প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: ফিটফাট জাপানের অন্যতম ‘কালচার বা সংস্কৃতি’

প্রবীর বিকাশ সরকার
অক্টোবর মাসের ২৩ তারিখ আমার জাপান প্রবাসের ৩৭ বছর পূর্ণ হলো। চাকরি করেছি ৩৫ বছর টোকিও, সাইতামা, চিবা প্রভৃতি জায়গায় বিভিন্ন কলকারখানায়। চাকরি করার পাশাপাশি নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলাম। সেসব বিভিন্ন সময় আমি লিখেছি।
জাপানে আমি যখন আগমন করি ১৯৮৪ সালে তখন দেশটিতে চলছে বাবল্ ইকোনোমির চূড়ান্ত সময়। যা ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল বলা যায়। সমস্ত টোকিও জুড়ে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর অগণন ক্ষুদ্র-মাঝারি কলকারখানা গড়ে উঠেছিল। যাদের বলা হতো ‘মাচি কোওবা’Ñঅর্থাৎ শহরাঞ্চলীয় কারখানা। ২৩টি ছোট-বড় ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত মূল এবং সুবিশাল টোকিওর এমন কোনো পাড়া ছিল না যেখানে এই ‘মাচি কোওবা’ ছিল না। এতো ব্যস্ততা ছিল যে, অধিকাংশ কারখানা ২৪ ঘণ্টাই চালু থাকতো। গভীর রাতে কান পাতলে মেশিন-যন্ত্রপাতির হুশ-হুশ-হিশ-হিশ আর টুংটাং শব্দ শোনা যেতো।

সকল কলকারখানা বড় বড় এবং বহুজাতিক বাণিজ্য ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছিল আয়ুরেখা, অর্থাৎ বড় বড় কোম্পানিগুলোর পণ্যসামগ্রী প্রস্তুত করে দিত চুক্তির ভিত্তিতে। এই সকল মাচি কোওবা নামক কলকারখানায় কাজ করতেন কায়িক শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু কমপক্ষে তারা মাধ্যমিক স্কুল পাস। যদিও জাপানের জনসংখ্যার অধিকাংশই হাইস্কুল পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তবে একটি অংশ প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে কলকারখানায় কাজ করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কর্মচারী কলকারখানায় তেমন নেই বললেই চলে। এখন তো কলকারখানাই জাপানে নেই। চীন, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়েছে ৯০ এর শেষদিক থেকে। এখন যা কিছু আছে সেখানে উচ্চাশিক্ষিত জাপানি ও বিদেশি ছাড়া কাজ করার সুযোগ খুবই কম।

কিন্তু আমাদের সময়ে ক্ষুদ্র-মাঝারি কলকারখানায় যেসকল বিদেশি কাজ করতেন অধিকাংশই ছিলেন হাইস্কুল পাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী বা উচ্চশিক্ষার্থে আগত খুব কমই ছিলেন। এ দেশে চাকরি করার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ভাষা। জাপানি ভাষা না জানলে টিকে থাকা খুবই কঠিন। এ কারণে বহু বিদেশিকে ফিরে যেতে হয়েছে। আমরা যারা মাটি কামড়ে পড়েছিলাম জাপানি ভাষা শিখতে হয়েছে কোনো না কোনোভাবে। ভাষা না বোঝার কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বহু বিদেশি শ্রমিক। আবার যারা ভালো ভাষা জানতেন তারা ভালো অবস্থানে ছিলেন।

আমার ক্ষেত্রে ভাষাটা শিখেছিলাম বলে পার পেয়ে গেছি। তবে লক্ষ্য ছিল জাপানিদের বন্ধু হতে হবে, এ দেশের মানুষের চিন্তাচেতনাকে বুঝতে হবে। ফলে সুদীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি কোনোদিন কোনো বৈষম্যের শিকার হইনি। জাপানি ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি প্রথম থেকেই আমার আগ্রহ জন্মলাভ করেছিলো। জাপানিরা সাধারণত ইতিহাসসচেতন, সংস্কৃতিবান ফলে ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানা থাকলে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা খুবই সহজ। কিন্তু ভাষা না জানলে ইতিহাস বা সংস্কৃতি কোনোটাই জানা যাবে না।

অনেক দেশের নাগরিকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে কিন্তু জাপানিদের মতো এ্যতো সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট, স্বল্পভাষী, নিরুদ্রপ, ধৈর্যশীল কিন্তু কঠোর পরিশ্রমী আর দেখিনি। কতোকিছু যে শিখেছি তাদের কাছ থেকে যা আমার দেশে শিখতে পারতাম না বলাই বাহুল্য। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, নম্রতা এবং পরিপাটি থাকা।

যখন যে কারখানায় কাজ করেছি, একটি অসাধারণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, ফলে যারপরনাই আনন্দ লাভ করেছি। সেটি হলো, বেনকিয়োওকাই এবং নোমিকাই। অর্থাৎ শিক্ষা সমাবেশ ও পানাহার সমাবেশ। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা সভা তারপর পানশালায় গিয়ে মদ্যপান করা মুক্তানন্দে। কিন্তু ফিটফাট হয়ে যেতে হবে। তাই যেদিন আলোচনা সভা থাকবে সেদিন সুট-কোট পরে অথবা একটু দামি পোশাক পরে কাজে যেতাম সকালে। তারপর কারখানার পোশাক পরে সারাদিন কাজ শেষ করে পরিষ্কার হয়ে সুট-কোট বা ভালো পোশাক পরে সন্ধ্যাবেলা সমাবেশে অংশগ্রহণ করতাম। প্রায় ২০টি কলকারখানায় আমি কাজ করেছি প্রতিটিতেই এই ধারা বজায় ছিল।

আমি একবার এই বিষয়ে একজন ঊর্ধতন সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এতো ফিটফাট না হলে কি চলে না? তিনি জবাবে বলেছিলেন, দ্যাখো, মানুষ সাধারণত ধারণা করে কলকারখানায় যারা কাজ করে তারা তো ব্লু ওয়ার্কারস অর্থাৎ নিম্নশ্রেণীর শ্রমিক। কথাটি সঠিক। পৃথিবীতে তাদের সংখ্যাই বেশি। অথচ শ্রমিক ছাড়া কলকারখানা চলবে না। পণ্যসামগ্রী উৎপাদন হবে না। কাজেই তোমার অবদানটা কতো বড় সেটা তোমাকে মাথায় রাখতে হবে। দুই হচ্ছে, কাজ শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রের কথা ভুলে যাবে। মনেই করবে না। তারপর তুমি শ্রেণিভেদহীন আর দশজন হোয়াইট কালার জব হোল্ডারদের মতোই একজন মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। তারা যেভাবে আনন্দ করে তুমিও সেভাবেই করবে। এটাই হচ্ছে কালচার। কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হোক

কালচারগুলো কিন্তু একই। বিভিন্ন কালচার আছে জাপানে। যে কালচার অন্যদেশে নাও থাকতে পারে।
একদম তাই। জাপানে এমন কিছু কালচার আছে যা ব্যতিক্রমই বটে। যেমন, পানশালায় কোম্পানির মালিক, বড় কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাই সমান। সেখানে আনন্দটাই মুখ্য, কোনো বৈষম্য নেই। যা আমাকে অবাক করেছে! লেখক : রবীন্দ্রগবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত