প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাদিয়া নাসরিন: জীবন আবেদনে সন্তানের সঙ্গে সিনায় সিনায় যোগাযোগ দরকার

সাদিয়া নাসরিন : শাহরুখের ছেলে আরিয়ান বলেছে তার বাবা এতোই ব্যস্ত যে, সন্তানেরও বাবার সঙ্গে কথা বলতে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। এপার বাংলা ওপার বাংলায় আরিয়ান দু’দিন ধরেই শীর্ষ শিরোনাম। সেই একই শিরোনাম, ঐশী রহমান, ফারদিন হুদা মুগ্ধ বা ইফতেখার দিহান, আমাদের শিরোনামের সন্তান। আমাদের ছাপোষা ঘরের ঐশী রহমান, ফারদিন হুদা মুগ্ধ, ইফতেখার দিহান বা খান পুত্র আরিয়ান, সতেরো আঠারো বছরের জীবনগুলো সব। তারা সবাই আমাদের সেইসব ‘বখে যাওয়া’ সন্তান যাদের সঙ্গে আমরাই তৈরি করেছি ব্যস্ততা আর দূরত্বের কঠিন আড়াল। সে আড়ালের ওপাশে দিনে দিনে গাঢ় হয়েছে গাঁজার ধোঁয়া, ইয়াবার ফয়েল কিংবা ধর্মের আফিম এবং আমরা ভোগ করেছি আমাদের কর্মফল। আড়ালের ওপার থেকে ঐশী, দিহান কিংবা আরিয়ানরা যেদিন বের হয়ে আসে সেদিন তাদের কেউ নেশাখোর, কেউ খুনি, কেউ ধর্ষক। যে সন্তানের জন্য আমরা দশ দুয়ারী ভিখেরির মতো কুড়িয়ে কুড়িয়ে ভালোবাসা আর সচ্ছলতা জমিয়ে রাখি, যে সন্তানকে বিত্ত আর সচ্ছলতা উপহার দিতে আমরা দিগবিদিক ছুটে বেড়াই, সেই সচ্ছলতার আগুনে নিজেদের জীবন পুড়িয়ে দাম শোধ করি আমরা মাতৃত্বের, পিতৃত্বের। হা জীবন! হা নিয়তি! এই নিয়তি আমরাই লিখেছি দিনের পর দিন ধরে।
আমাদের অবহেলায়, উদাসীনতায়, দায়িত্বহীন বেপরোয়া ব্যস্ততায় হাতের ফাঁক গলে আমাদের ঘুমঘোরে ঘর ছেড়ে যায় আমাদের সন্তান! সর্বস্ব হারিয়ে আমরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি হঠাৎ শিরোনাম হয়ে ওঠা আমাদের আত্মজের নামের দিকে। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষেরই ক্যারিয়ার নিয়ে একটা ফোকাসড পরিকল্পনা থাকাটা জরুরি। সন্তান এবং পেশা, চিত্ত এবং বিত্ত এই দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় করতে পারাটা খুব দরকার। কী দরকার, কেন দরকার, কতোটুকু দরকার তার পরিষ্কার ধারণা থাকতেই হয়। কখন ছুটবো, কখন থামবো, কখন ইউটার্ন করবো সেই নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকা চাই। আমার ভাবতে ভালো লাগে, এখন পর্যন্ত আমার ক্যারিয়ার এবং প্যারেন্টিং দুটোই আমার পরিকল্পনামতো চালাতে পেরেছি। আজ থেকে অনেকগুলো বছর আগে, ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা গ্রুপ ডেভেলপমেন্টের কান্ট্রি ম্যানেজার পদে ভাইবা দিতে গেলে রিজিওনাল ডিরেক্টর জানতে চেয়েছিলেন আমার ক্যারিয়ার প্ল্যান কী? আমি বলেছিলাম, ‘এখন আমার বয়স ত্রিশ। আমি চাই চল্লিশের আগেই এমন অবস্থানে যেতে, যেখানে পেশা আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে না, আমি পেশাকে নিয়ন্ত্রণ করবো’। তিনি খুব বিস্মিত হয়ে এই ‘চল্লিশের গেরো’র কারণ জানতে চেয়েছিলেন। আমি তিনটা কারণ বলেছিলাম। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো, ‘আমি যখন চল্লিশের ঘরে থাকবো তখন আমার একজন কিশোরী কন্যা এবং একজন কিশোর পুত্র থাকবে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে রহস্যময়, আবেগপূর্ণ এবং আনন্দ-বেদনার সংকটময় সময়টাতে আমি তাদের সঙ্গে থাকতে চাই।
একজন ছেলে আর একজন মেয়ের শৈশব থেকে তারুণ্যের দিকে ট্রানজিশনটা আমি খুব কাছ থেকে দেখতে চাই। পেশা যদি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে আমি এটা পারবো না।’ মঙ্গলময় আমার ইচ্ছের মূল্য দিয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছিলাম আমি অবারিত কর্মস্বাধীনতা নিয়ে। ক্রমে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ‘সংযোগ বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় সংস্থা হিসেবে কার্যক্রম শুরু করলো। তেত্রিশ বছর বয়সে এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে আমি দায়িত্ব গ্রহণ করি। তখন থেকেই আট, ছয় আর এক বছরের তিন সন্তান আমার সঙ্গেই বড় হয়েছে। তারা বড় হয়েছে, প্রতিষ্ঠানও বড় হয়েছে। আমরা একসঙ্গে দৌড়িয়েছি। স্কুল, কোচিং, প্রজেক্ট, সংসার সব একই গতিতে ছুটেছে। গত তিন বছর আমি গতি কমিয়েছি। একটা সময় পূর্ণ গতিতে ছুটেছি বলেই এখন গতি কমিয়েও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান আমি করতে পারি। যদি আরো ছুটতাম আরো অর্থ আসতো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই মূহুর্তগুলো হারাতাম। সন্তানরা আমার বুকের ওম হারাতো। আমাদের একসঙ্গে গান গাওয়া হতো না, কাশফুল চেনা হতো না, সময়কে আমরা ধরতে পারতাম না এবং আমার পরিকল্পনা এমনই। আমি আরো দু’বছর এমন মন্থর গতিতে চলবো। আমি দেখবো প্রজাপতির ডানা মেলা।
তারপর পাখিরা ওড়তে শিখবে, বড় দু’জন ব্যস্ত হবে নিজেদের পড়ালেখা আর ক্যারিয়ার প্ল্যান নিয়ে, ধনুক থেকে বের হয়ে যাবে তীর মহাজীবনের পানে। তারপর আমি আবার শুরু করবো রেইস। আমার নিয়তি সবসময় আমি লিখেছি এভাবেই, সবার চোখের সামনে। চিত্তবিত্তের সমন্বয় আমি শিখেছি নিজের কাছেই, যেন আমার দায়িত্বহীন বেপরোয়া ব্যস্ততায় কোনো কাবুলিওয়ালা এসে চুরি করে নিয়ে যেতে না পারে আমার সন্তান, আমাদের বুকের ওম না পেয়ে কোনো নেশার ওম যেন না খুঁজে আমার জঠরে বেড়ে ওঠা ধন। আমি শিখেছি, মাতৃত্ব মানে প্রাণের সঙ্গে প্রাণের প্রেম, প্রাণ থেকে প্রাণের শুরু… এ এক অপার্থীব জীবন আবেদন। এই জীবন আবেদনে সন্তানের সঙ্গে সিনায় সিনায় যোগাযোগ করতে না পারলে, নিজের পাপ-পুণ্যের জগত সন্তানের বোধের সঙ্গে সংযুক্ত করতে না পারলে সন্তান পৃথিবীতে আনা যায় না। আনা উচিত নয়। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত