প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘ওয়েসিস’ এর পথচলা শুরু

সুজন কৈরী: [২] রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার পথ। বুড়িগঙ্গা সেতু পার হলেই শান্ত-স্নিগ্ধ এক মনোরম স্থান। চারদিকে গাছপালায় ঘেরা সবুজ বনানী। ঢাকার দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জে এমনই এক নয়নাভিরাম নির্মল পরিবেশে পথচলা শুরু করলো মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র ‘ওয়েসিস’। মাদকাসক্তদের সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটলো ওয়েসিস-এর।

[৩] স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রধান অতিথি হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েসিস-এর উদ্বোধন করেন।
আইজিপি ও বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ড. বেনজীর আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম।

[৪] অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম রব্বানী, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী ও ডা. মোহিত কামাল এবং ঢাকার জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।

[৫] স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে মাদক তৈরি হয় না। কিন্তু আমরা এর ভয়াবহতার শিকার। মাদক থেকে যদি যুবসমাজকে বিরত না রাখি তাহলে এর পরিণতি কী হবে তা আমরা দেখেছি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সবাই জঙ্গি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে সফল হয়েছি। এখন মাদকের বিরুদ্ধেও আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
যারা মাদকাসক্ত তাদের কী হবে? আমরা তাদেরকে চিকিৎসা দিতে চাই, সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাই উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিবারের কোনও সদস্য মাদকাসক্ত হলে তা গোপন না করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য তিনি পরিবারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

[৬] মাদকের সরবরাহ, চাহিদা এবং এর ক্ষতি হ্রাস করার জন্য আমরা কাজ করছি। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এসময় তিনি বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ওরঢসিস স্থাপনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিত্তবানদের প্রতিও আহ্বান জানান মন্ত্রী।

[৭] স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বর্তমান আইজিপি বাংলাদেশ পুলিশকে একটি মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। পুলিশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন এবং সমাজে নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখছে। করোনা মোকাবেলায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে পুলিশ।

[৮] বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপু মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় এ ধরনের একটি আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করায় পুলিশ প্রধানের গতিশীল নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, মাদকাসক্তদের রোগের নিরাময় করলেই হবে না। এর সঙ্গে সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করা পুলিশের দায়িত্ব নয়। তবুও পুলিশ ওয়েসিস-এর মতো একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করায় আইজিপিকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

[৯] সভাপতির বক্তব্যে আইজিপি ওয়েসিস গড়ার উদ্যোগে শামিল হওয়ার কারণ উল্লেখ করে বলেন, ধনী-গরিব নির্বিশেষে মাদকাসক্ত সদস্যদের নিয়ে পরিবারের দুর্ভোগের ভয়াবহ করুণ চিত্র আমি দেখেছি। সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের গোপনে চোখের পানি ফেলতে দেখেছি। আবার অনেকের মতে বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮০ লাখ। কেউ কেউ বলেন এ সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়েছে। এদের চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সাত হাজারের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। তাহলে কত বছরে আমরা তাদের চিকিৎসা দিতে পারবো। এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা একটি আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

[১০] তিনি আরও বলেন, আমরা ভবিষ্যতে মানিকগঞ্জের কালিগঙ্গা নদীর তীরে বিশাল এলাকায় ৫০০ থেকে এক হাজার বেডের এ ধরনের হাসপাতাল করতে চাই। এক্ষেত্রে আমরা একটা রিজিওনাল হাব করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ‘মডেল’ হতে পেরেছি। এক্ষেত্রেও আমরা ‘মডেল’ হতে পারবো। এক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদানের জন্য তিনি বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

[১১] পুলিশ প্রধান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ ধনী দেশে উন্নীত হবে। যদি আমাদের যুব সমাজ মাদকের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে দেশের নেতৃত্ব দেবে কে? আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর হেলথ ট্যুরিজমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যায়। আমরা যদি বিশেষায়িত হাসপাতাল করে বিদেশ থেকে এক্সপার্টদের নিয়ে আসতে পারি তাহলে আমাদের এই অর্থ দেশেই থাকবে। দেশে এক্সপার্ট তৈরি হবে। পরে আর বিদেশি এক্সপার্টের প্রয়োজন হবে না।

[১২] করোনায় সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে পুলিশ বাহিনীর অনন্য অবদানের কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, করোনাকালে দেশ ও জাতির কল্যাণে ১০৬ জন পুলিশ সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমরা কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালকে সাধারণ হাসপাতাল থেকে কোভিড হাসপাতালে উন্নীত করেছি। কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে শুধু পুলিশ সদস্যদেরই নয়, দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষকে করোনার চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও ওয়েসিস পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হাবিবুর রহমান মাদককে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সামাজিকভাবেই এর সমাধান করা প্রয়োজন।
ওয়েসিস স্থাপনের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদকের ভয়াবহ ছোবলে পড়ে আমাদের তরুণ সমাজের অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তাদেরকে মাদকমুক্ত করে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার মানসে আইজিপি’র সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তত্ত্ববধানে আমরা ওয়েসিস প্রতিষ্ঠা করেছি।

[১৩] মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত সাততলা ভবনের ৬০ শয্যার ওয়েসিস-এ বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক, সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ইয়োগা এক্সপার্ট এবং অভিজ্ঞ অ্যাডিকশন কাউন্সেলরদের মাধ্যমে বিশ্বমানের সমন্বিত চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। এখানে পুরুষ এবং মহিলা রোগীর জন্য পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

[১৪] ওয়েসিসে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক তদারকি, স্বতন্ত্র কাউন্সেলিং সেশন, উন্নতমানের শরীর চর্চা কেন্দ্র, বিনোদন সুবিধা, ইনডোর ও আউটডোর গেমস, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও জীবনধর্মী শিক্ষামূলক নানা আয়োজনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত