প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন: জাতীয় চার নেতা হত্যা, মোহাম্মদী বেগ এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো। স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় কলঙ্ক দিবস। পনেরো আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের হত্যাকাÐ চেতনাগতভাবে অভিন্ন। জেলখানা থাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায়। জেলখানা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রশাসন ও পুলিশের। ৩ নভেম্বর শুরু হয়ে গেছে তখন, রাত দেড়টায় পিকআপে করে কিছু সশস্ত্র সেনা সদস্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এসে হাজির হয়। কারাগারে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি অনাকাক্সিক্ষত, অভাবিতপূর্ব দৃষ্টান্ত। এরই মধ্যে কারাগার কর্তৃপক্ষের একধরনের অস্বস্তি ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছি নথিপত্রে। প্রথমে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখার পরই জেলার আমিনুর রহমান, তাকে বাসা থেকে ডেকে আনা হয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন, কারণ কারাগারে সেনা উপস্থিতি তো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার। সেই সময় আমিনুর রহমানের অফিসে একটা ফোন বাজে। ফোন তুললে বলা হলো, পুতুল প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আইজির সঙ্গে কথা বলবেন। আইজির সঙ্গে কথা বলা হলো। আইজি জানালেন, আমিনুর রহমানকে, সেনাবাহিনীর লোকজন যা করতে চায় তা করতে দেওয়া হোক। তার মানেই হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীকে জেলখানায় ঢুকতে দিতে চাচ্ছিলো না। তারা যোগাযোগ করেছিলো বঙ্গভবন দখলকারী মেজরদের সঙ্গে। মেজররা যখন ‘পুতুল প্রেসিডেন্ট’কে দিয়ে একথাটি বলিয়ে নিয়েছিলো।

এ ধরনের কথা চালাচালি করতে করতে রাত তিনটা বেজে যায়। তখন আমিনুর রহমানের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয় যে চার জাতীয় নেতাকে একত্রে করতে হবে। তাদের একত্রে করা হলো। একত্র করার পর সেনাবাহিনী অবৈধভাবে জেলখানায় ঢুকে সশস্ত্র অবস্থায়। তাদের প্রবেশটিই ছিলো অবৈধ। এটারও বিচার হওয়া উচিত। চারজনকে একত্রে ব্রাশফায়ার করে। শুধু ব্রাশফায়ারই নয়, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলো। আমি মনে করি, আইনের বিচারে পরিস্থিতিগত প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে জেলহত্যার প্রধান আসামি খন্দকার মোশতাক। তার বিচার হয়নি এখনো। খুনিরা খুন করেছে, কিন্তু নির্বাহী নির্দেশ দিয়েছে খন্দকার মোশতাক।
প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই ঘটনাটি ঘটলো? মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেছিলেন, যিনি প্রয়াত এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বই লিখেছেন। তারা যেটা বলেছেন, জেলহত্যার দুটি কারণের কথা তারা বলেছেন। একটি কারণ হচ্ছে সেনবাহিনীর চেইন অব কমান্ড নিয়ে তখন সেনানিবাসে তোলপাড় চলছিলো। মূল ব্যাপারটা ছিলো চেইন অব কমান্ডের। আরেকটি কারণ তারা উল্লেখ করেছেন, মেজররা আগেই চিন্তা করে রেখেছিলো যে একটা পাল্টা অভ্যুত্থান হতে পারে আওয়ামী লীগের পক্ষে। যা ইতোমধ্যেই ঘটে গিয়েছিলো মেজর জেনারেল খালেদ মোশররফের নেতৃত্বে। তারা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলো, আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে হলে চার জাতীয় নেতাকে নিঃশেষ করতে হয়। এ ধরনের দুটি মন্তব্য পেয়েছি জেলহত্যার কারণ সম্পর্কিত।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিলো, কারণ তিনি বাংলাদেশ সৃষ্টির অনুঘটক ছিলেন। আর চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, কারণ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে এই চার জাতীয় নেতা মুক্তিযুদ্ধ সফলভাবে পরিচালনা করেছিলেন। জনগণের কাছে তাদের ভাবমূর্তি এমনই ছিলো যে, তাদের আমরা বলতাম চার জাতীয় নেতা। তারা বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সফল হতো না। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে, এই চার জাতীয় নেতা যতোদিন বেঁচে থাকবেন, নানান হিসাব-নিকাশ করে জাতীয় চার নেতাকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো।

২৯ বছর পর ২০০৪ সালে জেলহত্যার বিচারের রায় দেওয়া হয়েছিলো, যখন বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায়। তাদের বিচার পরিষ্কার ছিলো না। স্বচ্ছ ছিলো না। ২০১০ সালে আবারও জেলহত্যার বিচার শুরু হয়, তখন আওয়ামী লীগ সরকার। বন্দী অবস্থায় মানুষকে হত্যার দৃষ্টান্ত অনেক আছে পৃথিবীতে সেই রাজ-রাজাদের আমলে। যেমন মোহাম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে বন্দী অবস্থায় হত্যা করেছিলো। ১৫ আগস্ট সম্পর্কে আমি একটি তদন্ত কমিটি চেয়েছি, ৩ নভেম্বর জেলহত্যা নিয়েও একটি তদন্ত কমিটি করতে হবে। কারণ মূল ঘটনার রাজনৈতিকভাবে যাই-ই হোক, তার প্রতি আমাদের আস্থা কম। তদন্ত কমিটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি হলে ভালো। তদন্ত কমিটির কাছ থেকে যে তথ্য আমরা পাবো তা আস্থা ও বিবেচনায় নিতে পারি। জেলহত্যার মতো কলঙ্কময় ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
পরিচিতি : ইতিহাসবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত