প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] প্রবাসীদের টার্গেট করে ছিনতাই-অপহরণ: ডিবি

সুজন কৈরী: [২] চাঞ্চল্যকর ডাকাতির মামলার রহস্য উদঘাটন, লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধারসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মাসুদুল হক ওরফে আপেল, আমির হোসেন হাওলাদার ও শামীম।

[৩] শনিবার রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলের মীরবাগ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫টি পাসপোর্ট, ২টি এন আই ডি কার্ড, ২টি এটিএম কার্ড, ১টি আইপ্যাড, ১টি ওয়ার্ক পারমিট কার্ড, ১টি বিএমইটি কার্ড, ১টি অফিস আইডি কার্ড, ১টি স্টীলের চাকু ও নগদ ৫৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

[৪] গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, চক্রটি দেশে আসা বিদেশি ও প্রবাসীদের টার্গেট করে বিমানবন্দরে নামার পরই। গাড়ির জন্য অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের গাড়ি দিয়ে সহযোগীতার নামে গাড়িতে তুলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। কখনও সখ্য গড়ে। কখনও ছিনতাইকারী এমনকি ডাকাতের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয় চক্রটি। তাদের বিচরণ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে। সেখানেই বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার ধান্দায় থাকে অপরাধী চক্রটি।

[৫] সম্প্রতি বিমানবন্দর কেন্দ্রিক দুটি ডাকাতির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রটির সন্ধান পায় গোয়েন্দা উত্তর বিভাগ। গ্রেপ্তার করা হয় চক্রটির তিন সদস্যকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

[৬] ডিবি বলছে, প্রবাসীদের টার্গেট করে বিমানবন্দর কেন্দ্রিক অর্ধশতাধিক ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের পর মালামাল লুটের ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে মাত্র সাতটি। দ্রুত বিদেশ ফিরে যাওয়ার তাড়া থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা ঝামেলা মনে করে মামলা করেন না।

[৭] রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর লিটন সরকার নামের একজন প্রবাসী মিশর থেকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে বাংলাদেশে আসেন। তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে গোলচত্ত¡রে ফুটওভার ব্রিজের নিচে এসে বাসার উদ্দেশে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেন।

[৮] এ সময় অজ্ঞাতনামা ৫ থেকে ৬ জন লোক ধারালো চাকু দিয়ে ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে থাকা হ্যান্ডব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে চলে যায়। হ্যান্ডব্যাগ ও লাগেজে থাকা তার একটি পাসপোর্ট, মিশরের ভিসা, বিমানের টিকিট, আট আনা ওজনের স্বর্ণের চেইন, ২টি মোবাইল ফোনসেট, একটি স্মার্ট কার্ড, প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়সহ নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। পরে ডাকাত দলের সদস্যরা ভিকটিমকে ঘটনাস্থল থেকে একটি বাসে তুলে ঘটনার বিষয়ে কাউকে কোনো কিছু না জানানোর জন্য ভয়-ভীতি, হুমকি প্রদর্শন করে। এই ঘটনায় গত ১৫ অক্টোবর বিমান বন্দর থানায় মামলা হয়।
অন্যদিকে ৫ অক্টোবর ব্রিটেন থেকে ঢাকায় নামেন ওমর শরিফ। নাটোরের বড়াইগ্রাম যাওয়ার সময় বিমানবন্দর এলাকা থেকে অপহৃত হন তিনি। তাকে ঢাকার বাইরে নামিয়ে দেওয়া হলেও তার পাসপার্টসহ প্রয়োজনীয় সব মালামাল লুট করা হয়।

[৯] এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হলে তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগ। মামলাগুলো তদন্তকালে গোয়েন্দা তথ্য উপাত্ত¡ বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় এই ডাকাতির ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

[১০] পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। তারা কখনও ডাকাতি, কখনও ছিনতাই, কখনও অজ্ঞানপার্টির সদস্য হিসেবে অপরাধ কার্যক্রম চালায়। দেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পপ্রবাসি দেশে আসা শুরু করায় এ চক্রটি এই সময়কে বেছে নিয়েছে। তারা বিদেশ থেকে আসা যে সকল যাত্রী একা বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে তাদের টার্গেট করে। টার্গেট যাত্রীর সাথে কৌশলে সম্পর্ক স্থাপন করে পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যাত্রীর সাথে মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়। অথবা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের টার্গেট করে সখ্যতা স্থাপন করে। তাদের অপর সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তিকে কৌশলে চেতনানাশক মিশ্রিত খাবার খাওয়ায়। খাদ্যদ্রব্য গ্রহনের পর টার্গেট ব্যক্তি অচেতন হলে তারা তার মূল্যবান দ্রব্যাদি নিয়ে দ্রæত চলে যায়। এ চক্রের সদস্যরা খাদ্যদ্রব্য হিসেবে চা, কফি, জুস, ডাবের পানি ইত্যাদি ব্যবহার করে। এই চক্রের সদস্যরা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের চেতনানাশক দ্রব্যাদি খাওয়ানোর মাধ্যমে জিনিসপত্র নিয়ে যায়।

[১১] প্রবাসীরা ঠিক কী কী কারণে ছিনতাইকারী চক্রের টার্গেট হচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, চক্রের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বিমানবন্দর কেন্দ্রিক তারা গত এক বছরেই অর্ধশতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রের মূলহোতা মাসুদুলের বিরুদ্ধেই রয়েছে সাতটি মামলা।

[১২] হাফিজ আক্তার বলেন, প্রবাসীদের টার্গেট করে চক্রটি ৫০ থেকে ৬০টি ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের পর মালামাল লুটের ঘটনা ঘটিয়েছে। কিন্তু এ সংক্রান্ত মাত্র হয়েছে সাতটি। দ্রæত বিদেশ ফিরে যাওয়ার তাড়া থাকায় ক্ষতিগ্রস্থরা ঝামেলা মনে করে মামলা করছেন না। আবার ১০ থেকে ১৫ দিনের জন্য দেশে বেড়াতে আসা বিদেশিরাও দ্রæত পাসপোর্ট তুলে ফিরে যাচ্ছেন। যে কারণে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা কম হচ্ছে। আর এই সুযোগটাই নিয়েই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বিমানবন্দর কেন্দ্রিক প্রবাসী ও বিদেশিদের টার্গেট করে ছিনতাই ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে।

[১৩] অপর এক প্রশ্নর জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা আসছেন। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ভাড়া করা গাড়ি ব্যবহার করে এসব করা হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা কাদের গাড়ি ভাড়া নিচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে।

সর্বাধিক পঠিত