প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধীরগতিতে বিআরটি নির্মাণে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ

বণিক বার্তা: সহজে, স্বল্প ব্যয়ে ও দ্রুততম সময়ে নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ মানুষের গণপরিবহন চাহিদা মেটাতে সক্ষম হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ‘বিআরটি সিস্টেম’। বর্তমানে বিশ্বের ১৭৯টি শহরে এক বা একাধিক বিআরটি ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিআরটি করিডোর গড়ে তুলতে নয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। বিশ্বের বেশির ভাগ বিআরটি করিডোর তৈরি করতে এমন সময়ই লেগেছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে ঢাকায় নির্মাণাধীন বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি। মূল কাজ শুরুর পাঁচ বছর পর এসে প্রকল্পটির অগ্রগতি ৬২ শতাংশ। এমন পরিপ্রেক্ষিতে নির্মাণকাজের ধীরগতিতে বাংলাদেশের বিআরটি করিডোরটি অনন্য নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সড়কের একটা অংশ আলাদা করে পরিচালনা করা হয় বিশেষ বাস সেবা। এ অংশটিতে অন্য কোনো গাড়ির প্রবেশাধিকার থাকে না। নির্মাণ পদ্ধতি সহজ হওয়ায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডোর দ্রুত গড়ে তোলা যায়। খরচও হয় কম।

২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয় ২০১২ সালে। নকশা আর দরপত্রের কাজ শেষ করতেই চলে যায় পরের চার বছর। ২০১৭ সালে শুরু হয় পূর্ত কাজ। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ৬২ শতাংশ। দুই দফা সংশোধন করে বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এটি হিসাবে ধরলে বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি নির্মাণ করতে সময় লাগতে যাচ্ছে ১০ বছর। আর পূর্ত কাজ শুরুর পর থেকে হিসাবে ধরলে সময় লাগতে যাচ্ছে ছয় বছর। যদিও প্রকল্পটির যে গতি এগোচ্ছে, তাতে ২০২২ সালে শেষ করা নিয়েও শঙ্কার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিআরটি তৈরি করতে নয় মাস থেকে দুই বছরের বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক্সটারনাল এক্সপার্ট পুলের সদস্য ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ব্রাজিলে বিশ্বের প্রথম বিআরটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল চার বছর। সেই সময়ের চেয়ে বর্তমানে নির্মাণ প্রযুক্তি অনেক বেশি উন্নত। বিআরটির মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কোনোভাবেই দুই বছরের বেশি সময় লাগার কথা না, এটা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

তাহলে বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি তৈরি করতে এত সময় লাগছে কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিআরটি সাধারণত করা হয় শহরের মধ্যে। কিন্তু আমরা করছি ব্যস্ততম জাতীয় মহাসড়কে। ব্যস্ত এ সড়কের ট্রাফিকের চাপ অবশ্যই নির্মাণকাজ বিঘ্নিত করছে। পাশাপাশি আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, প্রকল্পটিতে ঠিকাদারের দক্ষ জনবল এবং আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহারে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে তাদের অর্থপ্রবাহেও। যে তিনটি সরকারি সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে, তাদের সঠিক সমন্বয় না থাকাটাও বড় সমস্যা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ করা হয়েছে দুর্বলভাবে। এসব কারণ বিআরটির বাস্তবায়নকে দীর্ঘায়িত করছে। ফলে নির্মাণ সময় এবং ব্যয়—দুই দিক দিয়েই এ বিআরটি প্রকল্প ‘খুব সম্ভবত’ বিশ্বরেকর্ড গড়তে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

৪৭ বছর আগে কুড়িতিবা শহরে বিশ্বের প্রথম বিআরটি গড়ে তোলে ব্রাজিল। ‘রেদে ইন্তেগ্রাদা ডি ট্রান্সপোর্তে’ নামের বিআরটির কাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল চার বছর। সহজে, স্বল্প ব্যয়ে ও দ্রুততম সময়ে নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ মানুষের গণপরিবহন চাহিদা মেটাতে সক্ষম হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ‘বিআরটি সিস্টেম’। ‘গ্লোবাল বিআরটি ডাটা’ নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৯টি শহরে এক বা একাধিক বিআরটি ব্যবস্থা রয়েছে।

একাধিক শহরে বিআরটি করিডোর গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত। দেশটির প্রথম বিআরটি তৈরি করা হয় পুনে শহরে। এ বিআরটি করিডোরের কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালে। চালু হয় ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে। এখন পর্যন্ত ভারতের সেরা বিআরটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে আহমেদাবাদের ‘জনমার্গ’। মোটামুটি দুই বছরের মধ্যে তৈরি করা হয় এ বিআরটি করিডোর।

পাকিস্তানও একাধিক শহরে বিআরটি গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে দুই বছরের মধ্যে লাহোর মেট্রোবাস, দেড় বছরের মধ্যে ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি মেট্রোবাস নামের দুটি বিআরটি করিডোর নির্মাণ করে পাকিস্তান। অন্যদিকে এক বছরের মধ্যে গুয়ানঝু শহরে ২২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ বিআরটি করিডোর তৈরি করেছে চীন। মালয়েশিয়ার সুবাং জায়া শহরে সানওয়ে লাইন বিআরটি তৈরিতে সময় লেগেছে কম-বেশি দুই বছর। দুই বছরের মধ্যে হ্যানয় শহরে বিআরটি তৈরি করেছে ভিয়েতনাম।

বিশ্বের উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল—যেসব দেশেই বিআরটি হচ্ছে, তারা মোটামুটি এ সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী অবস্থানের জন্য একাধিক কারণকে দায়ী করছেন বিআরটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০১২ সালে অনুমোদন হলেও বিআরটির মূল কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। কাজ শুরু করতেই অনেকটা সময় চলে যায়। আর কাজ শুরুর পর ঢাকা-মনমনসিংহ মহাসড়কের যানবাহনের চাপ সামলে নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতেও বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। বর্ষাকালে প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতাও নির্মাণকাজ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। তবে ঢাকায় বিআরটি নির্মাণের যেসব মূল চ্যালেঞ্জ ছিল, তার প্রায় সবগুলোই আমরা সমাধান করে এনেছি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এ করিডোরটি চালু করা সম্ভব।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত