প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] জীবননগরে শীতের আগমনী বার্তায় চলছে খেজুর রস সংগ্রহের প্রস্তুতি

জামাল হোসেন: [২] ঋতু বৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। আর এক একটি ঋতুর রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট। ঋতু বৈচিত্রে এখন সন্ধ্যায় ঠান্ডা আবহাওয়ার আমেজ আর রাতের শেষে কুয়াশায় জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহ করতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার গাছিরা বেশ আগে ভাগেই খেজুর কাটার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

[৩] দিন পঞ্জিকায় এখনও শীতের ঘোষনা না দিলেও তা মানতে নারাজ আবহাওয়া ও পরিবেশ প্রকৃতি। প্রকৃতি আর আগের মত পঞ্জিকার অনুশাসন মানছে না। শীতের আমেজ পুরোপুরি শুরু না হলেও যতই দিন যাচ্ছে,ততই প্রান্তিক জনপদে সকালের শিশিরের সাথে শীত অনুভুত হচ্ছে। আর এ অবস্থার ওপর ভর করেই দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হবে গাছিদের রস আহরন। রস-গুড়-পাটালির মো-মো গন্ধে মেতে উঠবে গ্রাম বাংলার জনপদ।

[৪] কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলা থেকে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্য খেজুর রস-গুড়। কয়েক বছর আগেও বাড়ীর আঙ্গিনায়,ক্ষেতের আইলে, পতিত জমির ঝোপ-জঙ্গলে ও রাস্তার দু’ধারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত শত শত খেজুর গাছ। কোনো যত্ম-পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতিগতভাবে বেড়ে উঠতো এসব খেজুর গাছ। এসব খেজুর গাছ গাছিদের পরিবারের চাহিদা পুরণ করে অতিরিক্ত রস দিয়ে তৈরি হতো সুস্বাদু গুড়-পাটালি। গ্রামীণ জনপদে সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে পুকুরের পাড়ে, রাস্তার ধারে কিংবা পতিত জমিতে বেড়ে ওঠা পরিবেশ বান্ধব খেজুর গাছ এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। ইট ভাটায় জ্বালানি হিসাবে খেজুর গাছ ব্যবহারের কারণে নির্বিচারে নিধন করা হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব মধুবৃক্ষ খেজুর গাছ। ফলে দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে, গাছির অভাবে সেই আগের মত আর খেজুর গাছ কাটা হয় না।

[৪] তবে এখনও শীত মওসুমে পড়ন্ত বিকালে শহর থেকে দলে দলে নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের গ্রাম বাংলার খেজুর রস খেতে আসতে দেখা যায়। এক সময় সন্ধ্যাকালীন সময়ে খেজুর রসের কারণে গ্রামীণ পরিবেশ মধুর হয়ে উঠতো। রস আহরণকারী গাছিদের মধ্যে এক ধরনের উৎসব মুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যেতো। গাছিরা শীতের ভোরে কষ্ট করে রস সংগ্রহের পর যখন সেই রস থেকে সুস্বাদু গুড়-পাটালি তৈরী হয়,সে সময় গ্রামীণ শীতের সকাল স্বাদ-ঘ্রাণে মো-মো করতো। কিন্তু সে পরিবেশ এখন হয়তো নতুন প্রজন্মেও কাছে অবাস্তব মনে হবে। যতই শীত বাড়বে ততই বেশী মিষ্টি রস দেবে খেজুর গাছ। একটি খেজুর গাছ থেকে ৮-১০ বছর ধরে রস সংগ্রহ করা যাবে।

[৫] পুরো শীত মওসুমে গ্রামীণ জনপদে রস,গুড়,পিঠা,পুলি,পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। খেজুর গাছ শুধুমাত্র রস,গুড়-পাটালিই দেয় না,খেজুর পাতা থেকে আকর্ষণীয় পাটি ও জ্বালানি চাহিদা মিটিয়ে থাকে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন,কালের বিবর্তন,বনবিভাগ ও কৃষি বিভাগের বিশেষ কোনো নজরদারি না থাকায় গ্রাম বাংলা থেকে ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ আজ বিলুপ্তির পথে।

[৬] জীবননগর উপজেলার কালা গ্রামের খাজা আহমেদ ও মিনহাজপুর গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন বলেন, আমরা প্রতি বছর খেজুর গাছ থেকে একটি মোটা অংকের টাকা পেয়ে থাকি। আমাদের নিজস্ব গাছের পাশাপাশি গ্রামের কৃষকদের খেজুর গাছ চার মাস সাড়ে চার মাসের জন্য বর্গা নিই। প্রতি গাছের জন্য গাছের মালিককে ৫-৭ কেজি হার গুড় দিয়ে থাকি। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় খেজুর গাছ এলাকা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে গাছ থেকে আশানুরুপ গুড় আমরা সংগ্রহ করতে পারছি না। যেভাবে খেজুর গাছ কাটা হচ্ছে, তাতে এক সময় খেজুর গাছের অভাবে রস সংগ্রহের জন্য গাছ পাওয়া যাবে না।

[৭] উপজেলার ধোপাখালী গ্রামের সাবেক মেম্বার দোজা উদ্দিন বলেন,বর্তমান বাজারে আখের গুড় ও চিনি যে দামে বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানসম্পন্না খেজুর গুড় ও পাটালির দাম কিছুটা হলেও এবছর বেশী পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। গাছির অভাবে খেজুর গাছ কাটা দুস্কর পড়েছে। বর্তমান সময়ে একটি গাছ রস সংগ্রহ পর্যন্ত প্রস্তুত করিতে ৬০-৮০ টাকা হারে খরচ হচ্ছে। অন্যান্য উপরকরণের দাও আগের তুলনায় অনেক বেশী। খেজুরের রস-গুড়-পাটালি আমাদের গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্য। শীতের সময় দুর-দুরান্তের আত্মীয়-স্বজনেরা পিঠা-পুলির উৎসবে মেতে ওঠে। যে কারণে খেজুর রস-গুড়ের চাহিদাও একটু বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ে খেজুর গুড় উৎপাদন একটি লাভজনক ব্যবসা। তবে আমাদের দেশের খেজুর রস ও গুড়-পাটালি যদি বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে সরবরাহ করা যেতো তাহলে গাছিরা অনেক বেশী লাভবান হতেন।

[৮] জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসার সারমিন আক্তার বলেন,শুধু জীবননগর উপজেলায় নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই এখন খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে। গাছিরা অত্যন্ত শিল্প দক্ষতা আর চরম ধৈর্যের সাথে খেজুর গাছের ডাল কেটে গাছের শ্রভ্র বুক বের রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলে। আর এজন্য শীত মওসুম আসার সাথে সাথে গাছিদের কদরও বেশ বেড়ে যায়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উপজেলায় খেজুর গাছের আবাদ না হলেও অযত্মে-অবহেলায় কৃষকদের জমি আইলে কিংবা পতিত জমিতে থাকা বিপুল সংখ্যক গাছ থেকে গাছিরা প্রতি বছর রস, গুড় ও পাটালি উৎপাদন করে থাকে। এ থেকে কৃষকরা প্রতি বছর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীও হন। তবে ইটভাটায় গাছ বিক্রিসহ নানা কারণে উপজেলা থেকে খেজুর বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

[৯] তবে উপজেলার সচেতন মহল মনে করেন,খেজুর গাছ আমাদের অর্থনৈতিক,সংস্কৃতি ও সাহিত্য তথা আমাদের গ্রামীণ জীবনধারার সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে মিশে আছে। খেজুর গাছ আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। তাই এই ঐতিহ্যকে যে কোনো মূল্যে তা রক্ষা করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সম্পাদনা: হ্যাপি

সর্বাধিক পঠিত