প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আহসান হাবিব: নাট্যপিতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু

আহসান হাবিব: লোকে আমায় কালো বলে কিন্তু ‘আমি নিজেকে গাঢ় বলতে পছন্দ করি। এভাবেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের সামনে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা থিয়েটারের সভাপতি নাট্যপিতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। আমার সুযোগ হয়েছিলো দশ দিন তাকে খুব কাছ থেকে দেখার এবং চেনার। দেখেছি কিন্তু চিনতে পারিনি অতোটা। কারণ প্রতিদিন তিনি নতুনরূপে আভির্ভুত হয়েছেন। দৃষ্টি, বাক- শ্রবণ এবং শারিরীক প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের একসঙ্গে নিয়ে থিয়েটার বানানোর যে ইচ্ছা তার মনে বাসা বেধেছে সেটা ভেবেই অনেকের মাথা ঘুরে যাচ্ছে। কারণ একজন বাক- শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের সঙ্গে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগ কতোটা কঠিন সেটা ভেবেই তো মাথা ঘুরায়। একজন কানে শোনে না কথাও বলতে পারে না, আবার অন্যজন দেখতে পায় না। অথচ এই মানুষদের তিনি একসঙ্গে মঞ্চে তুলেছেন। তারাও পারফর্ম করছে তাদের সবটুকু চেষ্টা দিয়ে অতি আনন্দে।

একদিন হলো কী , মঞ্চে অভিনয় চলছে, কাবাডি খেলায় দুদলের দুর্দান্ত প্রতিযোগীতা। তাদের অসামান্য অভিনয়ে সারিনা হোটেলের সাপোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে উপস্থিত সকলেই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাদের অভিনয় দেখে। নাটক শেষে হলো, বাচ্চু ভাই উঠে এসে অডিয়েন্সকে উদ্দ্যেশ্য করে বললেন আপনারা একটু চিৎকার করে সমর্থন জানালে হয়তো আরো ভালো লাগবে। যেই কথা সেই কাজ। মূহুর্তেই এই দামী হোটেলের কনফারেন্স রুমটি যেন খেলার মাঠে পরিণত হলো। মুগ্ধ, অভিভ‚ত সকলেই। নাটকটি শেষ হতে না হতেই একটি গানের সুর ভেসে আসে সবারকনে। আমরা পেছনে তাকিয়ে লক্ষ করলাম বাচ্চু ভাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিল্প ও অভিনেতা মিন্টু সাহেবের হাত ধরে এগিয়ে আসছেন মঞ্চের দিকে। আসলেন, গাইলেন জয় করলেন অনেকটা সেরকম একটা সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলো সবকিছু। বাচ্চু ভাই কখন যে সামনে থেকে পেছনে গেলেন সেটা আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। গান শেষে শুধু একটি কথায় বললেন, ‘দোলা-খুব ভালো হয়েছে’। সামিউন জাহান দোলা আপা ঢাকা থিয়েটারের ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ প্রচেষ্টা DARE (Disability Arts Redefining & Empowerment) এর প্রশিক্ষক।

ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করলাম শ্রবন প্রতিবন্ধী ফয়সাল ইশারা ভাষায় মের্শেদকে জিজ্ঞেস করছে, ‘ কে এই লোকটি? এতো ভালো ভালো বুদ্ধি দিয়ে নাটকটি সুন্দর করে দিলো। কে এই ব্যাক্তি? আমি শুধু অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকলাম, তারা যদি সত্যিই জানতো যে, কে তাদের নাটকের নির্দেশনা দিলো। তাহলে তারা কী করতো? যেখানে দেশের নামকরা, বিখ্যাত অভিনয় শিল্পীরা তাঁর নির্দেশনা তো দূরের কথা সান্নিধ্যে আসলেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় নত হয়। এরই মধ্যে বাচ্চু ভাই বেশ প্রিয় হয়ে ঊঠেছেন প্রতিবন্ধী অভিনয় শিল্পীদের কাছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অভিনেত্রী লাভলী তো আবদার করে বসলেন তাকে ছুঁয়ে দেখবে। করোনার ভয় উপেক্ষা করে তিনি অনুমতি দিলেন। লাভলী বাচ্চু ভাইয়ের হত ধরে ছবি উঠলো আর বললো আমি এই প্রথম কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ছুঁয়ে দেখলাম। এসময় তার দৃষ্টিহীন চোখ যেনো আনন্দে জ¦লজ¦ল করে উঠলো। ইশারাভাষী মোর্শেদ, ফয়সালরা তো রীতিমতো তার ভক্ত হয়ে গিয়েছে। মহড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি কমবেশি ইশারা ভাষা শিখছেন তাদের থেকে।

হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে পরবর্তী পারফরমেন্স এর জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করতে বলে নিজেই চেয়ারগুলো সরাতে উদ্যত হলেন এবং চেয়ার সরিয়ে দিলেন। এই দেখে অনেকের চোখ কপালে উঠে গেলো। আমরা তো তাকে চিনি ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা হিেেসবে, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, বাংলা মঞ্চের নির্দেশক হিসেবে, সর্বোপরি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে। তাঁর পরিচালিত গেরিলা সিনেমা দেখেনি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। এই তো সেই ব্যাক্তি যিনি সুদূর লন্ডনের মাটিতে টেম্পেস্ট মঞ্চস্ত করেছেন। উজ¦ল করেছেন বাংলাদেশের নাম। অথচ তাকে আজ আমরা এতো সহজভাবে আমাদের মধ্যে পেয়েছি ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষনের মধ্যে হাজির হলেন প্রিয় অভিনেতা ফারুখ আহমেদ। বাচ্চু ভাই বললেন মোর্শেদ- লাভলীদের সঙ্গে অভিনয় করতে হবে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ফারুখ আহমেদ তার রসাত্মক অভিনয় শুরু করলেন। প্রতিবন্ধী কো-আর্টিস্টরাও তাকে সঙ্গ দিলেন দারুনভাবে। হাসি আনন্দে ভরে উঠলো সবার মন। এরই মধ্যে হাজির হয়েছেন সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। সবকিছু দেখে মন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে বসলেন, অসহায় শিল্পীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থিক অনুদানের পাঁচ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিল্পীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। উপস্থিত সকলে মন্ত্রীকে সাধুবাদ জানালেন তার এই মহতী উদ্যোগের জন্য। কেউ ইশারা ভাষায়, কেউ মুখের ভাষায় কেউ আবার হাত তালি দিয়ে সমর্থন জানালেন। আমি তিন ফিট দূর থেকে বাচ্চু ভাইয়ের চোখে মুখে যে আনন্দের ঝলকনি লক্ষ্য করেছি তা ছিলো, মানুষের প্রতি ভালোবাসার নাটকের প্রতি ভালোবাসার দেশের প্রতি ভালোবাসার।
পরিচিতি : সংবাদ উপস্থাপক, বাংলাদেশ টেলিভিশন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত