প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রহমান বর্ণিল: যে কারণে আমাদের পাঠ্যবইকেন্দ্রিক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে

রহমান বর্ণিল : ‘মনে করিলাম উপদেশ এবং উৎসাহ দিয়া একেকটি ছাত্রকে ভাবী ভারতের একেকটি সেনাপতি করিয়া তুলিব। কাজ আরম্ভ করিয়া দিলাম। দেখিলাম, ভাবী ভারতবর্ষ অপেক্ষা আসন্ন এগ্জামিনের তাড়া ঢের বেশি। ছাত্রদিগকে গ্রামার অ্যাল্জেব্রার বহির্ভূত কোনো কথা বলিলে হেড্স্টার রাগ করে। মাস-দুয়েকের মধ্যে আমারও উৎসাহ নিস্তেজ হইয়া আসিল।’ ওপরের অংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একরাত্রি’ গল্প থেকে নেওয়া। গল্প কথক এখানে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির বাইরে ইতিহাস কিংবা আদর্শের পাঠ দিতে গিয়ে স্কুল প্রধান কর্তৃক প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছে। অর্থাৎ প্রধান শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ গঠনের পাঠ অপেক্ষা সিলেবাসের পড়ার গুরুত্ব বেশি। প্রকৃতপক্ষে ‘একরাত্রি’ গল্পের সেই হেডমাস্টার বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষকদের দেবতুল্য করে বহু লেখা চোখে পড়েছে।

আমি শুধু ভাবছি সবকিছু যদি এতোই চমৎকার হবে, তাহলে নুসরাতের গায়ে আগুনটা দিলো কে? মাদ্রাসায় হাজার হাজার ছাত্র বলাৎকারের শিকার হয় কার হতে? পরিমলের পেশা কী ছিলো? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের চুল কেটে দিলো কে? সবুজের বুকে চতুর্ভূজ আকৃতির সূর্য এঁকে ভুল অনুপাতের জাতীয় পতাকা বানিয়ে সেটা দিয়ে ফটোসেশন করে ফেসবুকে দেওয়া আহাম্মকগুলো কারা? ছাত্রী ধর্ষণের চিত্র ভিডিও ধারণ করে প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করছে কে? পিটিয়ে ছাত্র হত্যা করছে কে? পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে অন্তঃসত্ত্বা করলো কে? অরিত্রিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিলো কে? উত্তর হচ্ছে তারা সবাই কোনো না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। কিন্তু গতকাল এইসব নেতিবাচক বিষয়ে কেউ সাহস করে এক কলম লিখেনি। অথচ উচিত ছিলো শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিক নিয়ে কথা বলা। ইতিবাচক আলোচনায় যেমন ভালো শিক্ষকরা উৎসাহ পাবেন, তেমনি নেতিবাচক দিক নিয়ে কথা বললে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনার সাহস রাখতে হবে।

অন্তত পৃথিবীকে বদলানোর প্রয়াসে সমালোচনা অপরিহার্য। একাডেমিক শিক্ষা জীবনে বহু শিক্ষক পেয়েছি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পরও বহু শিক্ষককে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে একজন শিক্ষক যেমন হওয়া উচিত সেরকম কোনো শিক্ষক আমি অন্তত পাইনি। কী নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনে, কী কাছ থেকে দেখা অন্য শিক্ষকদের মধ্যে! আমাদের স্কুল জীবনে খুব নিবিড়ভাবে দেখতাম শিক্ষকরা সমাধান গাইড মুখস্থ করে এসে শ্রেণিকক্ষে অংক করাতেন, মুখস্থ করা গ্রামার শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের সামনে উদগীরণ করে নিজেকে ইংরেজির জাহাজ মনে করতেন, অনেকগুলো ইংরেজি শব্দ মুখস্থ বলতেন পারাকে পাণ্ডিত্য মনে করতেন। অথচ যদি ‘সাম্প্রদায়িকতা মানব সভ্যতার অন্তরায়’ বিষয়ে তাদের দুই লাইন বলতে বলা হয়, উত্তর বলা তো দূরে থাক, প্রশ্ন বুঝতে তাদের ঘেমে গোসল হয়ে যাবে। কেবল বেতিয়ে ছাত্রের পিঠে ঘা করে ফেলতে পারা এই আকাঠ মূর্খ শিক্ষকদের আমাদের সময় সেরা শিক্ষক বলা হতো এবং এখনো বলা হয়। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে শিক্ষক সেই মেরুদণ্ড গঠনের কারিগর। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষকই শিক্ষা বলতে এলজেব্রার সূত্র মুখস্থ করা আর ইংরেজি ভাষার গ্রামার ঠোঁটস্থ করতে পারাকেই বোঝেন। শিক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে এলজেব্রা কিংবা গ্রামারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না, কিন্তু এই গ্রামার, এলজেব্রার বাইরেও শিক্ষার বড় একটি উদ্দেশ্য আছে আমাদের অধিকাংশ শিক্ষকরা সেটা জানেন না। শিক্ষকদের এই মানসিক দৈন্যতা গোটা প্রজন্মকে ভুল পথে চালিত করছে। এই ভয়াবহতা আমরা এখনো আঁচ করতে পারিনি।

একজন শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের দায়িত্ব যে কেবল পাঠ্যসূচি মুখস্থ করানো নয়, তার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধও জাগিয়ে তোলা, এ সত্য অনুধাবন করতে পারার মতো শিক্ষক আজকের যুগে খুব বেশি নেই। বিষয়টির সঙ্গে আপনি দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, তবে আমার জীবনের অধিকাংশ শিক্ষককেই আমি এরকম দেখেছি। কথাটি অপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু অসত্য নয়। শিক্ষকদের এই পাঠ্যসূচিভিত্তিক শিক্ষাদানের কারণে আমাদের দেখতে হয় মাধ্যমিকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে পাস করেও একটা ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে কতোটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে জানে না! বিজয় দিবস কোন মাসের কতো তারিখে জানে না! লজ্জায় মরে যায় যখন শুনি এ প্লাস পাওয়া ছাত্র বলে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের স্বাধীনতা দিবস! এ লজ্জার দায় শিক্ষকরা কিছুতেই এড়াতে পারেন না। ভয়বহতা এখানে শেষ নয়। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর একটা ছাত্র যখন জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে প্রশাসনের স্ট্রিম অপারেশনে প্রাণ হারায় তখন আমরা কপাল চাপড়ে সেই ছেলেটির জন্য আপসোস করি, ভর্ৎসনা করি। কিন্তু আমরা ভুলে যাই এর গোড়াতেও আছে আমাদের ভুল শিক্ষা এবং ভুল মানুষ শিক্ষকতায় আসার ভূমিকা।

শিক্ষক যদি তার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতাবোধ, অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা, জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারতেন তাহলে জাতির এই ভাবী কর্ণধারেরা কাণ্ডারী না হয়ে জাতি ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে ওঠতো না। এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ না হলে সেখানে শিক্ষকের শিক্ষাদান অসাধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভীতি প্রদর্শনে প্রবল উৎসাহী। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একজন শিক্ষক ঠিক কতোটা শিক্ষক হয়ে ওঠেছেন সেটা নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা তাকে কতোটা ভয় পায় সেটার ওপর। আমাদের শিক্ষকরা ভাবেন ছাত্ররা তাকে যতো বেশি ভয় পায়, শিক্ষক হিসেবে তিনি ততো সফল! শিক্ষকদের এই মানসিকতার কারণেই ভিকারুননিসার মতো প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীর আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে।

একটা জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ আছে-‘one child, one teacher, one book and one pen can change the world’ প্রবাদানুসারে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার উপকরণগুলোর একটি হচ্ছে ‘শিক্ষক’! কিন্তু এর বিপরীত দিকটাও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। যাদের হাতে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার সামর্থ্য আছে, তাদের উদাসীনতা কিংবা অদক্ষতায় পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। শিক্ষকদের নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে ‘a good teacher is like a candle– it consumes itself to light the way for others.’ কিন্তু আমাদের এলজেব্রার সূত্র আর ইংরেজি গ্রামারভিত্তিক শিক্ষকদের জন্য বলতে হয়Ñ the lamps that are not lighted by itself, can never light up the other lamps. যে প্রদীপ নিজে প্রজ¦লিত নয়, সে প্রদীপ অন্য প্রদীপে আলো জ্বালাতে পারে না। আমাদের পাঠ্যবইকেন্দ্রিক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষকদের কারণে। শিক্ষার্থী তো বটেই, বেশিরভাগ শিক্ষকেরই জ্ঞানের গণ্ডি পাঠ্যবই অতিক্রম করতে পারেনি। তারা বীজগণিতের সূত্র মুখস্থ করা শিক্ষক। তার বেশি দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। বাংলাদেশের বিজয় দিবস বলতে না পারা শিক্ষার্থী যেমন আছে, তেমনি এমন অসংখ্য শিক্ষক আছেন যারা বলতে পারবেন না সক্রেটিস কী জন্য বিখ্যাত!

সর্বাধিক পঠিত