছাকাছি হওয়াতে নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। মাঝে মাঝে তাজউদ্দীন আহমদকে বাজার করতে দেখেছি।

১৯৬৬-৬৭ সালের কথা। খবর শেষ হতেই সকাল ৮টার কিছু পরে মধুবাজার হয়ে ধানমন্ডি। রাস্তা অনেকটা নীরব। মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর গাড়িগুলো হুটহাট করে আসা যাওয়া করছে। পুলিশের গাড়ি তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ির সামনে। অনেক লোকজন সমাগম হতে দেখে পুলিশ হুইশেল দিয়ে তেড়ে আসে। সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখলে রাস্তার অপর পারে চলে যায়। বেলা ১২টা পর্যন্ত লুকোচুরির খেলাটি আর ভালো না লাগাতে বাড়ি চলে আসি। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, একনজর দেখার জন্য মনটাকে কিছুতেই মানাতে পারছিলাম না। রাস্তায় মিনি কারফিউ চলছে। কিছুদূর চলার পরে গা ছিমছিম করছে আশেপাশে কোনো লোকজন না দেখে। মধুবাজারের রতন ভাইদের বাড়ি পার হয়ে যাওয়াতে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ির সামনেও কোনো সাধারণ লোকজন নেই পুলিশ ছাড়া। হয়তো বাড়ির ভেতরে কিছু লোকজন ছিলো। ইতোমধ্যে চার-পাঁচটি মিলিটারির গাড়ি এসে থামতেই আমি ভয়ে একদৌড়। রাতে আর ঘুম আসছে না, স্বাভাবিক জীবনযাপনও হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, হারিয়েছি কর্মজীবন। জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হারিয়ে কী হতে চলেছে বোঝার উপায় নেই। তার ওপর পুলিশের অত্যাচার সেনাবাহিনীর লাঠিপেটা সহ্য করে রাস্তায় কতোক্ষণ অপেক্ষা করা যায়?

তাজউদ্দীন আহমদের লাশ কি এসেছে, তবে কি বাড়ির ভেতরে নিয়ে রেখেছে? অনেক প্রশ্নের উদয় হচ্ছে মনে। পরদিন সকালেই আবারও ধানমন্ডির ১৯ নম্বর সাতমসজিদ রোডে হাজির হলাম। হতাশা কিছুতেই কাটছে না। তখনো লাশের কোনো খোঁজখবর নেই। বাড়িতে আপনজন কেউ আছে কিনা তাও জানা নেই। জোহরা তাজউদ্দীন ছাড়া আর কাউকে চিনিও না। তাকেও দেখার উপায় নেই। কিছু সময় পরে কিছু সেনাবাহিনীর গাড়ি এসে বাড়ির সামনে ঘেরাও করে রাখলো। আমরা রাস্তার অপরপ্রান্ত গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছু সময় পরে লাশবাহী একটি গাড়ি এসে হাজির। আর্মি অফিসার অতি তাড়াতাড়ি করছে। কে কে দেখার আছে দেখে নেন। লাশ এখনি নিয়ে যাওয়া হবে। কেউ দেখছে না। দেখার জন্য কেউ আছে বলেও মনে হচ্ছে না। আমরাও ভয়ে এগিয়ে আসতে পারছিলাম না।
কে জানি একজন মধ্যবয়সী যুবক আস্তে আস্তে লাশের পাশে এসে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের ভাষায় বলে উঠলো। এই লাশ জানাজা ছাড়া নিতে দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ত্রিশ-চল্লিশজন লোকের সমাগম হয়েছে। অনেকেই লাশ দেখার জন্য ব্যস্ত, অনেকই কান্নাকাটিতে।

সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মাঝে লাশ নিয়ে টানাটানি। অবশেষে একজন সেনা অফিসারের সম্মতিতে তাজউদ্দীন আহমদের লাশের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় তার বাড়ির সামনে। ত্রিশ থেকে চল্লিশজন লোকের উপস্থিতিতে। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামকে যিনি বাস্তব রূপদান করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাকে এভাবে চিরবিদায় জানাতে হবে, কখনো ভাবীনি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়, আমি সেই জানাজায় অংশ নিয়েছিলাম। হত্যাকারীরা পৃথিবীর বাদশাহ হয়েছিলো, মানুষের মনে স্থান করে নিতে পারেনি। ঘৃণিত মোশতাক ও তার পালিত খুনি বাহিনীর পতন হয়েছে, বিলুপ্তির পথে জিয়ার দল। প্রবাস জীবনে তারেক। ৪ নেতা আজ ইতিহাসের পাতায় পাতায়। বিনম্র শ্রদ্ধা হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে।
লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি

সর্বাধিক পঠিত