প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাকন রেজা: সাংবাদিককের শান্তিতে নোবেল, অন্যদের অশান্তি!

কাকন রেজা : ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত রিকটার ভেন্ডসেন এক টুইট বার্তায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া দুই সাংবাদিককে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার টুইট বার্তাটি বাংলা করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার এ বছর দুজন সাহসী সাংবাদিককে দেওয়া হয়েছে এমনটা জানতে পেরে আমি আনন্দিত। মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতবকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে গণতন্ত্র ও স্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা জন্য। অনেক দেশেই এ স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে রয়েছে যেটা দুঃখজনক’।

‘গণতন্ত্র ও স্থায়ী শান্তি’ এ কথাটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাভাষী বেশকিছু সাংবাদিকের সাথে আমার পরিচয় রয়েছে। তাদের একজন সেদিন বলছিলেন, আমরা হোয়াইট হাউজে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে প্রশ্নে নাস্তানাবুদ করতে পারি এবং তা নির্ভয়ে। আমেরিকা বিষয়ে আমাদের একধরনের অ্যালার্জি রয়েছে। এদিক দিয়ে বামেরা এগিয়ে এবং তারপর ইসলামিস্টরা এবং এই দুইপক্ষই ‘সোকল্ড’, যেহেতু তারা কিউবা বা উত্তর কোরিয়া এবং সৌদিআরব সাথে আফগানিস্তানের সাংবাদিকতা সম্পর্কে নীরব। যেখানে আপনি আপনার মতপ্রকাশের জন্য রাষ্ট্রের প্রধানকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারেন এবং সে প্রশ্ন তেলমাখানো নয়, মরিচের গুড়ার মতন ঝাঝালো প্রশ্ন, সে দেশ সম্পর্কে কথা বলার সময় নিজের পেছনটাতেও দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
রাশিয়ার কথায় আসি। বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে, সে হোক নির্বাচন বা অন্যকিছু, রাশিয়ার অবস্থান সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। জার যুগ থেকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন যুগ এবং পেরেস্ত্রইকা পরবর্তী এবং হালের পুতিন যুগ, সব যুগেই রাশিয়া প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে। জারদের হাত থেকে সমাজতন্ত্রীরা ক্ষমতা নেয়ার পরও মানুষের মতপ্রকাশের সক্ষমতার ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিরাজ করেছে, এখনো তাই। অথচ সেই রাশিয়াতেও সরকার তথা অ্যাস্টাব্লিশমেন্টের বিপক্ষে কথা বলেছেন শান্তিতে নোবেল পাওয়া সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতব।

বিবিসি বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন দিমিত্রি মুরাতব। এরজন্য সরকারের রোষের শিকারও হন তিনি। কিন্তু তারপরেও থেমে যাননি। তিনি তার ‘নোভায়া গ্যাজেটা’ নামক গণমাধ্যমের মাধ্যমে রাশিয়ার দেশ ও বিদেশে সামরিক তৎপরতা নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন। লিখেছেন ভোট চুরি, দুর্নীতি ও বেআইনি গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধেও। এমনকি খোদ পুতিনের দুর্নীতি ও কৃত অন্যায় নিয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছেন এই সাংবাদিক। পুতিনের মতন একজন পরাক্রমশালীর বিরুদ্ধে এ কাজটা করার জন্য যে কতোটা সাহস, বুদ্ধি ও কৌশলের প্রয়োজন হয় তা বলাই বাহুল্য। সেক্ষেত্রে দিমিত্রি মুরাতব নোবেল এর অবশ্য দাবিদার।

আরেকজন হলেন ফিলিপিনো সাংবাদিক মারিয়া রেসা। তিনিও কাজ করছেন সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্র সংঘটিত নির্যাতন নিয়ে। এমনকি মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সরকারি বাহিনির মাসকিলিংয়ের ব্যাপারেও সোচ্চার তিনি। মূল কথা হলো, এই দুই সাংবাদিকই অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্যেও অ্যাস্টাব্লিশমেন্টের বিরুদ্ধে, মানুষের পক্ষে সোচ্চার রয়েছেন। সুতরাং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার এবার অন্তত অপাত্রে যায়নি।

তবে মুশকিল হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই পুরস্কার অনেকের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা যায়, এই শান্তি পুরস্কার দক্ষিণ এশিয়ার অনেকেরই অশান্তির উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। তাদের নানা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হচ্ছে এবং সম্ভবত তা নিজের বিবেকের কাছেও। কেন হয়েছে বা হচ্ছে তা বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকুই বলা যায়, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক আনুগত্য মূলত এরজন্য দায়ী। আর আনুগত্যের উৎস অনেকটাই ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট।

সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর কথা এখন শোনা যায়। আমাদের শুনতে হয়। বলা হয়, ইতিবাচক খবরের কথা। মুশকিলটা বাঁধে এখানেই। ঘটনা ও খবর এ দুটোর পার্থক্য গুলিয়ে ফেলেন অনেকেই। মোটাদাগের উদাহরণ দিই, হাসপাতালে একজন ডাক্তার নিয়মিত ডিউটি করবেন, রোগী দেখবেন, এটাই তার কাজ। এর জন্যই সরকার তাকে জনগণের দেয়া রাজস্ব থেকে বেতন দেয়। এটা স্বাভাবিক বিষয়, খবর নয়। কিন্তু যখন কেউ অমুক ডাক্তার নিয়মিত হাসপাতালে রোগী দেখেন বলে খবর করে দেন, তখনই প্রশ্নটা ওঠে খবর আর আর ঘটনার পার্থক্য নির্ণয়ে। নিয়মিত রোগী দেখাটা খবর নয়, অনিয়মিত রোগী দেখাটাই খবর। যদি এর বিপরীতে কেউ বলেন, ‘খালি অনিয়মিত বলে নেতিবাচক খবর প্রচার করবেন, নিয়মিত যে দেখেন সেটাও প্রচার করেন’, তখন বুঝবেন ওই মানুষটা এ বিষয়ে অজ্ঞ কিংবা অসৎ অথবা ধান্ধাবাজ। এর বাইরে কোনো কথা নেই। সাংবাদিকতার অর্থই অনিয়মের কথা বলা, সেটাই খবর। নিয়ম হলো ঘটনা, স্বাভাবিক। স্বাভাবিক মৃত্যু ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পার্থক্যটাও এখানে। আর নিয়ম তথা স্বাভাবিক বিষয় যখন মাধ্যমে প্রতিদিনের খবর হয়ে ওঠে, তখন গণমাধ্যম ‘গণকেইস’ হয়ে যায়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বাধিক পঠিত