প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাহজাদ হোসেন মাসুম: ঢালাওভাবে কোনো পেশা, শ্রেণি, অঞ্চল বা ধর্ম নয়- পার্থক্যটা মানুষে মানুষে

শাহজাদ হোসেন মাসুম : প্রান্তিক হাসপাতালের প্রশাসক এবং সিভিল সার্জনদের নিয়ে অনেকেই খুব তিক্ত কথা বলেন। আমি যা মনে করি তা হলো এই ব্যাপারটা চিরায়ত সত্য নয়। সব ক্লিনিশিয়ান বা শিক্ষকরা যেমন এক নন, এই প্রশাসকরাও এক নন। এখন নতুনরা প্রশাসক হচ্ছেন কিছু পরিবর্তন হবে এমনটা আমরা আশা করি। অধ্যাপকদের মাঝেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন অনেক বেশি ছাত্র এবং রাজনীতিবান্ধব। আগের অধিকাংশ অধ্যাপকদের মেজাজ ছিলো খিটখিটে। কিন্তু তাদের অনেকের শিরদাঁড়ায় একটা টাইটেনিয়ামের রড ঢুকানো ছিলো। কোনো চাপেই তাদের নোয়ানো যেতো না। আজ সবাই হাসিমুখে কথা বলেন। কিন্তু তেমন মানুষ খুব একটা চোখে পড়ে না। টি এইচ এ এবং সিভিল সার্জন সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা একটু বলি।
আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছিলো খুলনার রূপসা উপজেলায়। তখন ব্রিজ ছিলো না। উত্তাল রূপসা নদী পেরিয়ে ওই পারে গিয়ে বেবিট্যাক্সি বা ভ্যানে করে আরো সাত-আট কিলোমিটারের পথ। বেবিট্যাক্সির সমস্যা হলো আপনার পাশে মহিলা যাত্রী থাকলে আপনি যেকোনো সময় শারীরিক হয়রানির অভিযোগে গণপিটুনি খেতে পারেন, রাস্তা এতো খারাপ ছিলো যে সারারাস্তা জামভর্তা বানানোর মতো করে নিয়ে যেতো। ভ্যান অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কিন্তু মাঝে মাঝে নেমে ভ্যান ঠেলে গর্ত থেকে ওঠাতে হতো। সেখানে আমি ছাড়া আরো দুইজন হিন্দু চিকিৎসক ছিলেন। একজন টিএইচএ। তারা দুজন আমাকে অসম্ভব কষ্ট দিয়েছিলেন। নাইট ডিউটি তারা করতেন না, আমাকে করতে হতো। টি এইচ একে কিছু বললেই তিনি বলতেন এটা সম্ভব নয়। একদিন ডিউটির পর আড়াইটায় আমি চলে আসি, তিনটায় সিভিল সার্জন ভিজিটে এসে শুধু আমাকে শোকজ করেন। কারণটা আমি কিছুতেই বুঝিনি। আমার ইমারজেন্সিও ছিলো না। তাদের দুজনকে জিজ্ঞেস করলাম খালি আমি কেন আপনারাতো আমার আগে চলে গেলেন! তারা জবাব দিলেন তারা নাকি যাননি।

বুঝলাম তাদের সঙ্গে পারবো না। সেই সময়ে যিনি সিভিল সার্জন ছিলেন তার সঙ্গে খুলনায় গিয়ে দেখা করলাম। তিনি বিশাল শিক্ষামূলক ঝাড়ি দিলেন। বের হয়ে এসে মন খারাপ করে বসে আছি। হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, স্যার, একটা উত্তর লিখেন আর এক হাজার টাকা দেন। অগত্যা তাই করলাম। তিনি ভিতরে ঢুকে সিএসকে কী কী বললেন, সিএস আবার আমাকে ডাকলেন। তিনি এবার মিষ্টি করে আমাকে দুয়েক কথা বলে বিদায় করে দিলেন। চিনলাম, এই হলো আমার ক্যাডার। ওই দুই চিকিৎসক আরো অনেক কাণ্ড করেছিলেন। একপর্যায়ে আমি প্রায় হিন্দু বিদ্বেষী হয়ে যাই। অনেক পরে বুঝি। আসলে মানুষ কে কেমন সেটাই মূল কথা, হিন্দু, মুসলিম বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনো ব্যাপার নয়। পরে আমি আমার আত্মার কাছাকাছি অনেক অমুসলিম মানুষকে পাই। আমার আগের ধারণা আমাকে লজ্জায় ম্রিয়মাণ করে ফেলে। এজন্য ইসলামে বারবার বলা হয় কোনো ঐশীবাণী নয় তোমার ধর্মের পরিচয় মানুষের প্রতি ঐশীবাণী অনুযায়ী তোমার আচরণ। অনেক মুসলমানের আচরণও অন্য ধর্মের মানুষের কাছে ইসলামকে ঘৃণ্য করেছে।

ডুমুরিয়ায় কিছুদিন থাকতে হয়েছিলো। থাকার জায়গা ছিলো বীভৎস। খাওয়ার অবস্থাও খারাপ। হেল্থ কমপ্লেক্স থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে বাজারে গিয়ে খেতে হতো। গ্রামের বাজারের খাবার, তার ওপর বালু করকর করতো। টিএইচএ এবং আরএমও সপরিবারে ক্যাম্পাসে থাকতেন। একবেলাও কোনোদিন খেতে ডাকেননি। তবে টিএইচএদের অনেকের কাছেই আমি পিতৃস্নেহ পেয়েছি। ফুলতলার আলমগীর স্যার বিদায় দেওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। কেন আমি জানি না। কখনো কটু কথা বলতেন না। স্যার সবসময় একটা ব্যাগ হাতে হাঁটতেন, আমি যদি জিজ্ঞেস করতাম, স্যার ব্যাগের মধ্যে কী? স্যার বলতেন, ইটাডুডুল কিতাব। বারহাট্টায় টিএইচএ ছিলেন জ্যোতির্ময় স্যার (Jyotirmay Aich)। আমার ফ্রেন্ড লিস্টে আছেন। তার সম্পর্কে আমার মিথ্যা প্রশংসার প্রয়োজন নেই। স্যারের মতো সজ্জন মানুষ, সৎ প্রশাসক সারাজীবনে আমি খুব কম দেখেছি।
মাঝে মাঝে রাতে থাকতেন, সেদিন কতো যে গল্প করতেন। খুব মৃদু ভাষায় কথা বলতেন। বটবৃক্ষের ছায়ায় রাখতেন। সারাজীবন তার কথা আমার মনে থাকবে। পরে তিনি ডিসিএস হয়ে নেত্রকোণায় চলে যান। জ্যোতির্ময় স্যারের পর বারহাট্টায় টিএইচএ হয়ে আসেন রফিক স্যার। তার কাছেও অনেক স্নেহ মমতা পেয়েছি। ঢাকা ফেরার পথে স্যার মোটরসাইকেলে করে ময়মনসিংহ পর্যন্ত নিয়ে আসতেন। বাসায় নিয়ে খাওয়াতেন, তারপর চরপাড়ায় নিয়ে বাসে তুলে দিতেন। রোজার সময় আমাকে নিয়ে মোটরসাইকেলে মোহনগঞ্জে গিয়ে ইফতার কিনে আনতেন। বিপদ আপদে সোজা হয়ে সামনে দাঁড়াতেন। সেসব খুব সহজ ছিলো না। আসলে ঢালাওভাবে কোনো পেশা, শ্রেণি, অঞ্চল বা ধর্ম নয়। পার্থক্যটা মানুষে মানুষে। মানুষ কখনোই সমান নয়। সব পেশা, শ্রেণি, অঞ্চল এবং ধর্মের মানুষের মাঝেই ভালো ও মন্দ মানুষ আছে। দৈবচয়ন আপনাকে যার কাছে পাঠায়। কাউকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা ঠিক কাজ নয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত