প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারায়ণগঞ্জ ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে আসছে বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন

নিউজ ডেস্ক: দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেলপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম। এর সঙ্গে বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন চলাচলের জন্য ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন তৈরির একটি সমীক্ষা প্রকল্প অনুমোদন করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শেষ হবে সমীক্ষার কাজ। বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের জন্য নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রামই হচ্ছে অনুমোদন পাওয়া প্রথম প্রকল্প। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। বণিক বার্তা

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে ওভারহেড ক্যাটেনারি ও সাবস্টেশনসহ ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন নির্মাণের জন্য অনুমোদিত সমীক্ষা প্রকল্পে খরচ হবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে। কারিগরি, অর্থনৈতিক, আর্থিক, পরিবেশগত ও সামাজিক বাস্তবোপযোগিতা বিশ্লেষণ, বিশদ প্রকৌশলগত নকশা প্রণয়ন, বিশদ ব্যয় প্রাক্কলন প্রস্তুতি, ডিপিপি ও টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুতি, পরিবেশের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসন পরিকল্পনাসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কাজ করা হবে প্রকল্পটির মাধ্যমে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা ট্রেনগুলো পরিচালনা করতে প্রায় ৩৫ শতাংশ খরচ কমবে। যাতায়াতে সময় কমবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমবে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এসবের পাশাপাশি প্রকল্পটি রেলওয়ের রাজস্ব আয় বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

প্রকল্পটির জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জ। অন্যদিকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে, যেখান দিয়ে দেশের আমদানি-রফতানি পণ্যের ৯০ শতাংশ পরিবহন হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রামের বিদ্যমান লাইনটি বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করলে তা দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। দেশের অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প।

বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে যে যাত্রী পরিবহন হয়, তার ৫৬ শতাংশই হয় রেলপথে। বিপরীতে রেলপথে পরিবহন হয় ২৭ শতাংশ যাত্রী। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের ৯৬ শতাংশের বেশি হয় সড়কপথে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়কপথের ওপর চাপ কমিয়ে রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বাড়ানোর কথা বলছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩৭ কিলোমিটার। এর সঙ্গে টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনের আরো প্রায় ১১ কিলোমিটার রেলপথ বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। বর্তমানে এ রেলপথটিতে তিনটি প্রকল্প চলমান আছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের মিটার গেজ লাইন বদলে ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন করা হচ্ছে। ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়াল গেজ লাইন ও টঙ্গী-জয়দেবপুরে আরেকটি ডুয়াল গেজ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। একইভাবে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন রেলপথ। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো রেলপথটি ডাবল লাইন হয়ে যাবে। আর এ রেলপথটিকে ঘিরেই বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রকল্পটি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলে আমরা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে জোর দিচ্ছি। ডিজেলের চেয়ে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন একদিকে যেমন জ্বালানিসাশ্রয়ী, তেমনি পরিবেশবান্ধবও। আমরা রেলে উন্নত প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রামের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলোতেও বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তন করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।

২০১৬ সাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের জন্য আলোচনা শুরু করে রেলওয়ে। এ সম্পর্কিত একটি সমীক্ষা প্রকল্পের ওপর ওই বছরের জুলাইয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম পর্যন্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন (ওভারহেড ক্যাটেনারি ও সাবস্টেশন নির্মাণসহ) প্রবর্তনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রণয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে রেলওয়ে।

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশন ছাড়াও পর্যায়ক্রমে দেশের অন্য রেলপথগুলোও বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। ঢাকা থেকে জামালপুর হয়ে রৌমারী পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন তৈরির জন্য প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। আগামী ১ নভেম্বর বিষয়টি নিয়ে রেল ভবনে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এখন রেলপথটি ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন করা না হলেও ভবিষ্যতে করার জন্য সংস্থান রাখা হচ্ছে। জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী সেকশনেও বিদ্যুচ্চালিত ট্রেন প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে।

সর্বাধিক পঠিত