প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুব্রত বিশ্বাস: রোহিঙ্গা সমস্যার ভবিষ্যৎ ও বাস্তবতা

সুব্রত বিশ্বাস: মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিরোধ ও দ্বদ্ব কিন্তু আজকের নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এই সম্পর্কে উত্তেজনার শুরু। ব্রিটিশরা স্বাভাবিকভাবেই বিভক্তি ও শাসননীতি প্রয়োগ করেছিলো। ঔপনিবেশিক শাসকেরা অন্যান্য গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের চেয়ে মুসলিমদের পছন্দ করতো বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মুসলিমদের সেনা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলো ব্রিটিশরা। অন্যদিকে বৌদ্ধ ও অন্যান্য সম্প্রদায় জাপানের পক্ষ নিয়েছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো, জাপানের সঙ্গে মিলে মিয়ানমার থেকে ঔপনিবেশিক শক্তিকে তাড়ানো। আর এই জায়গাতেই সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে বার্মা থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত মিলিয়ে সরকারি হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় ৫-১০ লাখ। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশ থেকে আবার নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এমন সম্ভাবনাও খুব বেশি দেখছে না বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নের জন্য মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইন রাজ্যে সুনির্দিষ্টভাবে প্রচারাভিযান চালিয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে জাতিগত নির্মূল বলাটা কোনো ভুল নয়। সেখানে ছকে বাঁধা নিয়মে ও পূর্বপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী একেকটি গ্রাম প্রথমে ঘিরে ফেলছে, পরে গুলি করছে এবং আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আইনি ভাষায় বললে, এটি হলো মানবতাবিরোধী অপরাধ।’

গত ৫০ বছরে মোট তিন দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। ১৯৭৭-৭৮, ১৯৯১-৯২ ও ২০১২ সাল। প্রতিবারই সহিংসতা এড়াতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। এসব সহিংসতা ও নিপীড়নের অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করছে মিয়ানমার সরকার। গত এপ্রিলে অং সান সু চি জাতিগত নির্মূলের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-নিপীড়ন নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশক ধরে এই সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সামরিক জান্তা সরকারের আমলে চলা সহিংসতা থেকে কোনোক্রমে রক্ষা পেয়েছিলো তারা। কিন্তু তখন থেকেই হারাতে হয় মৌলিক অধিকার। মানবাধিকারকর্মী ও বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা অনেক বছর ধরেই গণহত্যার সম্মুখীন হচ্ছে। মিয়ানমারের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সহজ লক্ষ্য তারা। রোহিঙ্গারা একটি ভিন্ন নৃ-তাত্তি¡ক গোষ্ঠী এবং এদের চেহারা ও ধর্ম, দুই-ই ভিন্ন। সুতরাং রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করাও সহজ।’ চার বছরে পড়ছে রোহিঙ্গা সমস্যা, মিয়ানমারে ফেব্রæয়ারি ২০২১ তারিখে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। সামরিক জান্তা সরকার ২০২১ সালের ১১ মার্চ থেকে আরাকান আর্মিকে (এএ) সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি হামলা চালানো বন্ধ করে দেশজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে রাজি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

৩১ ডিসেম্বর ২০২০ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কর্ম অধিবেশনে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সংখ্যালঘু ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবের পক্ষে নতুনভাবে নয়টা দেশ ভোট দিয়েছে, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরের এই নয়টি দেশ রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সংখ্যালঘু ইস্যুতে তাদের আগেকার অবস্থান থেকে সরে এসেছে। প্রস্তাবটির পক্ষে ১৩০টি ভোট আর বিপক্ষে ৯টি ভোট পড়েছে।। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এই ৯টি দেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু বিষয়ক প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান না নিয়ে ভোটদানে বিরত থেকেছিলো। মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিয়েছে মিয়ানমার, চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, কম্বোডিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও জিম্বাবুয়ে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও জাপানসহ ২৫টি দেশ প্রস্তাবের ভোটাভুটি থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ১৮ নভেম্বর ২০২০ এ জাতিসংঘের তৃতীয় কমিটিতে প্রস্তাবটি আনে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া, প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিসহ আরো কিছু বিষয়ে মিয়ানমারকে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটির নির্বাহী ক্ষমতা গ্রহণ করার পর রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

২ ফেব্রæয়ারি ২০২১ জরুরি বৈঠকের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানান, এখনো ৬ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনে আছে, যাদের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার বিভিন্ন শিবিরে অবস্থান করছে। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাব ফেলছে এবং তাদের পরিস্থিতি আরো খারাপ করে দিতে পারে। ২০২১ এর মার্চ মাসে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আসিয়ানের মধ্যস্থতা সংক্রান্ত যে প্রস্তাব তোলা হয়েছিলো, সেখানে রাখাইন রাজ্যের নাম না নেওয়া হলেও বাংলাদেশে এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবস্থানকারীদের সমস্যা (রোহিঙ্গা সমস্যা) সমাধানে আরো মনোযোগী হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সুপারিশে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ‘যাচাই-বাছাইয়ের’ পর প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে বলা হয়েছে এবং আসিয়ান সচিবালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতার পর এর জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দ্রæত রাখাইনে প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি প্রস্তাব জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতার পর ১২ জুলাই ২০২১, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে প্রথমবারের মতো কোনো প্রস্তাব ভোটাভুটি ছাড়া পাস হয়। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টায় অর্জিত এই সফলতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফক, জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধসহ সব ধরনের নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর আরাকান ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি) সেনা প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাখাইন প্রদেশে অং সান সু চির এনএলডির তেমন জনপ্রিয়তা নেই। বর্তমান সরকার আরাকানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করছে, অভ্যুত্থানের পর দেশের অন্যান্য স্থানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও রাখাইনের সাতটি শহরাঞ্চলে এবং পাশের চিন রাজ্যে সেনাবাহিনী ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু করে দেয়। এএ’র অধিকাংশ সদস্যই রাখাইন নৃ-গোষ্ঠী ও স্থানীয় সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। গত দুই বছরে বিদ্রোহী এ গোষ্ঠীটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলো। এএ নভেম্বর ২০২০ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাময়িক অস্ত্রবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছিলো। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো অং সান সু চির দল এনএলডিসহ দেশটির বিরোধী দলগুলো ১৬ এপ্রিল ২০২১ একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গড়ে তুলেছে যা ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি নামে পরিচিত।

এনইউজি রোহিঙ্গাদের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৩ জুন ২০২১ এনইউজি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে নীতি ঘোষণা করেছে, তাতে বেশ কয়েকটি অঙ্গীকার করা হয়েছে। এতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গারা যে হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তার স্বীকৃতির পাশাপাশি যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিচারের কথা বলা হয়েছে। এই ঘোষণায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি মেনে চলার অঙ্গীকার আছে। সেই সঙ্গে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বিলোপের অঙ্গীকার করেছে। এই আইনের দ্বারা রোহিঙ্গাদের অধিকার হরণ করা হয়েছিলো। ২০১৭ সালে সর্বশেষ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজনীতিকদের এতোটা খোলাখুলি রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি। এটি মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকারের তরফ থেকে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ের স্বীকৃতি। এনইউজির এই ঘোষণা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় গ্রæপগুলোর মধ্যেও আশাবাদ তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটাকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে বলে জানিয়েছে। তাদের সদিচ্ছাকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি। তবে তারা কীভাবে তা করবে এবং আদৌ তারা আরাকানের আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন পাবে কিনা এসব বিষয়ে রূপরেখা প্রণয়নের মতো অবস্থা তাদের এখনো আসেনি।

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের ক‚টনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থে তা কাজে লাগাতে হবে। মিয়ানমারে সহিংসতা বেড়ে গেলে কিংবা গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তা নানাভাবে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে যা আমাদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সুরক্ষাকে বিঘিœত করতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জাতিসংঘের সক্রিয় আলোচনায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্বসম্প্রদায়ের রোহিঙ্গাদের প্রতি মনোযোগ যাতে না হারিয়ে যায় সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে নিজেদের আবাসস্থলে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভ‚মিকা রাখার আহন চলমান রাখতে হবে। লেখক: ব্যবসায়ী

সর্বাধিক পঠিত