প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

 অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: নিয়োগ পদ্ধতি থেকে হয়তো আর কোনোদিন এমন শিক্ষক পাবো না

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন : বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটলো। অনেকদিন যাবত জীবনযুদ্ধে লড়াই করার পর ৮৮ বছর বয়সে শেষমেষ ৯ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রাণপ্রিয় অধ্যাপক, প্রাক্তন বোস এবং ইউজিসি অধ্যাপক ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদক এবং গবেষণা ও বিজ্ঞানে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছিলেন কাজপাগল একজন মানুষ। সবসময় পড়াশোনা অথবা লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানকে শিখতে ও বুঝতে হলে মাতৃভাষায় পড়তে হবে। সেইজন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানের। তাছাড়া পদার্থবিজ্ঞানের অনেক জটিল বিষয়ে কয়েকটি বই ইংরেজিতে লিখলেও সেটা সহজবোধ্য করে লিখেছেন। উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীরা যেন পদার্থবিজ্ঞান বোঝে। তিনি আজীবন স্কুল থেকে শুরু করে লেখাপড়ার সর্বস্তরে ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিলেন। অর্থাৎ জীবনে কোনো পরীক্ষায় প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি। এসএসসি এবং এইচএসসিতে বোর্ডে স্ট্যান্ডসহ প্রথম হয়েছিলেন। সেই সময় সেরা ছাত্রদের স্বপ্নই ছিলো পদার্থবিজ্ঞান পড়া। স্যার থিসিস করাতেন কেবল সেরা শিক্ষার্থীদের। এটা স্যারের একপ্রকার অহমবোধ বলতে পারেন।

শিক্ষকতা জীবনে স্যার অনেক মেধাবী পদার্থবিদ তৈরি করে গেছেন যারা এখন দেশে এবং বিদেশে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন। স্যারের চেহারা, ব্যক্তিত্ব সবই অন্যরকম। ক্লাসের প্রথম শ্রেণিতে প্রথম না হওয়ার কারণে ছাত্রজীবনে স্যারের কাছাকাছি হতে পারিনি, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার পর স্যার সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন। বেশ কয়েকবার আমার বাসায় পর্যন্ত এসেছেন। আমার স্ত্রীকে প্রচ স্নেহ করতেন এবং ইতালি ছেড়ে আমার জন্য বাংলাদেশে থাকার জন্য খুবই appreciate করতেন। স্যার একবার আমার এক ছাত্রের থিসিসের এক্সটার্নাল হয়েছিলেন। সেই থিসিস মূল্যায়নের রিপোর্টে আমাদের সেই কাজের তিনি ভ‚য়সী প্রশংসা করেছিলেন। শুধু তাই নয় তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে এসে থিসিসের কাজের প্রশংসা করেছেন। তিনি সম্পূর্ণ অন্য ফিল্ডের হয়েও সেই কাজটির গুরুত্ব বুঝতে পারা প্রমাণ করে তিনি কতোটা সিরিয়াসলি থিসিসটি পড়েছিলেন।

থিসিসের রিপোর্টে অনেক ভালো কথা লিখেছিলেন। সত্যি সত্যি সেই কাজের ওপর আর্টিকেলটি খুবই ভালো একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই আর্টিকেলের রেফারিরাও কাজটির প্রশংসা করেছিলেন। এতো বড় ভালো পদার্থবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভবত সত্যেন বোসের পর খুব কমই ছিলেন। তারপরও স্যারকে আমরা প্রফেসর এমেরিটাস বানাতে পারলাম না। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়ে কতো দুর্বল গবেষক এবং শিক্ষক প্রফেসর এমেরিটাস হয়েছেন, কিন্তু স্যারের মতো একজন শিক্ষককে আমরা প্রফেসর এমেরিটাস বানাতে পারলাম না। ইন ফ্যাক্ট আমাদের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কাউকে আজ পর্যন্ত প্রফেসর এমেরিটাস বানাতে পারিনি। এটা আমাদের ক্ষুদ্রতাকেই প্রমাণ করে। কিন্তু স্যারতো শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাসটি স্যার নিয়েছিলেন। সেটি ছিলো ওরিয়েন্টেশন ক্লাস। তিনিই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেমন হওয়া উচিত। আমরা আমাদের নিয়োগ পদ্ধতি থেকে শুরু করে সম্মানের অবস্থানকে এতোটা নামিয়েছি যে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোনোদিন এমন শিক্ষক পাবো না। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত