প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্ষণ বাড়ছেই, আমরা কি জাহেলিয়াতের যুগে ফেরত যাচ্ছি

রাশিদ রিয়াজ : ৮ মাসে ধর্ষণের শিকার ৮১৩ কন্যা শিশু, এছাড়াও গত ৮ মাসে দেশে ৯ জন অপহরণ, ১৪০ জন পাচারের শিকার ও ১১২ জন কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যাশিশু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশে এসব তথ্য তুলে ধরেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, মাদকাসক্তি, অপসংস্কৃতির ছোবল এক কথায় ধর্ষক হওয়ার মত নষ্ট চরিত্রের বিভিন্ন উপকরণ ও সুযোগ এখন সহজ লভ্য। একটি নারীকে ধর্ষণ যেনো বিনোদনে রুপ পাচ্ছে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা মানে মানবতাকে হত্যা। আর একজন নারীকে ধর্ষণ করার পর সে জীবিত থাকলেও মানসিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। মানুষ হিসেবে সে খুব কমই স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসতে পারে। আর ধর্ষকের মনুষ্যত্যের মৃত্যু তো আগেই হয়ে যায় তা না হলে কিভাবে সে বা পালাক্রমে ধর্ষকরা নারীদের নির্যাতনের এ ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়। আমরা নারীর ক্ষমতায়ন চাই, এজন্যে দরকার নারীর সামাজিক নিরাপত্তা। সে যেনো ঘরে ও বাইরে শিক্ষার জন্যে বের হতে পারে। প্রস্ফুটিত ফুলের মতই নিজের বিকাশ ঘটাতে পারে। কোভিড মহামারীর কারণে লকডাউন বা অর্থনৈতিক সংকটের ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার বাল্য বিয়ে ঘটেছে। এর পেছনেও আছে নারীর নিরাপত্তার অভাব। আমাদের মনে ধর্ষক মন সুযোগ পেলেই কেনো নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করে এবং ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটায় তা নিয়ে মসজিদের খুৎবায় আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। কন্যা শিশুদের হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, উত্ত্যক্ত ও অবহেলা এভাবে বাড়তে থাকলে তা মহামারীর আকার ধারণ করবে। এথেকে আমি বা আপনার বা যে কারো পরিবার রেহাই পাবে না।

সুপ্রিয় পাঠকের কাছে এ লেখাটি দীর্ঘ হওয়ার কারণে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। দেশে ও বিদেশে ধর্ষণ ও নির্যাতন কিভাবে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে ঘায়েল করছে তা অবর্ণনীয়। তারপরও বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করার জন্যে আপনাদের ধৈর্যসহকারে প্রতিবেদনটি পড়ার সবিনয় অনুরোধ করছি। কারণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের নিরাপত্তা অর্থনৈতিকভাবেও জরুরি। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৩২টি দেশ নারীদের অনলাইনে আরো বেশি করে সুযোগ করে না দেওয়ায় বিশে^র জিডিপি ১২ হাজার ৬শ কোটি ডলার কম হয়েছে। করোনাভাইরাসের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তার অভাবেই। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশন ও অ্যালায়েন্স ফর অ্যাফোর্ডেবল ইন্টারনেটের এ প্রতিবেদনে আরো বলা হচ্ছে ডিজিটাল বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে এবং এর ফলে এত বিশাল পরিমান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে দেশগুলোর সরকারগুলোকে। আগামী ৫ বছরে যদি নারীদের মধ্যে এধরনের বৈষম্য হ্রাস করতে পারে তাহলে দেশগুলোর অর্থনীতিতে ৫২৪ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত যোগ হবে। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধা যেমন প্রয়োজনীয় অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, স্বচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং নারীদের ডিজিটাল দক্ষতা ও স্বাক্ষরতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে নীতিমালা এসব দেশে এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। নারী অধিকার প্রচার-প্রসারের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সুরক্ষাবিষয়ক দিকগুলো নিশ্চিত করা জরুরি। এবং পুরুষদের প্রায় অর্ধেক ইন্টারনেটে যুক্ত হলেও নারীদের বেলায় পরিমাণটা এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। ২০১১ সালের পর এ ব্যবধান না কমায় দেশগুলোর সরকার প্রতিবছর ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার কর থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রিয় পাঠক হয়ত বলবেন ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মত বিষয়ের সঙ্গে এসব বিষয়ের সম্পর্ক কি বা তা প্রাসঙ্গিক কি না। অবশ্যই এটি একটির সঙ্গে অপরটির সঙ্গে যুক্ত। নারীর ক্ষমতায়ন হলে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে সে নিগৃহীত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। পত্রিকার পাতা খুললে আমরা দেখি মা ও মেয়েকে ধর্ষণের মত ঘটনার সংবাদ। ধর্ষণ যে প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে ঘটাচ্ছে এবং এধরনের নিকৃষ্ট অপরাধ সমাজে বাড়ছে তা শুধু সমাজকে কলুষিত করছে তা নয় নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষমতায়নে চরম বাধার সৃষ্টি করছে। বিশে^র সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এধরনের নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি কমবেশি একই রকম। সেক্স ফ্রি বা দুজনের সম্মতিতে যৌনতা, ন্যুড পার্ক, নৈশ ক্লাবের অনাচার, বিকিনি সংস্কৃতি এমন এক ভয়ানক পর্যায়ে চলে গেছে যে মানুষের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি সেক্স ডল ব্যবহার করতে শুরু করেছে। মানুষের প্রতি আত্মিক দরদ, অনুভূতি ভুলে ক্রমশ সে যান্ত্রিক ও পাশবিক হয়ে উঠছে।

ইসলামে বিবাহবহির্ভূত যেকোনো যৌন সঙ্গমই অপরাধ। তাই ধর্ষণও এক প্রকারের ব্যভিচার। অনেক সময় মুক্ত বিবেকের মানুষও বলেন দুজনের সম্মতিতে যৌনতা হলে করার কি আছে। মাই বডি মাই চয়েস এমন স্লোগানও শোনা যায়। কিন্তু প্রলোভন দিয়ে, প্রেমের ভান করে বা সংকটের সময়ে সহায়তার হাত এগিয়ে দিয়ে কৌশলে অনেক নারীর সম্ভ্রম কেড়ে নেওয়া বা শেষ পর্যন্ত তাকে শারীরিকভাবে মিলিত হতে বাধ্য করা হয়। এরপর দুজনের সম্মতি আর টেকে না। এজন্যেই ইসলামি আইন শাস্ত্রে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারকারীর শাস্তির অনুরূপ। এমনকি ইসলামি স্কলাররা ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যভিচার সুস্পষ্ট হারাম এবং শিরক ও হত্যার পর বৃহত্তম অপরাধ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ সূরা আল ইসরা: ৩২

হাদিসে আছে সেই মুসলিম যার হাত অন্যের কোনো ক্ষতি করে না। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘ব্যভিচার করো না’-এর চেয়ে ‘ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশি কঠোর বাক্য। ’ এর অর্থ যেসব বিষয় ব্যভিচারে ভূমিকা রাখে সেগুলোও হারাম। অনেক সময় নিরীহ ধর্ষিতাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। ধর্ষক নিরাপদে রক্ষা পায়। অথচ হজরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষককে শাস্তি দেন। ’ -ইবনে মাজাহ: ২৫৯৮

এমনকি সরকারি মালিকানাধীন এক গোলাম গণিমতের পঞ্চমাংশে পাওয়া এক দাসির সঙ্গে জবরদস্তি করে ব্যভিচার (ধর্ষণ) করে। এতে তার কুমারিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। হজরত উমর (রা.) ওই গোলামকে কশাঘাত করেন এবং নির্বাসন দেন। কিন্তু দাসিটিকে সে বাধ্য করেছিল বলে তাকে কশাঘাত করেননি।’ সহিহ বোখারি: ৬৯৪৯

ইসলামে ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশ’ দোররা মারা হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই শাস্তি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ সূরা নূর: ২

ধর্ষণের ক্ষেত্রে দু’টো বিষয় লক্ষ্যণীয়। ১. ব্যভিচার, ২. বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন। প্রথমটির জন্য পূর্বোক্ত ব্যভিচারের শাস্তি পাবে। পরেরটির জন্য ইসলামি আইনজ্ঞদের এক অংশ বলেন, মুহারাবার শাস্তি হবে। মুহারাবা হলো, পথে কিংবা অন্যত্র অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়া ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা। এতে কেবল সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হতে পারে, আবার কেবল হত্যা করা হতে পারে। আবার দু’টোই হতে পারে। মালেকি মাজহাবের আইনজ্ঞরা মুহারাবার সংজ্ঞায় সম্ভ্রম লুট করার বিষয়টি যোগ করেছেন। তবে সব ইসলামি স্কলারই মুহারাবাকে পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, নিরাপত্তা বিঘ্নিতকরণ ও ত্রাস সৃষ্টি ইত্যাদি অর্থে উল্লেখ করেছেন। মুহারাবার শাস্তি আল্লাহতায়ালা এভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলিতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো- তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্চনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ সূরা মায়েদা: ৩৩

কারণ হাঙ্গামা ও ত্রাস সৃষ্টি করে করা অপরাধের শাস্তি ত্রাস ও হাঙ্গামাহীন অপরাধের শাস্তি থেকে গুরুতর। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু না হলে তার মৃত্যুদণ্ড নেই। কেবল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। পক্ষান্তরে ইসলামে বিবাহিত কেউ ধর্ষণ বা ব্যভিচার করলে তার শাস্তি পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলেছে। ধর্ষণের সঙ্গে যদি আরও কিছু সংশ্লিষ্ট হয়- যেমন ভিডিওধারণ, ওই ভিডিও প্রচার ইত্যাদি; তাহলে আরও শাস্তি যুক্ত হবে। তবে এসব শাস্তি কেবল রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অনুমোদনপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োগ করবে, ব্যক্তি পর্যায়ের কেউ নয়।

বিশে^র সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এমন শীর্ষ ১০টি দেশ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা (১৩২.৪০ শতাংশ), বতসোয়ানা (৯২.৯০ শতাংশ), লেসোথো (৮২.৯০ শতাংশ), এসওয়াটিনি (৭৭.৫০ শতাংশ), বারমুদা ৬৭.৩০ (শতাংশ), সুইডেন (৬৩.৫০ শতাংশ), সুরিনাম (৪৫.২০ শতাংশ) ও কোস্টারিকা (৩৬.৭০)। অন্যদিকে বিশ্বে প্রতি ঘণ্টায় পুরুষের হাতে খুন হয় ৬ নারী। দুই বছর আগে জাতিসংঘের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বামী বা নিকট আত্মীয়দের হাতেই বেশি খুন হন নারীরা। বৃটিশ বাংলাদেশি শিক্ষিকা সাবিনা নেসাকে লন্ডনে পিটিয়ে হত্যা করার পর বৃটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য মিরর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রতি তিন দিনে পুরুষের হাতে একজন নারী খুন হন। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফেমিসাইড সেন্সাসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, নারীদের হত্যাকাণ্ডের ৬২ শতাংশ সংগঠিত হয় তাদের বর্তমান অথবা সাবেক সঙ্গীর দ্বারা। ফেমিসাইড তাদের গবেষণায় আরো বলে, নিহত নারীদের ৩৪ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। নির্যাতনের শিকার ৫৯ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন বর্তমান অথবা সাবেক সঙ্গী বা পুরুষ আত্মীয়দের দ্বারা। ৬২ শতাংশ নারী যারা তাদের বর্তমান অথবা সাবেক সঙ্গীর হাতে খুন হন তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৪৩ শতাংশ নারী খুন হন সঙ্গীর সাথে আলাদা হওয়ার পর অথবা আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পর।

গত ৫ অক্টোবর মার্কিন মিডিয়া সিএনএন’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফরাসি ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন নির্যাতনের শিকার দুই লাখেরও বেশি নাবালক। গত ৭ দশকে এসব নির্যাতনের তথ্য উঠে এসেছে এক স্বাধীন তদন্তে। ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের সদস্যরা এধরনের নির্যাতন করেছেন, গির্জার এ প্রতিবেদনটিতে তা বলেছেন তদন্ত কমিশনের প্রধান জিন-মার্ক সাউভি। ১৯৫০ থেকে গত বছর পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার নাবালক। তবে এ সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি হবে যদি চার্চের অন্যান্য কর্মচারিদের হাতে নির্যাতনের ঘটনা হিসেবে আনা হয়। এদের মধ্যে রয়েছে ক্যাথলিক স্কুল এবং যুব কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারি। সাউভি বলেন ফ্রান্সের ক্যাথলিক চার্চে অন্তত ২৯শ থেকে ৩২শ ধর্মযাজক ছিলেন যারা এধরনের নির্যাতন করেছেন। ফরাসি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চের কমিশনের এ জরিপে ২৮ হাজার মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যাদের বয়স ১৮ বছরের বেশি।

এছাড়া জাতিসংঘের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী নারীরা ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন চারগুণ বেশি এবং ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারী কলেজ ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনা তিনগুণ বেশি। হিজড়া মানুষ এবং প্রতিবন্ধীদের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। বেশিরভাগ দেশে যৌন নিপীড়ন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন আছে, তাদের অনেকগুলিই অপর্যাপ্ত, অসঙ্গতিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা হয় না। ফলে এধরনের অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করছে।

আবার এমন কিছু দেশ আছে যেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। গত বছর ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ প্রতি ১০ লাখ নাগরিকের প্রতি ধর্ষণের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে দেশগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে রিপোর্ট না করা ধর্ষণের ঘটনাকে বিবেচনায় নেয় না। তালিকা অনুসারে, লিচেনস্টাইন তালিকার শীর্ষে রয়েছে। ৩৮ হাজার ১২৮ জন জনসংখ্যার দেশটিতে গত বছর ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মিশর, প্রতি ১ লাখ মানুষের প্রতি ধর্ষণের হার ০.১০ শতাংশ। মিশরের জনসংখ্যা হচ্ছে ১০ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৪ জন। দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক তৃতীয় স্থানে রয়েছে, গত বছর দেশটিতে ৪৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মোজাম্বিকের জনসংখ্যা ৩১,২৫৫,৪৩৫, ধর্ষণের হার ০.২০ শতাংশ। মধ্য এশিয়ার দেশ আজারবাইজান, আর্মেনিয়া এবং তাজিকিস্তান যথাক্রমে তালিকার চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করেছে। আজারবাইজানে গত বছর ১৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। জনসংখ্যা ১০ কোটি ১৩ লাখ ৯ হাজার ১৭৭ জন। ধর্ষণের পরিমান হার ০.২০ শতাংশ। জনসংখ্যা হচ্ছে ২ কোটি ৯৬ লাখ ৩ হাজার ২৪৩ জন। আর্মেনিয়ায় একই সময়ে ১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাজিকিস্তানে গত বছর ২৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তালিকার সপ্তম স্থান অধিকারী – লেবানন, এর জনসংখ্যা ৬ কোটি ৮২ লাখ ৫ হাজার ৪৪৫ জন। ১৯টি ধর্ষণ মামলার খবর পাওয়া গেলে মধ্যপ্রাচ্যের এদেশে ধর্ষণের ০.৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অষ্টম স্থানে থাকা তুর্কমেনিস্তানে ধর্ষণের হার ছিল ০.৬০ শতাংশ এবং এ সংখ্যা ছিল ২৭টি। জনসংখ্যা হচ্ছে ৬০ লাখ ৩১ হাজার ২শ। তালিকায় নবম স্থানে রয়েছে সার্বিয়া যেখানে ধর্ষণের হার ছিল ০.৭০ শতাংশ। সংখ্যায় তা ৭২টি। আর জনসংখ্যা হচ্ছে ৮৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৭১ জন। দশম স্থানে থাক আলবেনিয়ায় গত বছর ২৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের হার ছিল ০.৭০ শতাংশ। জনসংখ্যা হচ্ছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৭ হাজার ৭৯৭ জন। এ তালিকায় থাকা ইয়েমেন, নেপাল ও সিরিয়ায় ধর্ষণের হার হচ্ছে ০.৮০ শতাংশ। জাপান ও গিনিতে এ হার ১ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ বলছে বাংলাদেশের ধর্ষণের ঘটনা প্রতি লাখে প্রতি ৯.৮২ জন। গত বছর থেকে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৬৮২টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

বর্তমানে, যৌন নিপীড়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত অপরাধ, তবুও সবচেয়ে কম রিপোর্ট করা হয়। গত দুই দশক ধরে, যৌন নিপীড়নের দৃশ্যপট পরিবর্তন এবং এই ধরনের অপরাধের শিকারদের ক্ষমতায়নের জন্য অনেক কাজ করা হলেও নির্যাতন কমেনি। বেশ কয়েকটি সহায়ক, প্রগতিশীল সংস্কার সত্ত্বেও, যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান প্রতিফলিত করে যে অনেক অপরাধ এখনও পুরোপুরি সমাধান করা বা বোঝা যায় না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যে কারণে এক্ষেত্রে কি উন্নতি দরকার এবং কোথায় উদ্যোগ নিতে হবে তা বোঝার জন্য সাম্প্রতিক যৌন হয়রানির পরিসংখ্যানের সাহায্যে বর্তমান এ অপরাধ দমন পদ্ধতির শক্তি এবং দুর্বলতাগুলো বিশ্লেষণ এবং সমাধান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। উদ্বেগজনক যৌন সহিংসতার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যৌন নিপীড়ন সম্পর্কে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হল যে, দায়ের করা যৌন নিপীড়নের প্রতিবেদনগুলির মধ্যে মাত্র ৫% মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সব কিশোর যৌন নিপীড়নের শিকার ৮২% নারী।

প্রাপ্তবয়স্ক ধর্ষণের শিকার ৯০% নারী। ৪১% আদিবাসী ভারতীয়দের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন একটি অপরিচিত ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয়। ১৪-১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি শঙ্কা ছিল; গত বছরে ছয়জনের মধ্যে একজন (১৬.৩%) যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সালে ৬৫২,৬৭৬ এর বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছে। ধর্ষণ-বহির্ভূত যৌন নিপীড়নের তথ্য পরিসংখ্যান দশ লাখের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে এটি গত এক দশক ধরে ২.৯% বার্ষিক হারে বাড়ছে এবং এই প্রবণতা হ্রাস পাওয়ার কোন লক্ষণ যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪০% এর বেশি নারী যৌন সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন। দেশটিতে ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান অনুসারে যৌন নির্যাতন ৪১.৮ শতাংশ নারীকে প্রভাবিত করেছে যারা ধর্ষণ ছাড়া অন্য যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। ৮০ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তাদের ২৫ বছর বয়সের আগে। ২৫ বছরের আগেই ৭৯.৬% নারী এক বা একাধিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি ২০ শতাংশ মার্কিন পুরুষ যৌন সহিংসতার কবলে পড়েন বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেইনের পরিসংখ্যান। সংশোধনী ব্যবস্থার বাইরে, বেশিরভাগ ধর্ষণের শিকার নারী। গবেষণায় দেখা গেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২১.৪% পুরুষ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে এবং তারা কারাগারের বাইরে এই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আবার যৌন নিপীড়নের শিকার এক-চতুর্থাংশের বয়স ১০ বছরের কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যৌন নিপীড়নের শিকার পুরুষদের মধ্যে আনুমানিক মোট ২৮ শতাংশের বয়স ১০ বছর বা তার কম বয়সে তাদের প্রথম হামলার শিকার হতে হয়।

তবে ২০ শতাংশের কম ধর্ষণের খবর মেলে। ধর্ষণ এখনও লজ্জাজনক বলে বিবেচিত হয়, তাই ভুক্তভোগীরা তা জানাতে অনীহা বোধ করে। একই সাথে প্রতিবন্ধী নারী এবং পুরুষরা সক্ষম শরীরের তুলনায় যৌন নিপীড়নের দ্বিগুণ ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। পরিসংখ্যান দেখায় যে এই জঘন্য হামলার বেশিরভাগই যত্নের পরিবেশে (সুবিধা এবং বাড়ির যত্ন উভয়ই) করা হয়েছিল। তবুও, এগুলি হাসপাতাল বা সাধারণ অনুশীলনকালীন সেশনের সময়, পাশাপাশি পৃথক থেরাপি সেশনেও ঘটে।

গত বছর মার্কিন সেনাবাহিনীতে প্রায় ২০ হাজার যৌন নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়। ২০১০ সাল থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীর মধ্যে যৌন নিপীড়নের মাত্রা নিয়ে একটি গবেষণায় যৌন সহিংসতার পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে যার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের সময় এক চতুর্থাংশ ঘটেছে। শিশু যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান হতাশাজনক। ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর -কিশোরীরা যৌন নিপীড়নের সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণীতে ছিল, চারজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন (২৭.৩%) জীবদ্দশায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৭০ জন নারী আত্মহত্যা করে যৌন নির্যাতনের পর।

উদ্বেগজনকভাবে, এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ২.৮৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। আর যৌন প্রতিহিংসার ঘটনা২০১৯ সালে ১.৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। একই বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৩% নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৬ জনের ১ জন নারী ধর্ষিত হবে। ৩৩ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ককে ধর্ষণ করেছে। এই বিরক্তিকর পরিসংখ্যানটি আগামী তিন বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি নারী ধর্ষিত হয়েছে। আবার নারী বিচার বিভাগ থেকে যৌন হয়রানির পরিসংখ্যান বলছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন অন্তরঙ্গ অংশীদার দ্বারা প্রতি বছর ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি নারী এবং ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭শ পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এই চমকপ্রদ চিত্রটি হতাশাজনক এবং উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন সামাজিক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা এই যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের জন্য ফোকাস গ্রুপ তৈরি করেছেন। পুরুষ ধর্ষণ পরিসংখ্যান দেখায় যে পুরুষ যৌন নিপীড়নের বেশিরভাগ অপরাধী পুরুষ। এই শিকারিরা সমকামী বা পুরুষ উভয়কেই ধর্ষণ করতে পছন্দ করে কারণ ধর্ষণ যৌন শুধু বদ খাসলত নয়, আগ্রাসন ও আধিপত্যের কাজ হিসেবেও পরিগণিত। প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে নারীরাও পুরুষদের প্রতি যৌন সহিংস আচরণ করছেন। বেশিরভাগ পুরুষ যারা যৌন নির্যাতনের ( যেকোন বয়সে) অভিজ্ঞতা লাভ করে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন নির্যাতনকারী হয়ে ওঠে না। বন্দুক সহিংসতার পরিসংখ্যান অনুসারে, হামলাকারীরা বিভিন্ন অস্ত্র, শারীরিক শক্তি বা এমনকি শক্তি প্রয়োগের হুমকি ব্যবহার করতে পারে। অন্যরা, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিসংখ্যান অনুসারে, কাউকে জমা দিতে হুমকি দেওয়ার জন্য ব্ল্যাকমেইল বা তাদের ওপর কর্তৃত্ব খাটায়। দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর কারাগারে প্রায় ১৬% পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল-এর ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় কিশোর কারাগারে নারী ধর্ষণের পরিসংখ্যান বলছে ৬০% এরও বেশি পুরুষ এই সুবিধাগুলিতে যৌন সহিংসতার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। শুধুমাত্র ফ্লোরিডায়, মোট ১ লাখ ৪৭ হাজার পুরুষ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

ফ্লোরিডায়, গত এক দশকে ২০.৪% পুরুষ বা ১৪ লাখ ৭৭ হাজার পুরুষ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পুরুষ যৌন নিপীড়নের ২৫% এরও বেশি ১০ বছর বয়সের আগে তাদের প্রথম হামলার শিকার হয়। প্রায় ৪০% প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যারা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে যৌন সহিংসতার কবলে পড়ে মানসিক অবসাদে ভোগেন। গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, ৩৯.৭% পুরুষ যারা তাদের সঙ্গীর কাছ থেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যেমন ধর্ষণ, ডাকাতি বা শারীরিক সহিংসতা, দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যেমন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এবং অন্যান্য ধরনের মানসিক আঘাতের শিকার হয়ে পড়েন। নিউইয়র্কের পরিসংখ্যান দেখায় যে শহরের ১৮% ধর্ষণের মধ্যে একজন পুরুষ এ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফোকাস গ্রুপ অনুসারে, ২০১৯ সালে তার আগের বছরের চাইতে পুরুষ ধর্ষণের শিকার পুরুষদের সংখ্যা ৫.৭% বেশি। ৮০% এর বেশি যৌন নিপীড়ন হয় পরিচিতের দ্বারা। আত্মীয়, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, প্রাক্তন পত্নী – দুর্ভাগ্যবশত, সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের তালিকা হল এমন এক ব্যক্তি যাদের প্রায়শই ভুক্তভোগীর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কোনো সময় ছিল। এর ফলে ধর্ষণের শিকাররা বাধ্যতামূলক বা মানসিক চাপের কারণে এই ধরনের ঘটনা জানানো থেকে দূরে সরে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে শিশু শিকারের প্রায় ৯৫% তাদের যৌন আক্রমণকারী কে তা জানত। রেইনের পরিসংখ্যান আরো বলছে ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশু শিকারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শতাংশ (৯৩.৯৮%) তাদের আক্রমণকারীর সাথে পরিচিত ছিল। কিশোরী যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান দ্বারা প্রতিফলিত এই প্রায় সব ক্ষেত্রেই, শিশুটি যৌন নির্যাতন সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তাদের আক্রমণকারীর সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় (১০ ঘন্টার বেশি, একটি পূর্ণ সময়কাল বা সেগমেন্টে) কাটিয়েছিল।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের মিথ্যা দাবির হার ১০% গড় চিহ্নের নিচে। যদিও ধর্ষণের মিথ্যা দাবির মত ঘটনা ঘটে, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ধর্ষণের অধিকাংশ দাবি বৈধ, যেমন যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। যৌন নিপীড়নের জন্য বার্ষিক বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়। কলেজের যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান এবং অন্যান্য প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায় যে, যদিও যৌন নির্যাতন তাদের শিকারদের উপর জঘন্য আর্থিক খেসারত নেয় এবং ভয়ানক মানসিক ক্ষতি করে, তবে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনাগুলির জন্য খুব কমই আরেকটি খরচ হয় – আর্থিক দিক থেকে সমাজের খরচ। যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যান অনুসারে, যখন আমরা তহবিল খরচ এবং যৌন নিপীড়ন পরিষেবা চালানোর খরচ করি, ফলস্বরূপ নিম্ন শিক্ষামূলক আকাঙ্ক্ষা (শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়া কিশোর -কিশোরীদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা) এবং ক্ষতিগ্রস্তদের হারানো উপার্জনের খরচ যারা এমন এক পর্যায়ে আঘাত পেয়েছে যেখানে তারা কাজ করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রে এধরনের বার্ষিক খরচ ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং তা প্রতি বছর গড়ে ১.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৬৯ শতাংশ ১২ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারী। ১২-৩৪ বয়সের সীমা যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে এক বছরে ধর্ষণের শিকারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে জানা গেছে।

এমনকি অন্যান্য ছাত্রদের তুলনায় ট্রান্সজেন্ডার কলেজ ছাত্রদের ধর্ষণের হার ৫% বেশি। ২০১৯ সালে ৪৬% উভলিঙ্গ নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, যা সাধারণ নারীর ক্ষেত্রে হার ছিল ১৭%। উপরন্তু, কলেজ ক্যাম্পাসের পরিসংখ্যানগুলিতে যৌন নিপীড়ন একটি আকর্ষণীয় পারস্পরিক সম্পর্ক দেখায়, যা প্রকাশ করে যে উভলিঙ্গ পুরুষরা একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়, তাদের মধ্যে ৪৭% যৌন সহিংসতার শিকার হয়, ২১% বৈষম্যমূলক পুরুষের তুলনায়। তবে ধর্ষণের শিকারদের অধিকাংশই (৯০%) নারী। একজন আমেরিকান প্রতি ৯৩ সেকেন্ডে যৌন নিপীড়নের শিকার হন। সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যৌন নিপীড়ন বাড়ছে। গড়, রাজ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ (জাতিগত তথ্য অনুসারে ধর্ষণের পরিসংখ্যান সহ) দেখায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের (বয়স ১২ বা তার বেশি) প্রায় ৩২৫,৫৬৬ জন শিকার হয়। আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার দ্বিগুণ শঙ্কা রয়েছে। প্রতিবন্ধী পুরুষ এবং নারী উভয়েই সক্ষম-পুরুষ এবং নারীদের তুলনায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার শঙ্কা বেশি অনুভব করেন। এছাড়া ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েরা এবং নারীদের অন্য বয়সের মেয়ে বা নারীদের উপর হামলা বা ধর্ষণের আশঙ্কা ৪ গুণ বেশি।

প্রায় ২৩% স্কুল বা কর্মক্ষেত্র, কেনাকাটা, বা কাজ চালানোর জন্য ভ্রমণ করছিল। যখন তাদের উপর হামলা করা হয়েছিল তখন ১৯% কাজ করছিল, ৯% স্কুলে পড়ছিল, এবং ১৯% অন্য কিছু কাজ করছিল।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ছয়জন মার্কিন নারীর মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের চেষ্টা বা সম্পূর্ণ যৌন নির্যাতনের শিকার।

যৌন নিপীড়নের তথ্য অনুসারে, প্রতি ছয়জন মার্কিন নারীর মধ্যে একজন সম্ভবত তার জীবদ্দশায় একটি চেষ্টা বা সম্পূর্ণ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই অনুপাত গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে, এবং বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে পরবর্তী অর্ধ দশক ধরে একই রকম হারে এধরনের ঘৃণ্য নির্যাতন বাড়তে থাকবে। ৩৩ জন মার্কিন পুরুষের মধ্যে ১ জন (নারী যৌন নিপীড়নের মোট শতাংশের প্রায় ৩%) তাদের জীবদ্দশায় ধর্ষণের চেষ্টা বা সম্পন্ন হয়েছে। এই সংখ্যা গত পাঁচ বছরে ২২.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০০০ ধর্ষণের জন্য ৯৯৫ অপরাধী শাস্তি পায় না। অযৌক্তিক যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান বা গবেষণায় দেখা গেছে যে অপরাধীদের সিংহভাগই যে কোনো ধরনের শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায়। মার্কিন ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখায় যে অনেক ভুক্তভোগী তাদের দাবির বৈধতা অনুসরণ করতে ভয় পায়, যার ফলে অপরাধীরা যেকোনো ধরনের শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রে যৌন নিপীড়নের বর্তমান অবস্থা মোটামুটি খারাপ, এর বিরুদ্ধে বর্তমান ব্যবস্থাগুলি কার্যকর বলে মনে হচ্ছে না। সুতরাং, যৌন নিপীড়নের বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, যৌন নিপীড়নের চারপাশের কলঙ্ক দূর করা প্রয়োজন। এটি ভুক্তভোগীদের এগিয়ে আসতে এবং আক্রমণকারীদের বিচার করতে উৎসাহিত করবে এবং কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাময়ের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অনুমতি দেবে।

ধর্ষণের পর অনেক নারী বিভিন্ন দেশে সামাজিক সুরক্ষা না পাওয়া শেষ পর্যন্ত পতিতাবৃত্তিকে বেছে নেন যা আইনত অপরাধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সেনচেজ বলেছেন, এটি নারীকে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল’ এ আবদ্ধ করে। ১৯৯৫ সালে স্পেনে পতিতাবৃত্তিকে অপরাধ-অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালে জাতিসংঘ জানায় দেশটির যৌনপেশার আর্থিক মূল্য ৪.২ বিলিয়ন বা ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালে এক সমীক্ষায় উঠে আসে, ৩ জনের মধ্যে ১ জন স্প্যানিশ পুরুষ যৌনতার বিনিময়ে অর্থ দেন। এই হার এর চেয়ে বেশি বা প্রায় ৩৯ শতাংশ। ২০১১ সালে জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় বলা হয়, থাইল্যান্ড এবং পুর্তেরিকোর পর বিশ্বে পতিতাবৃত্তির তৃতীয় বৃহত্তম স্থান স্পেন। এই পেশার সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ নারী জড়িত আছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতো এই পেশাকে ঘিরে নারীপাচার উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্পেনের পুলিশ ১৩ হাজার নারীকে পাচার বিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে ৮০ ভাগই বলেছে তারা তৃতীয় পক্ষের শিকার হয়ে এই পেশায় আসতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে গত ২০ অক্টোবর আল-জাজিরার তাদের ‘ডিগ্রিস অব অ্যাবিউজ’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময়ে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, দোষী ব্যক্তিদের সাজা দেওয়ার পরিবর্তে অভিযোগগুলো খারিজ করায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেশি তৎপরতা দেখিয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, গ্রাসগো এবং ওয়ারউইক। আল-জাজিরার অনুসন্ধানী দল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষককে চিহ্নিত করেছে। তারা নিজেদের পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে একাধিক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করেছেন বলে প্রাক্তন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন।

তাহলে ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন বা তার প্রতি সহিংস আচরণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কি হতে পারে। সামাজিক সুবিচার ছাড়া তা কখনো নিশ্চিত করা সম্ভব না। এমন কোনো ধর্ম বা সমাজ নেই যেখানে এধরনের অপরাধকে নিকৃষ্ট বলে বিবেচনা করা হয় না। এও ঠিক ধর্ষণের উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন অপসংস্কৃতির উপকরণ সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে শুধু নসিহত দিয়ে এ অপরাধ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সন্দেহযুক্ত চরিত্র ও আচরণের অধিকারী নারী কিংবা পুরুষের বিপরীতে অন্যরা কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে বা প্রলোভেনে নিজেকে সংযত রাখবে সে শিক্ষা সবার জন্যে জরুরি। যাতে কেউ অন্যের লোভ বা লালসার শিকার হয়ে না পড়ে। আবার কারো কারো কাছে নারী বা পুরুষের যৌন লালসাপূর্ণ দৃষ্টি আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে এবং অচিরেই তার খেসারত দিতে হয়। সর্বজনপ্রিয় নারী বা পুরুষ বলে মানুষ নিজেকে পণ্য করে গড়ে তোলে। মানুষ তখন তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে পণ্য হিসেবে বেশি দামে বিক্রি হতে চায়। কার্যত মানুষ এক্ষেত্রে চালাকির চেষ্টা করে। বলে চোখের পর্দাই বড় পর্দা। মনের পর্দাই বড় পর্দা। শেষ পর্যন্ত দেহের পর্দা সরে যায়। জেনে বুঝে নিজে নিজের আচরণ সংশোধন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মনের গলদ ও অসৎ সংকল্প তাকে ধাবিত করে পাপের পথে। লাম্পট্য হয়ে উঠলেও সে তার অপরাধপ্রবণ মনমানসিকতা বা তার এধরনের প্রবণতা থেকে দূরে সরে যেতে পারে না। কারণ এক্ষেত্রে তার মনোবল আগেই ভেঙ্গে যায়। অথচ স্বতন্ত্র এক জীবন বিধান থাকা সত্বেও আমরা এধরনের পাপ থেকে নিজেকে, অন্যকে বা সমাজকে রক্ষা করতে পারছি না। এনিয়ে হাজারো মতভেদ আমাদেরকে বিভ্রান্তির পাকে ফেলে দেয়।

সর্বাধিক পঠিত