প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ সূচকের তলানিতে ঢাকা, শীর্ষে চট্টগ্রাম

টিবিএস রিপোর্ট: ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ সূচকের তলানিতে ঢাকা, শীর্ষে চট্টগ্রাম ব্যবসায়ীক পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি করলেও, তবে এখনো বেশকিছু ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে

সরকারের শিল্প বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ঢাকার বাইরের বিভাগগুলো ব্যবসার জন্য বেশি সহায়ক হয়ে উঠছে। ব্যবসা সহযোগী পরিবেশ নির্ণয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা বিভাগের বাইরে ব্যবসা পরিচালনার সুবিধার দিক থেকে এখন পর্যন্ত শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম, তারপর রয়েছে যথাক্রমে- খুলনা, সিলেট, রংপুর ও বরিশাল বিভাগ।

বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) শীর্ষক ব্যবসা সহায়ক সূচক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে দেশের ব্যববসায়ীদের ওপর গত এক বছর ধরে জরিপ চালিয়ে এ সূচক তৈরি করে। যা বৃহস্পতিবার (৭ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০টি মানদণ্ডের মধ্যে ৪টিতেই এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম। এর বাইরে খুলনা, সিলেট, রংপুর, বরিশালের ও ময়মনসিংহের মত বিভাগও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বিবেচনায় এগিয়ে। কিন্তু, ১০টি মানদন্ডের কোনটিতেই ঢাকা শীর্ষে আসতে পারেনি।

কারখানা স্থাপনের জন্য দরকারি জমি স্বল্পতার কারণে ঢাকায় শিল্প স্থাপন কিংবা ব্যবসা শুরু- দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব সমস্যা ঢাকার বাইরের জেলা সদরগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম, বলে জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা মতামত দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে ব্যবসা ও শিল্প বিকেন্দ্রীকরণ করতে সরকারও কর অবকাশ সুবিধার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশকিছু সুবিধা তৈরি করেছে বলেও জানান তারা।

জরিপে ব্যবসা সংশ্লিষ্ট ১০টি বিষয়ের উপর উদ্যোক্তাদের মতামত নেওয়া হয়। তাতে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ব্যবসায়ীক পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি করলেও, তবে এখনো বেশকিছু ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে।

দেশের ৮টি বিভাগের ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে বিবিএক্স সূচক প্রস্তুত করা হয়েছে।

সূচক প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু তুলে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজ জানান, ৪৫১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং ১০টি মানদণ্ড- ব্যবস্থা শুরু, ভূমি প্রাপ্তির সম্ভাবনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মাবলী জানার সুবিধা, সকল ধরনের তথ্যপ্রাপ্তির সুবিধা, শ্রম আইন, বিরোধ নিষ্পত্তি, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সুবিধা, কর প্রদান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সহজে অর্থায়ন লাভের সুবিধাকে পারফরম্যান্স নির্দেশক হিসেবে ধরে বিবিএক্স প্রস্তুত করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের ব্লগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ঢাকায় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির ওপরই বাংলাদেশের মধ্য-আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ নির্ভর করবে। কারণ, দেশের প্রশাসনিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায়, এ বিভাগে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বসবাস। জিডিপিতে অবদান এক-পঞ্চমাংশ এবং চাকরির বাজারে এক-তৃতীয়াংশ অবদান রাখে।

তবে বাস্তবতা হলো, আকর্ষণীয় বিনিয়োগ অঞ্চল হিসেবে অবস্থান হারাচ্ছে ঢাকা, সে তুলনায় জমি প্রাপ্তি থেকে ব্যবসা শুরু ও সহজে কর প্রদানে সুবিধার মতো প্রায় সকল দিক থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল প্রায় সব মানদণ্ডেই ভালো করছে।

ব্যবসা অনুকূল পরিবেশে ঢাকার পিছিয়ে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, অতি-কেন্দ্রীয়করণের নীতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ঢাকায় থাকার মতো কিছু বিধিমালার কারণে এখানে ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছাচারী ও অন্যায্য আচরণেরও শিকার হন।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে কর প্রদানের মানদণ্ডটির উদাহরণ তুলে ধরা হয়। এই ‘পেয়িং ট্যাক্স পিলারে’ ঢাকার অবস্থান সবার নিচে। অর্থাৎ ঢাকার ব্যবসায়ীরা এর বাইরের এলাকার মানুষের চেয়ে কর পরিশোধে বেশি সমস্যায় ভোগেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপের ফলাফল ঢাকার বাইরে ব্যবসা স্থাপনের জরুরি তাগিদ ও প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র বিকাশের উদীয়মান সম্ভাবনা উভয় দিকই তুলে ধরছে। চট্টগ্রামে ব্যবসা সহযোগী পরিবেশের সুবিধা গ্রহণ করে একে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের এলাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, কর্ণফুলী নদী তলদেশের টানেল নির্মাণ, প্রস্তাবিত বে-কন্টেইনার টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী কেন্দ্রিক এনার্জি হাব-সহ অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা এই সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এমসিসিআই জানায়,গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার বাইরে শিল্প-কারখানা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকেও নানামুখী উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর বাইরে দূরবর্তী জেলায় শিল্প স্থাপনে কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার।

আবার দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার জন্য বহুল আকাঙ্খিত পদ্মা সেতু প্রকল্প শেষ হওয়ার পথে। ফলে দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলোতেও নতুন নতুন শিল্প ও ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে- বলেও সংস্থার প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।

অনুষ্ঠানের আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতারাও দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ব্যবসায়ীক পরিবেশে ঢাকার পিছিয়ে যাওয়াকে ‘অতি-তাৎপর্যপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তারা দেশের ব্যবসায়ীক পরিবেশে উন্নতি হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন।

কিন্তু বন্দরে জাহাজীকরণে সমস্যা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, হাই-লজিস্টিকস কস্টসহ বেশকিছু সমস্যা তুলে ধরে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের তাগিদ দেন।

অ্যাপেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ব্যবসা সহায়ক পরিবেশে ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামসহ অন্যরা এগিয়ে। তবুও কেন অনেকে ঢাকা ছাড়তে চাইছেন না- তা পর্যালোচনা করা দরকার।

তিনি বলেন, “ঢাকার বাইরে ট্যাক্স হলিডে আছে, কিন্তু স্কুল, হাসপাতালসহ অন্যান্য সুবিধা ঢাকার মানে নেই। ঢাকার বাইরে শিল্প ব্যবসা নিতে হলে কেবল কর সুবিধা নয়, পুরো ইকো-সিস্টেমকে ডেভেলপ করতে হবে।”

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত নাওকি ইতো ব্যবসায়ীক পরিবেশে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে বিদেশী বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা আরো বাড়বে বলে আশার প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে চায়না প্লাস ওয়ান- ব্যবসায়ীক কৌশলের অংশ হিসেবে জাপানি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

তবে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ দেশের অবকাঠামো অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। আগামী ৫ বছরের মধ্যে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে আশা করছি।

তাছাড়া, শুল্ক ছাড়করণে সমস্যাগুলোর সমাধান করা, বাণিজ্য সম্পর্কিত অর্থায়ন সহজ করা এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের স্থানীয়দের মত সমান সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দিলেও শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এ সুবিধা পায় না। এটি বিবেচনা করা দরকার।

এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবিরের সভাপতিত্বে সারণী প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। ব্যবসা অনুকূল পরিবেশ যাচাইয়ের দেশীয় উদ্যোগটিকে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, এ ধরনের সূচক দেশের ব্যবসা সহযোগী পরিবেশ উন্নয়নে সহায়তা করবে।

“বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে’র মেথডলজি নিয়ে বরাবরই আমাদের প্রশ্ন ছিলো। তারা কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার ব্যবসায়ীদের তথ্যের ভিত্তিতে ইনডেক্স তৈরি করতো, কিন্তু বিবিএক্স দেশের সব বিভাগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় – সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সূচক তৈরি করেছে।”

নির্ভরযোগ্য একটি সূচক দেশে-বিদেশে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, প্রতিবছরই বিশ্বব্যাংক ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স প্রকাশ করে। তাতে বরাবরই বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। সর্বশেষ ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম।

তবে কোন কোন দেশকে সারণীতে এগিয়ে আনার অভিযোগ ওঠার পর, সম্প্রতি দাতাসংস্থাটি তা আর প্রকাশ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের বিবিএক্স নামে বিশ্বব্যাংকের আদলেই বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স প্রকাশিত হলো।

এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবির অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এতে ব্যবসায়ী নেতাদের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও বাণিজ্যিক উপদেষ্টামণ্ডলীও বক্তব্য দেন।

সর্বাধিক পঠিত