প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মানবাধিকার সংস্থার পরিচয়ে প্রতারণা: অস্ত্রসহ প্রতারক আটক

সুজন কৈরী : [২] কথিত মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে শাহীরুল ইসলাম সিকদার নামে একজনকে আটক করেছে র‌্যাব।

[৩] শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় শাহীরুলের নিজ বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় র‌্যাব-৪। এ সময় শাহীরুলকে আটক ও প্রতারণায় ব্যবহৃত ৩টি বিদেশী পিস্তল, ১টি শর্টগান, ১টি এয়ারগান, ১টি এয়ার রাইফেল, ২৩৭ রাউন্ড গুলি, ৫টি ম্যাগাজিন, ৫টি খালি খোসা, ২২টি কার্তুজ, ৪টি চাকু, ১টি লোহার স্টিক, ৩টি ডামি পিস্তল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের মাধ্যমে চাকরির আবেদন ফরম, চুক্তিপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ব্যানার, প্যাড, স্ট্যাম্প, ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, গোপন ক্যামেরা, পাসপোর্ট, ভিজিটিং কার্ড, আইডি কার্ড, নেইম প্লেট, বিভিন্ন নামীদামী ব্যক্তির সাথে তোলা ছবি, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, পাসপোর্ট, মানি রিসিভ বহি, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালমাল জব্দ করা হয়েছে।

[৪] র‌্যাব জানায়, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা পুরাতন হলেও মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় প্রদানকারী শাহীরুলের প্রতারনার ইতিহাস ধৃষ্টতাপূর্ন এবং ভিন্নধর্মী। শাহীরুল একজন শীর্ষ পর্যায়ের প্রতারক। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেড নামক কোম্পানী খুলে, ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন ও চাকরি প্রদানের নামে প্রতারনা এবং বিত্ত বৈভবের মালিক শাহীরুল ছিলেন সকলের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

[৫] শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী সম্প্রতি প্রতারক শাহিরুলের বিরুদ্ধে র‌্যাব-৪ এর কাছে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর একটি গোয়েন্দা দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে শাহীরুলকে আটক করা হয়।
তিনি বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ শাহীরুলের নিজ জেলা বৃাহ্মনবাড়িয়া। কর্মজীবন শুরু করেন গাড়ি ব্যবসা দিয়ে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৌখিন পরিবহনে কাজ করেন বলে জানা যায়। এরপর শুরু করেন নতুন ব্যবসা প্রতারণা। ২০০৩ সাল থেকে শুরু করেন সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহ। এরপর ধীরে ধীরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা।

[৬] ২০১৪ সালের দিকে রামপুরা এলাকায় প্রতিষ্ঠান খুলে প্রতারণামূলক কাজ দিয়ে নতুনভাবে কর্মজীবন শুরু করেন। অতি অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার লোভে তিনি ওই কোম্পানীর নামে প্রতারণামূলকভাবে অগণিত মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাৎ করে শাহীরুল অবৈধ সম্পদের মালিক হতে শুরু করেন।

[৭] র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, এক সময় প্রতরণার নানান অভিযোগ আড়াল করতে শাহীরুল তার অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেডের পরিবর্তে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি বেনামী মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিতেন। ক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি নামিদামি ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলো প্রদর্শন করে এবং বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন। গ্রেপ্তার শাহীরুল তার প্রতারণার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার ও শিক্ষিত বহু নারী ও পুরুষকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী, বিক্রয় কর্মকর্তা, লাইনম্যান ইত্যাদি হিসেবে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাৎ করেন।

[৭] শাহীরুলের প্রতারনার কৌশলের বিষয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, শাহীরুল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগের লক্ষ্যে চাকরির চটকাদার বিজ্ঞাপন দিতেন। দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আবেদন করলে তাদের কৌশলে ভূল বুঝিয়ে তার কোম্পানীর মাধ্যমে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা জামানত হিসেবে নিতেন। সরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকরির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা নিতেন। শাহীরুল নিজেকে শুটিং ক্লাবের সদস্য বলে পরিচয় দিতেন। এছাড়া প্রশিক্ষণ, ইউনিফরম ও আনুসাঙ্গিক খরচ হিসেবেও টাকা নিতেন তিনি।

[৯] এভাবে অগণিত মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নামমাত্র কয়েকজনকে নিয়োগ দিয়ে বাকি ভুক্তভোগীদের টাকা আত্মসাৎ করেন শাহীরুল। দীর্ঘদিন তার অফিস ও বাসায় ঘুরাঘুরির পরও চাকরি না পেয়ে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে তার কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন ভয়ভীতিসহ জীবননাশের হুমকি দেন।শাহীরুল নিজেকে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ভূয়া পরিচয় প্রদান ও চাঁদাবাজি করার অপরাধে তার নামে রামপুরা থানায় চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলা রয়েছে।

[১০] সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনুসন্ধানে র‌্যাব জানতে পেরেছে, প্রতারণার কৌশল হিসেবে শাহীরুল হোমল্যান্ড হাউজিং এন্ড ডেভলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করে বেশ কয়েকজন মানুষকে ফ্ল্যাট ও প্লট দেওয়ার কথা বলে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সরকারের অনুমোদন ছাড়া হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, হোমল্যান্ড হাউজিং এন্ড ডেভলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড, হোমল্যান্ড বেভারেজ এন্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং মাদারল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করে প্রতরণা করেন শাহীরুল। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কোনও অফিসিয়াল সাইনবোর্ড নেই।

[১১] গ্রেপ্তার শাহিরুল বাংলাদেশ আউট সোর্সিং এন্ড পাওয়ার সাপ্লাইয়ার্স এসোশিয়েশনের সভাপতি হিসেবে জাহির করে অধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়াসহ অর্থ আত্মসাতের পর যাতে কেউ মুখ খুলতে না পারে সেজন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
এছাড়া শাহীরুল সরকারী কর্মকর্তা না হয়েও ভূয়া পরিচয় দেন এবং সরকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর নকল করেন।
র‌্যাব-৪ এর সিও মোজাম্মেলন হক বলেন, প্রতারণার শিকার অনেক ভুক্তভোগী র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। সকলের বক্তব্য অনুযায়ী পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত