প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: আবরার ফাহাদ: ‘অসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু’

ড. সেলিম জাহান: খুব নীরবে চলে গেলো ৭ অক্টোবর। দু’বছর পরে বহুজনের হয়তো মনেও নেই যে, ৭ অক্টোবর ছিলো আবরার ফাহাদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দু’বছর আগে এই দিনে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রটি জীবন হারিয়েছিলো পশুত্ব, সহিংসতা ও নৃশংসতার কাছে। না, ছেলেটিকে আমি চিনতাম না। নামও জানতাম না তার। দেখা হয়নি তার সঙ্গে কখনো। কিন্তু তবু আবরার ফাহাদকে আমি চিনি- কারণ আমি বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ, দীপনদেরও চিনি। আবরার কী রাজনীতির শিকার, সে কী প্রাণ দিয়েছে মতামতের ভেদাভেদের কারণে, সে কী চলে গেলো অন্যের ক্রোধের মূল্য দিতে গিয়ে? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হলেও আবরার আসলে আত্মাহুতি দিয়েছে নৃশংসতার কাছে, শিকার হয়েছে সহিংতার, হার মেনেছে পশুত্বের কাছে। যারা আবরারের ওপরে চড়াও হয়েছিলো, তারা ছাত্র নয়, তারা তরুণ নয়, তারা হয়তো মানুষও নয়, তারা নৃশংসতার ছোরা, তারা সহিংতার তরবারি, তারা পশুত্বের রাম-দা।
ওইদিন শুধু আবরারের প্রাণহানি ঘটেনি, মৃত্যু হয়েছে সহনশীলতার, শুভ বুদ্ধির আর মানবতার। আমাদের সমাজে ভিন্নতা তো নতুন কিছু নয়। সংস্কৃতির ভিন্নতা আছে, ভিন্নতা রয়েছে ধর্মের, রাজনৈতিক বিশ্বাসের, আর্থ-সামাজিক অবস্থানের, জীবনযাপন প্রক্রিয়ার।

সে ভিন্নতা নিয়েও আমরা সম্প্রীতির সঙ্গে, সৌহার্দ্যরে সঙ্গে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বসবাস করেছি যুগ যুগ ধরে। সেই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তিশালী করেছে, দুর্বল করেনি, ঋদ্ধ করেছে, শূন্য করেনি, বিকশিত করেছে, সংকুচিত করেনি। বিরোধ কী ঘটেনি তখন, মতানৈক্য কী দেখা যায়নি ওই সময়ে, সংঘর্ষ কী বাধেনি সে বেলায়? সবই হয়েছে। কিন্তু সেসবই আবার মিটিয়ে ফেলা হয়েছে বিবিধ প্রক্রিয়ায়। ভিন্নতা মাত্রই ভেদাভেদে পরিণত হয়নি। তা হলে এখন কেন সব কিছু বদলে গেলো? পাঁচটি কারণ বারবার আমার চিন্তা-চেতনায় ওঠে আসে। প্রথমত: আমাদের সমাজে মানুষে মানুষে একটি সম্পর্ক ছিলো আত্মিক, অন্যটি ব্যবসায়িক। আজ সব সম্পর্কই স্বার্থের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছি। কোনোদিন ভাবিনি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক অর্থের হয়ে দাঁড়াবে, ভাইবোনের সম্পর্ক ব্যবসায়িক হয়ে যাবে, সতীর্থ বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক স্বার্থ-সম্পর্কে রূপান্তরিত হবেÑ রাজনৈতিক স্বার্থ, আর্থিক স্বার্থ, সামাজিক স্বার্থ! স্বার্থ যখন সব সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, তখন স্বার্থের বিপক্ষে কোনো মতভেদই সহ্য করা যায় না। দ্বিতীয়ত: স্বার্থের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক ‘ইউ’ আর ‘কিউ’ এর মতো। স্বার্থ যেমন বহু অর্থের চালিকা শক্তি, অর্থও তেমনি বহু স্বার্থের যোগানদার।

অর্থের বিনিময়ে বহু স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ মানুষকে অপমান করতে, নিগৃহীত হতে, প্রাণহানি ঘটাতে দ্বিধা করেন না। বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণ সমাজের মাঝে, আমাদের নানা ছাত্র সংঠনের মধ্যে এ প্রবণতাটি প্রবল। তৃতীয়ত: স্বার্থ ও অর্থ যেখানে মুখ্য, সেখানে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হবেই। আত্মকেন্দ্রিকতা কতোগুলো মাত্রিকতার সৃষ্টি করে যেমন, যেকোনো ব্যাপারে চরম অবস্থান নেওয়া, সহনশীলতা হারিয়ে ফেলা, পরমত সহিষ্ণুতার বিলুপ্তি। এ অবস্থায় কোনো রকম দ্বিমতের অবস্থান স্বীকার করা হয় না। ‘তুমি আমা থেকে যেকোনো দিকেই ভিন্ন হলে, তুমি আমার কাছে শুধু অগ্রহণযোগ্যই নও, তুমি আমার কাছে পরিত্যাজ্য’ সেটাই আজ আমাদের সামাজিক সম্পর্কের একটা মূলসূত্র। চতুর্থত: যেকোনো বিরোধ বা মতভেদ বিবিধ উপায়ে নিরসন করা যায় বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, মধ্যস্থতা এমনকি বিরাগের দ্বারাও। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সমাজে সব বিরোধের মীমাংসা করা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে ও শক্তি প্রয়োগের দ্বারা।

আমাদের সমাজের অস্ত্রায়ন ও পেশীশক্তির সংস্কৃতি বিরোধ মীমাংসার অন্য সব উপকরণকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। অস্ত্র আজ আমাদের ভাষা, সংহিসতা সংস্কৃতি। পঞ্চমত: অস্ত্রায়নের পথ ধরেই আসে নির্মমতা আর নৃশংসতা। অস্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে গেলে নৃশংসতা সেখানে স্বাভাবিক হয়ে যায়। সেটা আমরা বিশ্বজিৎ থেকে আবরার পর্যন্ত প্রতিটি হত্যাকা দেখেছি। নৃশংসতা মানুষের পাশবিকতাকে উসকে দেয় আর তাই নৃশংসতার কালে মানুষের বিচারবুদ্ধি কাজ করে না। আবরারের মৃত্যুর পরে কানাডা প্রবাসী সাইফুল্লাহ্ মাহফুজ লিখেছিলেন একটি কবিতা ‘অসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু’। কবিতাটি পড়ে আপ্লæত হয়েছিলাম তিনটি কারণে প্রথমত: সদ্যাহত আবরার ফাহাদ কবিতাটির কেন্দ্রবিন্দু, দ্বিতীয়ত: কবিতাটির বক্তব্য জোরালোভাবে মানবিক এবং তৃতীয়ত: এ কবিতাটিতে অবিশ্বাস্য রকমের অনুরণন রয়েছে প্রয়াত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘না-পাঠানো চিঠি’ কবিতাটির। ‘অসংখ্য স্বপ্নের অপমৃত্যু’ কবিতাটি পাঠ করলাম এবং সহভাগ করে নিলাম সবার সঙ্গে। লেখক : অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত