প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গৌতম রায়: এমসিকিউ প্রশ্ন এমন নৈর্ব্যক্তিক হতে হয় যেখানে শিক্ষার্থী বিভ্রান্ত হবে না

গৌতম রায়
৪৩তম বিসিএস (প্রিলি.) পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি এসেছে ‘রুখের তেন্তুলি কুমীরে খাই’- এর অর্থ কী? [ক] তেজি কুমিরকে রুখে দিই, [খ] বৃক্ষের শাখায় পাকা তেঁতুল, [গ] গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়, [ঘ] ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়। এর অর্থটি আমার জানা ছিলো না। অর্থটি বের করার আগে মনে মনে ভাবছিলাম উত্তর কোনটি হতে পারে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর মনে হলো, ক, খ ও গ-এর উত্তরগুলো কাছাকাছি বা অনেকটা একই রকমের, কিন্তু ঘ বাকি তিনটি থেকে একেবারে ব্যতিক্রম। সুতরাং এই প্রশ্নের উত্তর ঘ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমি বিসিএস পরীক্ষার্থী হলে এই প্রশ্নের উত্তর ঘ দিয়ে আসতাম। আমার ধারণা, যারা এই উত্তর জানেন না, তাদের অধিকাংশই ঘ উত্তরটি দেবেন। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আসলে গ। এমসিকিউ প্রশ্ন তৈরির কিছু নিয়মকানুন আছে। এর একটি নিয়ম হচ্ছে, চারটি সম্ভাব্য উত্তর (distractor) এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন শিক্ষার্থী সেখান থেকে শুদ্ধ বা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তরটি বাছাই করে নিতে পারে। এক্ষেত্রে চারটি সম্ভাব্য উত্তর ‘কাছাকাছি’ বা ‘কাছাকাছি মানের’ হলে শিক্ষার্থীর যদি সুনির্দিষ্ট উত্তর জানা না থাকে, তাহলে ভেবে/বিশ্লেষণ করে/যুক্তি খাটিয়ে যেন উত্তর দিতে পারে, সেভাবেই এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তরগুলো দেওয়া প্রয়োজন।

প্রায়ই আমরা দেখি, চারটি সম্ভাব্য উত্তরের একটি অন্য তিনটি উত্তরকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাবের ধরন নানা প্রকার হতে পারে। যেমন, চারটি উত্তরের কোনোটিতে যদি ‘ওপরের কোনোটিই নয়’, ‘ওপরের সব কয়টি’, ‘ক ও গ’ বা এ ধরনের উত্তর থাকে, তাহলে তা শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে বাকি তিনটি বাদ দিয়ে এই উত্তরটি দিতে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের অভাবে শিক্ষার্থী জানা উত্তরও ভুল দিয়ে আসতে পারে। এমনকি এমনও হয় যে, শুধু উত্তরের দৈর্ঘ্যরে কারণে শিক্ষার্থী উত্তর বাছাইয়ে প্রভাবিত হয়। যেমন, একটি প্রশ্নে যদি তিনটি উত্তর হয় দুই অক্ষরের এবং অপরটি হয় সাত অক্ষরের, কিংবা যদি তিনটি উত্তর হয় সাত অক্ষরের এবং অপরটি হয় দুই অক্ষরের, তাহলে নির্দিষ্ট উত্তর জানা না থাকলে অনেক শিক্ষার্থীই প্রথম ক্ষেত্রে সাত অক্ষরের উত্তরটি এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দুই অক্ষরের উত্তরটি প্রদান করতে আগ্রহী হবে। এখানে মাত্র দুটো উদাহরণ দেওয়া হলো। এ রকম আরও বিবেচ্য বিষয় রয়েছে এমসিকিউ তৈরিতে।

যে উদাহরণটি ধরে আজকের এই আলোচনা, সেখানে উত্তরের বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঘ উত্তরটি দেবে। উত্তর হিসেবে ঘ শুদ্ধ হোক বা অশুদ্ধ, সেটি আসলে এই আলোচনার বিষয় নয়, উত্তর প্রদানে শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করার প্রসঙ্গটি এখানে মুখ্য। এমসিকিউ প্রশ্ন এমন নৈর্ব্যক্তিক হতে হয় যেখানে শিক্ষার্থী আসলে বিভ্রান্ত হবে না, বরং সঠিক উত্তরটি বাছাইয়ে চিন্তামগ্ন হবে। একাধিক উত্তর থেকে কোনটি যথাযথ হবে বা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিই শিক্ষার্থী নানাভাবে বিশ্লেষণ করে বের করবে। বিভ্রান্ত বা প্রভাবিত না করে শিক্ষার্থীর সেই দক্ষতাটুকুই আসলে বের করে নিয়ে আসা প্রয়োজন। অনেকে বলেন, এমসিকিউ প্রশ্ন সহজ বা এর দ্বারা সৃজনশীলতা বা বিশ্লেষণী ক্ষমতা মাপা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এমসিকিউ তৈরি করা রচনামূলক প্রশ্ন তৈরি করার চেয়েও কঠিন এবং ভালো এমসিকিউ দ্বারা শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব। অবশ্য এমসিকিউ বা Multiple Choice Question নাম থাকলেও আমরা কেন যেন একটি উত্তর বা Choice রাখি। কেন রাখি জানা নেই।

এই আলোচনাটি বিসিএস পরীক্ষার ভুল ধরা নিয়ে নয়। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। মূলত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলাম এবং সেখানেও বলেছিলাম যে, আমাদের প্রশ্নপত্রগুলোতে প্রচুর ভুল থাকে, থাকে অশুদ্ধ প্রশ্ন। শিক্ষার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে এখন প্রচুর আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা, সেই আলোচনাগুলোও সামনে আসা প্রয়োজন, শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার স্বার্থে।

সর্বাধিক পঠিত