প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাফর ওয়াজেদ: অমর রাসেল

একাত্তরের নয় মাস, মা, ভাই-বোন, ভাগ্নেসহ যে বাড়িটায় বন্দি ছিলো, তার ছাদের ওপর দুদিকে দুটো বাঙ্কার করে মেশিনগান বসিয়ে পাহারা দিতো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সেনারা। এছাড়া আর একটা বাঙ্কার গ্যারেজের ছাদে। বাগানের মাটি কেটে খোদা হয়েছে ট্রেঞ্চ। দিনরাত গুলির আওয়াজ। যখন বিমান আক্রমণ হয়, তখন সব সেনা ট্রেঞ্চে ঢুকে যায় এবং বাঙ্কারে গিয়ে দাঁড়ায়। আর বন্দিখানায় তাদের মৃত্যু প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে হয়। গুলির আওয়াজে কেঁপে ওঠে শিশুরা। শেখ রাসেল পকেটে তুলো রাখে। ভাগ্নে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কানে তুলো গুঁজো দেয়। যাতে গুলির আওয়াজে কানের পর্দা ফেটে না যায়। রাসেলের মধ্যে তোলপাড় হয়, যখন বিমান আক্রমণ শুরু হয়। আর তখনই সে ছুটে বারান্দায় চলে যেতে চায়। অথবা সোজা মাঠে যেতে চায় বিমান দেখতে। অনেক কষ্টে ওকে ধরে রাখে বড় বোনেরা। এমনকি মা। কিছুতেই বুঝতে চায় না। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করলেও রাসেলরা মুক্ত হয়নি। পাহারারত পাকিস্তানিরা তখনও আত্মসমর্পণে রাজি হয়নি। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে। সে বাহিনীর পরিধি বিস্তর।

সাত বছরের শিশু রাসেল, সাইকেল চালাতে খুবই দক্ষ ছিলো। তবে তা তিন চাকার সাইকেল। এমন একটি দৃশ্য আলোকচিত্র সাংবাদিকরা তুলেছিলেন। হাসি হাসি মুখ করে তার আনা সেই রাসেলকেই ঘাতকরা হত্যা করেছিলো পঁচাত্তরে। পৃথিবীতে তার আয়ুকাল মাত্র দশ বছর দশ মাস। বেঁচে থাকলে আজ ১৮ অক্টোবর রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন তথা ৫৭তম জন্মবার্ষিকী হতো। পরিণত একজন মানুষ হিসেবে এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবার নেতৃত্ব দিতো। অসম্ভব মেধাবী রাসেল। মাত্র দশ বছর বয়সেই শেখ রাসেল তার ব্যক্তিত্ব অবয়বের একটি রেখাচিত্র এঁকেছিলো। ছিলো বন্ধুবৎসল। দরিদ্রের জন্য ছিলো মায়া-মমতা ওদরদ। ছোট্ট এ জীবনে সে রেখে গেছে শিক্ষাণীয়। পারিবারিক বন্ধু নেই যে, একটি শিশুর প্রকৃত বিকাশ ঘটতে পারে তার প্রমাণ শেখ রাসেল। জাপান গিয়েছিলো পিতা ও বোন শেখ রেহানার সঙ্গে। রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচি রাখে জাপান সরকার। খুব আনন্দ করেছিলো রাসেল সেই সফরে। সেসব আলোকচিত্র এখনও নাড়া দেয়। পিতার সঙ্গে দেশে ও বিভিন্ন কর্মসূচিতেও যোগ দিত। তবে মাকে ছেড়ে কোথাও থাকতে তার কষ্ট হতো।

বাবা ফিরে আসবেন নয় মাস পর। তাই প্রতিক্ষা পুত্রের। তেজগাঁও বিমান বন্দরে সোয়েটার গায়ে। বাংলাদেশের লাল সবুজ হলুদ পতাকা হাতে দাঁড়িয়েছিলো কখন আসবেন বাবা। পাকিস্তানিদের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পিতা তখন লন্ডনে। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকা ফিরছেন। হাজার হাজার বাঙালি থেকে ক্রমান্বয়ে লাখো মানুষ বিমান বন্দর এলাকায়। শ্লোগানে শ্লোগানে কম্পিত আকাশ বাতাস। অবশেষে পিতা বিমান থেকে নেমে এলেন।

পুত্র দূর থেকে, কাছ থেকে পিতাকে দেখে উচ্ছ্বসিত। বাবা ফিরছেন। যেমন ফিরতেন কারাগার থেকে, ঠিক তেমনি যেন। মনে আসে তার বাবা গ্রেফতার হওয়ার আগের মুহূর্ত। আর নয়মাস গৃহবন্দি জীবনযাপন। বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকে বাবা প্রথমেই তাকে খুঁজতেন। ভরাট কণ্ঠে হাঁক দিতেন তার নাম ধরে। তিন চাকার সাইকেল ছেড়ে তড়িঘড়ি দৌড়ে এসে চড়ে বসত বাবার কোলে। বাবার চশমাটাকে দারুণ লাগত তার। হাত দিয়ে টেনে নিয়ে বাবার চোখ, গোঁফ, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত কখনও-সখনো। বাবা তাকে গল্প শোনাতেন, রূপকথা নয়, একটি নিপীড়িত দেশ ও তার মানুষ এবং সংগ্রাম করে তাদের স্বাধীনতা লাভই ঘুরেফিরে আসত গল্পগাথায়। সেই সঙ্গে ছোট্ট দশ বছর বয়সী শিশুটির নানা কৌতূহলের জবাব দিতেন। পিতা-পুত্র যেন এক অন্য জগতে, অন্য আমেজে স্বর্গীয় সুধায় আপ্লুত হতো। পুত্রের কথা বলার ভঙ্গিটাও ছিলো বেশ মজাদার। বরিশাল, ফরিদপুর ও ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দু মিশিয়ে একটা নিজস্ব ভাষা ওর গড়ে উঠেছিলো। সেই ভাষায় যখন কথা বলতো, বাবা হেসে উঠতেন। তিনিও চেষ্টা করতেন জগাখিচুড়ি ভাষায় জবাব দিতে।

পিতা-পুত্র যেন অন্তঃপ্রাণ। বাবাকে যে সে সব সময় পেত, তা নয়। বাবা ‘অন্য বাসায়’ চলে গেলে তার মন খারাপ হতো। মায়ের সঙ্গে যেদিন সব ভাইবোন মিলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাবাকে দেখতে যেতো, সেদিন ফেরার সময় খুব কাঁদতো, একবার তো বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় বেশ মনভার নিয়ে জেলখানা থেকে বাসায় ফিরে বোনদের বললো, ‘আব্বা আসল না। বললো, ওটা তার বাসা, এটা আমার বাসা। এখানে পরে আসবেন। বাবার সঙ্গ তেমন পেত না। বাবাকে প্রায় গ্রেফতার হয়ে জেলে যেতে হতো। বন্দী করে রাখত বাবার গল্প বলা সেই জল্লাদরা। তার জন্মের পর দীর্ঘ সময় বাবা জেলেই কাটিয়েছেন। মুক্ত বাবাকে ভয় পেত শাসকরা। বাবাকে দীর্ঘ সময় দেখতে না পেয়ে তার মন খারাপ থাকত। বাবার কাছে যাওয়ার জন্য অনেক সময় মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে কাঁদত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। স্বপ্নে দেখত, বাবা তাকে গল্প শোনাচ্ছেন, কখনও বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এই খারাপ লাগাটা ভাইবোনদেরও কষ্ট বাড়াত।

পিতার জেলে যাওয়া, মুক্তি পাওয়া জীবনকে অবশ্য তারা সয়ে নিয়েছিল। বাবার অবর্তমানে তাই সে মাকেই আব্বা বলে ডাকত কখনও কখনও। মন খারাপ, চাপা দেওয়ার জন্য মায়ের কিনে দেওয়া তিন চাকার সাইকেলটি নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকত। কিন্তু রাত হলেই চেহারায় বিষন্নতার ছাপ থাকত। বাবা কারাবন্দী থাকাকালে এমনিতেই বাড়িটা খুবই নীরব থাকত। লোকজনের তেমন যাতায়াত ছিলো না। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা যখন বাবা ঘোষণা করেন, আর এই কারণে জেলে যান, তখন তার বয়স দেড় বছর ছাড়িয়ে। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় তার জন্ম হয় বড় বোনের শয়নকক্ষে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে। সবার ছোট্ট সে। তাই সে ছিলো সবার আদরের। অনেক বছর পর একটি ছোট্ট শিশু বাড়িটিকে আলোকিত করে তোলে। বাবা ছিলেন ভীষণ পড়ুয়া। জেলে বসে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন বাবার খুব প্রিয় লেখক। মাঝে মাঝে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন বাবা রাসেলের দার্শনিকতা। এসব শুনে রাসেল ভক্ত হয়ে ওঠা মা নিজের ছোট সন্তানের নাম রাখলেন রাসেল। চার বছর বয়সে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। নাম রাখা হয় শেখ রাসেল উদ্দিন। বড় ভাইবোনরা পালা করে তাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত। বাসায় ছিল ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী। আলমারিভর্তি বাবার সংগৃহীত বইপত্র। বোনরা তাকে গল্প পড়ে শোনাত। একই গল্প কদিন পর শোনানোর সময় দু-এক লাইন বাদ পড়লে সে ঠিকই ধরে ফেলত। বলত ও, সেই লাইনটা পড়নি কেন? তার প্রিয় খাবার ছিলো চকলেট, সমুচা, কোক। তবে পোলাও এবং ডিম পোচ এমনকি ঢেঁড়স চিনি মিশিয়ে খেত। চলাফেরায় বেশ সাবধানী এবং সাহসী ছিলো। কোনো কিছুতে তেমন ভয় পেত না। কালো কালো বড় পিপড়ে দেখলে ধরতে যেত। পিঁপড়েরাও দে ছুট। কোনটা পড়ত লুকিয়ে।

একবার একটা বড় পিপড়ে ধরে ফেললো। পিপড়েটাও আঙুলে কামড় বসাল। যন্ত্রণাকাতর রাসেল তখন। আঙুলটা ফুলে যায়। এরপর থেকে আর পিঁপড়ে ধরত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নামও দেয়। কালো পিঁপড়ে দেখলে ডাকত ‘ভুট্টো’ বলে। রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতেন ওর বড় বোন হাসুপা। সে যদি কোনো কারণে কান্নাকাটি করত, তখন বোনরা টেপ ছেড়ে দিলে থেমে যেত তার কান্না। চুপ হয়ে ঝিম ধরে বসে থাকত। টেপে তার কান্না বাজালে অনেক সময় মা দৌড়ে আসতেন কান্না থামাতে। কিন্তু দেখতেন তারা হাসছে। পোশাক পরা নিয়েও ছিলো খুব সচেতন। বাবার মতো প্রিন্স কোট, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট পরত। মাছ ধরার শখও ছিলো। টুঙ্গিপাড়ায় গেলে পুকুরে মাছ ধরত। গণভবনেও সে মাছেদের খাবার খাওয়াত। বাসায় কবুতরের ঘর ছিলো, অনেক কবুতর থাকত। মা খুব ভোরে ওঠে তাকে কোলে নিয়ে কবুতরদের খাবার দিতেন। হাঁটতে শেখার পর নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজ হাতে খাবার দিত। কিন্তু কবুতরের মাংস কখনও খেত না। বাড়িতে টমি নামে একটা পোষা কুকুর ছিলো। তার সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিলো। তার সঙ্গে খেলা করত। একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপাকে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। অথচ নিজের খাবারের ভাগও দিত টমিকে। আর সেই টমি তাকে বকা দিয়েছে। এটা সে মেনে নিতে পারত না।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন বাসায় আক্রমণ চালায়। তাদের ছোঁড়া গুলির খোসা এসে রাসেলের পায়ের ওপর পড়ে। মা তাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে রাখেন। পরে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। বিভিন্ন জনের বাসায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ধরা পড়ার পর তাদের ধানমন্ডির ১৮ নম্বরের একটি বাড়িতে আটক রাখা হয়। নয় মাসের বন্দীজীবন তখন রাসেলেরও। স্বাধীনতার পর বাবা ফিরে এলে, বাবার সঙ্গে সব সময় ছায়ার মতো লেগে থাকত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে বাবা, মা, ভাই, ভাবিদের হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে দেখতে হয়েছে তাকে। খুনিরা বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে তাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে। সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে থাকে। ঘাতকরা তাকে মৃত মায়ের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলে গুলিতে তার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। দশ বছর বয়সী শিশুটির জীবনপ্রদীপ ঘাতকরা নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয় চিরদিনের জন্য। আজ বেঁচে থাকলে বয়স হতো যাঁর ৫৭ বছর। শিশু হত্যার সেই কালোরাত বাঙালির জীবনে এক ট্র্যাজেডি।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক। মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

সর্বাধিক পঠিত