প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংবাদ সম্মেলনে বাগ-বিতন্ডায় জড়ালেন ঢাকা ওয়াসার কর্মচারী সমিতির দুই পক্ষ

সুজন কৈরী : ঢাকা ওয়াসার কর্মচারী সমিতির ১৩২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটডের বর্তমান কমিটি। তাদের দাবি, ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির তিন বছরের কমিশন বাবদ আয়ের ১৩২ কোটি টাকার কোনো হিসাব পায়নি অডিট কমিটি। নানা অনিয়মের মাধ্যমে এই অর্থ সমিতির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ বর্তমান কমিটির।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমিতি বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ আতাউল করিম ও সম্পাদক মো. শাহাব উদ্দিন সরকারসহ সমিতির অন্যান্য সদস্যরা।

এদিকে সম্মেলন কক্ষেই উপস্থিত হয়ে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনকারীদের অবৈধ বলে দাবি করেছেন আগের কমিটির কয়েকজন। এ সময় দুপক্ষের কয়েকজনকে বাক যুদ্ধেও জড়াতে দেখা গেছে।

লিখিত বক্তব্যে তারা দাবি করেন, ঢাকা ওয়াসার কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডে সংগঠিত বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ১৩২ কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। নির্বাচিত কমিটি ১০ মাসেও দায়িত্ব বুঝে পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন আয়োজনকারীরা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় এ নির্বাচন আয়োজনে আপত্তি ছিল ওয়াসা কর্তৃপক্ষের। এ বিষয়ে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর এক অফিস আদেশ জারি করে ঢাকা ওয়াসা। ওই আদেশে জানানো হয়, কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ঢেউ প্রতিরোধে ওই বছরের পহেলা ডিসেম্বর ওয়াসা একটি অফিস আদেশ জারি করেছিলো। কিন্তু নির্বাচনকে ঘিরে কর্মচারীরা এক কক্ষে ২০-৩০ জন অবস্থান করছেন। যা ওয়াসার ওই অফিস আদেশের পরিপন্থি।

ওয়াসা সচিব প্রকৌশলী শারমিন হক আমীর স্বাক্ষরিত ২৪ ডিসেম্বরের ওই অফিস আদেশে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ ও বিস্তার প্রতিরোধে এবং ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের মতো স্পর্শকাতর কর্মকান্ডকে সচল রাখার স্বার্থে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে সব রকমের সভাসিমাবেশ, নির্বাচন, জমায়েত, নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটদান করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করা হলো। অন্যথায় আদেশ প্রতিপালনে ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে এই অফিস আদেশ অমান্য করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনকারীদের ভাষ্যমতে, নির্বাচনের পর পর্যায়ক্রমে নির্বাচিত কমিটির ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতার জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ধন্যবাদও জানিয়েছে। আবার নির্বাচন করার কারনে যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও কারণ দর্শানোসহ অন্যান্য নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা তুলে নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর ওয়াসার কাছ থেকে সমিতির প্রাপ্ততা আগামী এক মাসের মধ্যে ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ করেছে নতুন কমিটি।

ওই নির্বাচনের কত শতাংশ ভোট পড়েছিলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজী হয়নি নতুন কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক। কমিটির সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা এ দিকে যাবো না। এ সময় সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত সাবেক কমিটির একজন বলে ওঠেন, এটা তো কোনো নির্বাচনই হয় নাই। ভোট পরছে অনলি টু পারসেন্ট (মাত্র দুই শতাংশ)।

লিখিত বক্তব্যে নতুন কমিটি জানিয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সমবায় অধিদপ্তর থেকে সমিতির ২০১৮-২০২০ সময়কালের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী পিপিআই নামীয় প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসা থেকে রাজস্ব আদায়ে ঠিকাদারী বিল বাবদ সমিতি মোট ৯৯ কোটি ৬৫ লাখ ১৯ হাজার ১৭৩ টাকা এবং এ বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে হিসাব বিবরনীতে মাত্র এক কোটি ৭৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫০৩ টাকা হিসাবভূক্ত করা হয়েছে।

গত কমিটি অর্থ আত্মসাতের হিসেব দিয়ে তারা বলেন, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থ বছরের অবশিষ্ট ১৩২ কোটি ৪ লাখ ১৭ হাজার ৪৬০ টাকার কোন হিসাব নেই। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ সমিতির তঙ্কালীন অবৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটি হাফিজ উদ্দিন, আতাউর রহমান মিয়া ও বাতিলকৃত ব্যবস্থাপনা কমিটি মো. আক্তারুজ্জামান, মো. জাকির হোসেন এবং পিপিআই পরিচালনা পর্ষদ হাফিজ উদ্দিন ও মিঞা মো. মিজানুর রহমান ও মো. আক্তারুজ্জামান ও মিঞা মো. মিজানুর রহমান গং বিধি বহির্ভূত ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে খরচ ও আত্মসাৎ করেছেন।

বর্ণিত কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদ গং ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচন পূর্ব পর্যন্ত সময়ে সমিতি ও পিপিআই প্রকল্প নামীয় বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত ব্যতীত প্রায় ৪৪ কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। যার হিসাবও পাওয়া যায়নি বলে অডিট রিপোর্টে ওঠে এসেছে।

বর্তমান কমিটির দাবি, সাবেক কমিটির নেতারা এই টাকা লোপাট করেছেন। ওয়াসা কর্তৃপক্ষও বর্তমান কমিটিকে ওয়াসা ভবনে বসতে দেওয়া হয় না। তাদের বারবার আবেদনের বিষয়েও কর্ণপাত করছে না ওয়াসা। সমিতির ২০০ কোটি টাকা মূল্যমানের সম্পদ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের দখলে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী এবং এ লক্ষ্যেই কাজ করছে। সমিতির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটিও ঢাকা ওয়াসার কর্মচারী হিসেবে সংস্থার নীতির সঙ্গে একমত পোষণ করে এবং সমিতির দুর্নীতির বিষয়েও ওই নীতিতে অটল। এমন অবস্থায় যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি তথা জনগণের টাকা নয়-ছয় করার কাজে লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করুন। আর নির্বাচিত প্রতিনিধি যারা সমিতির অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনিয়মকারীদের চিহ্নিত করার জন্য সদা সচেষ্ট তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করার অপরাধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলা, কারণ দর্শানোসহ অন্যান্য নিপীড়ণমূলক ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।

তবে তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনকারীরা। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাবেক ও বর্তমানদের কয়েকজনকে বাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এ সময় সাবেক কমিটির কয়েকজন জানান, তাদের কাছে এ বিষয়ক বেশ কিছু কাগজপত্র রয়েছে। যা নিয়ে তারাও গণমাধ্যমের সামনে আসবেন।

সর্বাধিক পঠিত