প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চীনে বিদ্যুৎ সংকট, বিপাকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা

নিউজ ডেস্ক: বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়েছে চীন। যার প্রভাব উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণে গুয়াংডং এবং উত্তর-পূর্বে হেইলংজিয়াং, জিলিন এবং লিয়াওনিং প্রদেশে আবাসিক এলাকা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে চীনে কাঁচামালের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। এমন অবস্থায় দেশটি থেকে কাঁচামাল আমদানি নিয়ে বিপাকে রয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। যায়যায় দিন

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক শিল্পের ওভেন পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অধিকাংশই আমদানি হয় চীন থেকে। ওভেন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে চীন থেকে বছরজুড়েই কাপড় আমদানি হয়। চীনের বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশের পোশাক কাঁচামাল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্পকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এটি এমন একটি আঘাত, যা করোনা মহামারি থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। রপ্তানিমুখী স্থানীয় পোশাক, টেক্সটাইল, গার্মেন্ট আনুষঙ্গিক, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং পস্নাস্টিক সামগ্রীর কাঁচামালের প্রধান উৎস চীন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন যায়যায়দিনকে বলেন, চীনের বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশ একটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কারণ অনেক কারখানা চীনের ওপর নির্ভরশীল। আমরা নিটওয়্যার আইটেমের জন্য সুতা সরবরাহ করতে পারি কিন্তু ওভেন আইটেমের জন্য কাঁচামাল সরবরাহ করা কঠিন। তিনি বলেন, সময়মতো চীন থেকে তারা কাঁচামাল ডেলিভারি পাচ্ছেন না।

দেশের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৪ শতাংশই তৈরি পোশাক। তবে ওভেন ও নিট পোশাক পণ্যের কাঁচামালের উৎস হিসেবে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতায় ভিন্নতা রয়েছে। নিট পণ্যের প্রয়োজনীয় সুতাসহ অন্যান্য কাঁচামালের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে সরবরাহের সক্ষমতা আছে। কিন্তু ওভেন পণ্যের কাপড়ের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা মোট চাহিদার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। ফলে ওভেন পণ্যের কাঁচামালের অধিকাংশই আমদানি হয়, আর তা হয় মূলত চীন থেকে। এখন চীনে বিদুৎ সংকট তৈরি হওয়ায় চীন থেকে আসা কাঁচামাল নিয়ে সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে ওভেন পোশাক রপ্তানিকারকদের। সুতরাং, যদি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে, প্রধানত শিল্পের কাঁচামাল দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক হাসান যায়যায়দিনকে বলেন, চীনের বিদ্যুৎ সংকট স্থানীয় শিল্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। চীন থেকে অনেক কাজের অর্ডার বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। অর্ডারের স্থানান্তর আমাদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সাপস্নাই চেইনের ব্যাঘাত নিশ্চিতভাবে আমাদের ব্যবসাকে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে আমাদের পোশাক রপ্তানির পুনরুদ্ধারে।

এদিকে, পোশাকের মতো অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরাও দুশ্চিন্তায় আছেন। চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ম্যাফ শুজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসনাত মোহাম্মদ আবু ওবায়দা বলেন, চীনে প্রতি সপ্তাহে কাঁচামালের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। কনটেইনার ভাড়াও বেড়ে গেছে। সেই শংলনায় ক্রেতারা বাড়তি অর্থ দিতে চাইছেন না। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ স্থানীয় পস্নাস্টিক শিল্পের কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়। অন্য শিল্পে তার প্রভাব পড়বে।

কিন্তু কেন চীনের মতো একটি উন্নত দেশে বিদু্যতের এমন সংকট দেখা দিয়েছে। অবশ্য দেশটিতে আগে-পরেও বিদ্যুৎ সমস্যা ছিল। তবে এবারের মতো সংকট নিকট অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চীন। যা দেশটির বেশ কয়েকটি প্রদেশকে বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে মহামারির প্রভাব কমে যাওয়ায় সবকিছু আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় চীনা পণ্যের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন কলকারখানায় কাজের চাপ বাড়ায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হচ্ছে।

এছাড়া ২০৬০ সালের মধ্যে দেশকে কার্বন নিরপেক্ষ করার প্রচেষ্টায় বেইজিং কর্তৃক আরোপিত নিয়ম কয়লা উৎপাদনকে ধীরগতিতে দেখেছে। যদিও দেশটি এখনো তার অর্ধেকেরও বেশি শক্তির জন্য কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বিদু্যতের চাহিদা বাড়ায় কয়লার দামও বাড়ানো হয়েছে।

বিদু্যতের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে চীন সরকার। অন্যদিকে, দেশটির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষতির মুখে কাজ করতে রাজি নয়। যার কারণে উৎপাদন ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে কিছু কিছু এলাকায় হাসপাতাল ও কলকারখানার মতো জরুরি স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কর্তুপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক বাসাবাড়িতেও এখন বিদ্যুৎ নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ হাজার ১৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি ডলারের, যার বড় অংশই চীন থেকে আমদানি হয়েছে।

বিবিসি ও ইকোনমিস্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চীনের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ১৯টি প্রদেশে কয়েক দিন ধরেই বড় ধরনের বিদ্যুৎ-সংকট চলছে। শুরুতে কলকারখানা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে। পরে আবাসিক এলাকাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি উত্তরাঞ্চলের তিয়ানজিনে অবস্থিত চীনের বৃহত্তম বন্দরটিও বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়ে গেছে। ১০টির মতো প্রদেশে কলকারখানায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। তাতে অনেক কারখানা উৎপাদন সীমিত করতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে পোশাক রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত জুনে শেষ হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অবশ্য প্রবৃদ্ধি ভালো হয়নি। তবে আগস্টে আবার ২৭৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ বেশি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত