প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: বিদেশি ক্লিনফিড টেলিভিশন, দর্শক ও বিজ্ঞাপন

প্রভাষ আমিন : সাধারণ মানুষ তো এতোকিছু বুঝবে না। দেশি হোক আর বিদেশি, তারা তাদের পছন্দের চ্যানেল দেখতে চাইবে। এটা ঠিক বাংলাদেশের সব শ্রেণির দর্শকরাই বিদেশি টিভি চ্যানেল দেখেন। শিশুদের কাছে জনপ্রিয়, কার্টুন বা প্রকৃতি বিষয়ক চ্যানেল। গৃহিণীরা ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সিরিয়াল দেখেন নিয়মিত। তাছাড়া বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন দেশের নিউজ চ্যানেলেরও প্রচুর দর্শক আছে বাংলাদেশে। সবচেয়ে বেশি আছে বিভিন্ন স্পোর্টস চ্যানেলের দর্শক। গত ১ অক্টোবর থেকে এসব দর্শক তাদের পছন্দের চ্যানেল দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই বঞ্চনার ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায় করতে চেয়েছিলো ক্যাবল অপারেটররা। একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, সরকারের বাধার কারণেই তারা বিদেশি চ্যানেল দেখাতে পারছিলো না। তবে এখানে আমি সরকারের করার কিছু দেখি না। প্রথম কথা হলো, সরকার কোনো টিভি চ্যানেল বন্ধ করেনি। তারা শুধু ক্লিন ফিড সম্প্রচারের ১৫ বছরের পুরনো আইনটি কার্যকরের চেষ্টা করছে, তাও পর্যাপ্ত সময় দিয়ে। এখন কার্যকরের সময়ে এসে আরও সময় চাওয়া বা ঢালাওভাবে চ্যানেল বন্ধ রেখে সরকারের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করা কোনো কাজের কথা নয়। যতো পক্ষই থাকুক, একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি শুধু কেবল অপারেটরদেরই দেখবো। কারণ আমি টাকার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে সেবা কিনি। যথাযথ সেবা না পেলে আমি কিন্তু যথাযথ টাকা তাকে দেবো না। শুধু বাংলাদেশের ৩৪টা চ্যানেলের জন্য তো আমি মাসে ৫০০ টাকা দেবো না। আমি অত কিছু বুঝি না, আমি আমার পছন্দের সব চ্যানেল দেখতে চাই।
আলোচনা শুনে মনে হতে পারে, ক্লিন ফিড বুঝি নতুন কিছু বা জটিল কিছু। কিন্তু ক্লিন ফিড আসলে এক বৈশ্বিক বাস্তবতা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই বিদেশি চ্যানেলের ক্লিন ফিড সম্প্রচারিত হয়। এমনকি সক্ষমতায় বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা নেপালও ক্লিন ফিড সম্প্রচার করে। বাংলাদেশ বরং অনেক দেরিতে ক্লিন ফিড সম্প্রচারে গেছে। যেকোনো মূল্যে এটা এখন ধরে রাখতে হবে। এটা ঠিক ক্লিন ফিড নিশ্চিত করতে পারলে, বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনেক লাভ হবে। দর্শক বাড়বে, বিজ্ঞাপনও বাড়বে। কিন্তু এটা মাথায় রাখতে হবে, বাধ্য করে দর্শকদের বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো দেখানো যাবে না। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করতে হলে কন্টেন্ট ভালো করতে হবে। উন্মুক্ত আকাশের এই সময়ে মানুষ দেশি না বিদেশি চ্যানেল সেটা বিবেচনা করবে না। তারা ভালো কন্টেন্ট দেখতে চাই। তাই বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোকে এখন মনোযোগ দিতে হবে, উন্নতমানের অনুষ্ঠান বানানোর দিকে। ধরে নিচ্ছি, বিদেশি চ্যানেলের ক্লিন ফিড সম্প্রচার বাধ্যতামূলক হলে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর আয় বাড়বে। অনেকগুলো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে, যাদের কমন পণ্য বাংলাদেশ ও ভারতে বাজারজাত হয়। ভারতের টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিলে তাদের বাংলাদেশের বাজারও কাভার হয়ে যায়। আলাদা করে বিজ্ঞাপন না দিলেও চলে। ক্লিন ফিড নিশ্চিত হলে সেই কোম্পানিকে বাংলাদেশের বাজার ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের টিভিতেও বিজ্ঞাপন দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের টিভিগুলোকে সম্ভাব্য সে বাড়তি আয়ের একটা অংশ বিনিয়োগ করতে হবে ভালো অনুষ্ঠান বানানোর জন্য। বাংলাদেশের মানুষ টিভি দেখে। তারা ভারতীয় নাটক দেখে।
বাংলাদেশে যদি সেই মানের নাটক বানানো হয়, তাহলে অবশ্যই তারা বাংলাদেশের নাটক দেখবে। নিউজ চ্যানেলগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেকগুলো বিটিভি হলে, দর্শক দেখবে কেন? ক্লিন ফিড সম্প্রচার নিশ্চিত হলে অনেকভাবেই বাংলাদেশ লাভবান হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ক্লিন ফিড নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পে ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়বে। আর টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর দাবি, ক্লিন ফিড নিশ্চিত হলে ১২০০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন পাচার বন্ধ হবে। তবে এটা অফিসিয়াল হিসাব। অনানুষ্ঠিকভাবে আরো অনেক অর্থ পাচার হয়। সেটাও বন্ধ করতে হবে। আর ক্লিন ফিড নিশ্চিত হলে শুধু স্যাটেলাইট চ্যানেল নয়, শক্ত ভিত্তি পাবে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন শিল্প, নাটক, গানসহ নানা অনুষ্ঠান। তবে প্রশ্নটা শুধু টাকার নয়, ক্লিন ফিড নিশ্চিত করার সঙ্গে আমাদের আত্মমর্যাদা, সম্মান, দেশপ্রেমেরও গভীর সম্পর্ক আছে। এমনিতে ভারতে বাংলাদেশের কোনো চ্যানেল সম্প্রচারিত হয় না। অনেক চেষ্টায় বিটিভি দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। তারা নিয়ম-কানুনের বেড়াজাল এমনভাবে দিয়ে রেখেছে, যাতে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি চ্যানেলের পক্ষেই সেখানে সম্প্রচারে যাওয়া সম্ভব নয়। বিপরীতে আমাদের আকাশ, আমাদের বাজার এতদিন সবার জন্য ছিলো উন্মুক্ত। ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো দেদারসে চলছিলো এখানে। তাতে শুধু আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোই ঝুঁকিতে পড়েছে তা নয়, ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সর্বগ্রাসী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। তাই সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাংলাদেশে চ্যানেল দেখাতে হলে, বাংলাদেশের আইন মেনেই দেখাতে হবে। লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

সর্বাধিক পঠিত