প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মারুফ কামাল খান: ম্যাডাম বেগম খালেদা জিয়ার সার্জারির সিদ্ধান্ত হুট করে একদিনে নেওয়া হয়নি

মারুফ কামাল খান
রেডিও, টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় জোর প্রচার, খালেদা জিয়া বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এক-এগারোর যামানা তখন। তিনি তখন ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল রোডে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিমাখা বাড়িটিতে কার্যত গৃহবন্দী। বহিঃজগতের সঙ্গে প্রায় সব রকমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। খুব প্রভাবশালী একজন স্বজন এক সন্ধ্যায় কম্পিউটারে কম্পোজ করা একটা বিবৃতি পাঠালেন আমার কাছে বিশ্বস্ত লোক মারফত। সেই সঙ্গে হাতে লেখা একটা চিরকুট। ওই বিবৃতিটি যেন আমার কাছে রেখে দিই। ম্যাডাম দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাবার পর আমি যেন সই করে তাঁর নামে এটি মিডিয়ায় পাঠার ব্যবস্থা করি। আমার মাথার ভেতরে তখন ঘূর্ণিঝড় বইছে। ম্যাডামের সরাসরি নির্দেশ ছাড়া এ কাজ আমি করতে পারি না। কিন্তু তাঁকে ফোনে জিজ্ঞেস করা আর মাইক্রোফোনে ঘোষণা করে দেওয়ার মধ্যে তো কোনো তফাৎ নেই। সিভিলিয়ানদের কারও হাতে তখন কোনো ক্ষমতা নেই। আমার খুব ভালো জানাশোনা এমন তিনজন মেজর জেনারেলকে পরপর ফোন করলাম। তিনজনই খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন তখন। প্রথমজন খুব গম্ভীর হয়ে আমার কথা শুনলেন। তারপর বললেন, ‘দেখি যদি আমি কিছু করতে পারি তবে জানাবো।’ দ্বিতীয়জন পরিহাস তরল কণ্ঠে বললেন, ‘জী ভাই এক্স পিএম-এর সঙ্গে আপনার দেখা করার ব্যবস্থা অবশ্যই করে দিতে পারবো। তবে এই দেখা করার পর আপনার নিজের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘দেখুন, আপনার একজন ওয়েল উইশার হিসেবে আমি অনুরোধ করছি তাঁর সঙ্গে এখন ভুলেও দেখা করার চেষ্টা করবেন না। বিপদে পড়ে যাবেন।’

তবুও ঝুঁকি নিয়েই গিয়েছিলাম। আড়াই ঘণ্টা গেটে বসিয়ে রাখলো। বহু দেন-দরবার হলো প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে। বললাম, তাঁর অধীনে কাজ করেছি। জীবনে আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা জানি না। তিনি তো চলেই যাচ্ছেন। একটু দেখা করে বিদায় জানার সুযোগ পাবো না? অবশেষে দেখা করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফেরার শর্তে মিললো অনুমতি সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর। খবর পেয়ে ম্যাডাম ড্রইং রুমে এসে প্রথমে আমাকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। ‘আপনি কেন এসেছেন? কী করে এলেন? বিপদে পড়ে যাবেন তো। ঠিক করেননি। জলদি চলে যান।’ ম্যাডামের সামনে বসেই সেদিন তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। বলেছিলাম, ‘বেগম জিয়ার পরিচয় কেবল তিনি কার কী আত্মীয় সেটা নয়। তিনি কোটি কোটি মানুষের নেত্রী। তাদের আশা-আকাক্সক্ষার উৎস। তিনি জাতির সম্পদ। তাঁর ওপর অগণিত মানুষের আস্থা। তাদের আবেগ-অনুভ‚তির বিপরীতে ম্যাডামের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। তিনি স্বজন বা নেতা যাই-ই হন।’

ম্যাডাম সেদিন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘কোথাও যাবো না আমি। এ দেশেই থাকবো। তাতে যা-হওয়ার হবে।’ তার পর কতো ইতিহাসই তো হয়ে গেলো। দেড় দশক পেরিয়ে গেছে। অকুতোভয়চিত্ত ম্যাডামের সেই মনোবল ও সেই দৃঢ়তা এখনো রোগকাতরতা সত্তে¡ও অটুট আছে বলেই বিশ্বাস করি। তবে আমার নিজের সেই সাহস ও অধিকার এখন অতীতের অন্তর্গত। ম্যাডামের ব্যাপারে তাঁর অসংখ্য অনুসারীর মতো অন্ধকারে ও দূরে থেকে আমি আজ বেদনার্ত কণ্ঠে আবারও সেই বাক্যটি উচ্চারণ করতে চাই, বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু এখনো অগণিত নেতাকর্মীসহ কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার উৎস। কাজেই তাঁর যে কোনো ব্যাপার লুকিয়ে চুরিয়ে, গোপন করে, কুক্ষিগত করে রাখার চিন্তা ছাড়–ন। সবাই না জানলেও বেমালুম বুঝতে পারছি, তিনি ভালো নেই। তাঁর দেহ থেকে ‘ম্যালিগন্যান্ট’ বলে সন্দেহভাজন লাম্প অপারেশন করে অপসারণ করা হয়েছে। এটা খুবই গুরুতর ব্যাপার। এই সার্জারির সিদ্ধান্ত হুট করে একদিনে নেওয়া হয়নি। কিন্তু তা গোপন রাখা হয়েছিলো। অপারেশনের পরেও সবকিছু স্বাভাবিক ও খুব হালকা করে দেখানো হচ্ছে। এর পেছনে কী যুক্তি আমার মাথায় আসে না।

যারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক তাদের প্রতি আমার সবিনয় নিবেদন পর্দার অন্তরালে রেখে তাঁকে বিস্মৃতি ও অকার্যকারিতার দিকে ঠেলে দেবেন না দয়া করে। ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা অসংখ্য মানুষের উদ্বেগের বিষয়। তাই স্বচ্ছতার সঙ্গে সবকিছু রাখুন পাদপ্রদীপের আলোয়। কেবল নিজেরা ইতিহাসের দায় না নিয়ে ম্যাডামের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের দিয়ে নিয়মিত বুলেটিন প্রচারের ব্যবস্থা রাখুন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেদনার্ত হওয়া ও দোয়া করা ছাড়া আমার তেমন কিছু করার নেই। সেই সঙ্গে সকলের কাছে মিনতি করি তাঁর জন্য অন্তরের সকল আকুতি ঢেলে প্রার্থনা করার।
maruf kamal khan-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ন।

সর্বাধিক পঠিত