প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শাহনাজ খুশি: যেদিন আপনি-আমি কেউ থাকবো না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেদিন থাকবেন একজন মানুষ

শাহনাজ খুশি: সময়টা সে বছর জানুয়ারি মাস। গণভবন থেকে আমার এবং বৃন্দাবনের নামে কার্ড পেলাম। পিঠা খাবার নিমন্ত্রণ। অভিনয় শিল্পী হিসেবে। বুকের ভেতর ধুকধুক করতে লাগলো। আমি কোনো স্টার তকমার শিল্পী নই বলেই জানি। বিস্ময়, ভালোলাগা, অস্বস্তি সব মিলিয়ে গেলাম। একটা বিষয় বলে রাখি, আমার ছেলেরা অনেক ছোটবেলা থেকে কিছু জিনিস সংগ্রহ করে। যেমন, কোকের বোতলের ছিপি কৌটায় করে রাখে, প্যাকেট বাধা রাবার,পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষের ছবি কেটে এনে একটা ডায়রিতে পেস্টিং করে, কয়েন জমায়, প্রিয় মানুষ, গুণী মানুষদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে। তো আমি কার্ড পাওয়ারর পর থেকে তাদের বায়না, শেখ হাসিনা আন্টির মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটা অটোগ্রাফ নিয়ে দিবা। যেখানে ফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঢোকা যাবে না, সেখানে আমি তার কাছে যেয়ে অটোগ্রাফ নেবো। কতো প্রটোকল, সিকিউরিটি, নারে বাবা পারবো না। তারা একবার চঞ্চলকে বলে, একবার আমি, একবার বাবা। শেষ পর্যন্ত সাহস করে একট পুরাতন ডায়রি নিয়ে গেলাম। অনুভূতিটা ‘ওটিতে ঢোকার মতো। যেয়ে দেখলাম ওইঅর্থে অনেক অভিনয় শিল্পী নাই। আমরা তিনজন ছাড়া ৪/৫ জনের বেশি নয়। গানের শিল্পী ছিলেন, নিউজের কিছু নামকরা ভাই-বোন এবং তার পরিবারের মানুষ।

অপেক্ষার অবসান করে তিনি এলেন। সবার সঙ্গে সালাম কুশল বিনিময় করলেন। আমার তখন টার্গের একটাই, আমার ছেলেদের জন্য একটা অটোগ্রাফ। সিকিউরিটির অনেকে আমাদের নাটকের খুব ভক্ত ততোক্ষণে জেনেছি। অনুরোধও করেছি ডায়েরিটাই একটা স্বাক্ষর নিয়ে দিতে। সবাই কঠিনভাবে বলেছে, অসম্ভব ম্যাডাম। চঞ্চল সাহস দিয়ে বললো সামনে যেয়ে বলো। আমি সাহস করে সামনে যেতেই, আকাশ ভেঙে পড়া বিস্ময় আমার জন্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকে নিলেন।

আমার নাটক তার খুব পছন্দের বললেন, বললেন, ওয়ান ইলেভেনের বন্দী সময়ে তিনি আমাদের অনেক নাটক দেখেছেন, খুব ভালো লাগে। আমার অভিনয় নাকি অভিনয় মনে হয় না বললেন। প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি যে ভাষাটা বল, সেটা বগুড়ার ভাষা না? আমি বললাম, না আপা, পাবনার। তিনি আমার গায়ে হাত বুলিয়ে কথা বলছিলেন। আমি কেবল স্তম্ভিত, হতবিহবল। আমি সাহস করে বলে ফেললাম, ‘আপা আমার ছেলে বঙ্গবন্ধুর আপনার খুব ভক্ত। একটা অটোগ্রাফ চেয়েছে। আপা বললেন, ‘আনলে না কেন? বললাম, বাচ্চা এলাও না কার্ডে লেখা, যদি ঢুকতে না দেয় তাই। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কে ঢুকতে দেবে না। বাচ্চারা আমার অনেক ভালো লাগার। এমনি দুর্ভাগ্য আমার, সে মুহূর্তে কলমটা খুঁজে পেলাম না। ভয়ে, লজ্জায় থেমে গেলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ধর্মঘট চলছিলো। তাদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মিটিং ছিলো। তিনি চলে গেলেন। আমি চরম আহত। অটোগ্রাফ নিতে পারলাম না। পিঠা খাওয়া আমার মাথায় উঠল। চঞ্চল বললো, ছোট আপারটা নে। একটা কিছু অন্তত তাদের বলা যাবে। ছোট আপাকে বললাম, তিনি রাজি হলেন না। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে না করলেন। ডায়রি বগলদাবা করে ডিনারের টেবিলে বসলাম। মনটা অসম্ভব ভারাক্রান্ত। দিব্য, সৌম্য কিচ্ছু চায় না সহজে, তাই মনটা বেশি খারাপ। দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। হঠাৎ একজন স্পেশাল সিকিউরিটির লোক এসে বললেন, ‘ম্যাডাম ডাকছেন আপনাকে। আমি দ্রুত গেলাম, তিনি হাসি মুখে আমাকে বললেন, কই, তোমাকে আমি খুঁজছি। ছেলের অটোগ্রাফ দিই দাও। আমি ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ডায়েরি দিতেই, নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, দিব্য, সৌম্য। তিনি বললেন,‘একসঙ্গে দিলাম কিন্তু। আমি নির্লজ্জের মতো বললাম, আপা, তারা জমজ, মারামারি করবে কাঁদবে। তিনি বললেন, ‘জমজ নাকি’ আহা হা, নিয়ে আসলেই পারতে, দেখতাম পুরো সিকিউরিটি ঘিরে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখছে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,খুব সাধারণ একজন মায়ের ইচ্ছাপূরণ করছেন। সবাই সেদিন কী ভেবেছিলো জানি না, কিন্তু আমার ভাবনাজুড়ে সেদিন অপার বিস্ময়, আর রাজ্য জয়ের সুখ। আমার ছেলেদের আমি এক বিস্ময়ভরা প্রধানমন্ত্রী, আর তার মায়ের মতোই এক সাধারণ মাকে ডায়েরির পাতায় বন্দী করে নিয়ে গেলাম।

যেদিন আপনি, আমি কেউ থাকবো না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেদিন আমার ছেলেদের কাছে এ অটোগ্রাফটা থাকবে। থাকবে একজন মানুষ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থেকেও সবার কাছে শুধু আপা হয়ে থাকার আত্মিক মন্ত্রের কথা। থাকবে আপনার অতি সাধারণ থেকে, অসাধারণ সব পথ চলার ইতিহাস এবং বাংলাদেশকে ভালোবাসার কথা, ঘুমপাড়ানী মুগ্ধকর গল্পের মতো হয়ে। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার কর্মে, আপন মহিমায়। জয়তু শেখ হাসিনা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের প্রিয় আপা। সময় কতোকিছু চমক এনে দেয়। কাকতালীয়ভাবে কতো ঘটনায় না ঘটে জীবনে। যার জন্য অটোগ্রাফ চেয়ে এনেছিলাম,আমার সেই ছেলেটাই গত বছর স্বশরীরে, নিজ গুনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিমন্ত্রণে, তার সঙ্গে চা-চক্রে এবং কথা বলতে যায় গণভবনে। কারণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত,বায়োপিকে দিব্য বঙ্গবন্ধুর কিশোর চরিত্রে অভিনয় করেছে। ঘটনাটা ভীষণ-ভীষণ রকম আশ্চর্য্যজনক আমার কাছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, চা খেয়েছেন, নিজের হাতে তাদের বই এবং স্মারক উপহার দিয়েছেন। লেখক : অভিনেত্রী। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত