প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাইড শেয়ারিংয়ে ভোগান্তিও অনেক

নিউজ ডেস্ক: সবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ইতি টেনেছেন স্বর্ণা রায়। চাকরির পরীক্ষা দিতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যেতে তাঁর প্রথম পছন্দ রাইড শেয়ারিং, বিশেষ করে মোটরসাইকেল (বাইক)। স্বর্ণা সম্প্রতি গন্তব্যে যেতে পাঠাও অ্যাপ দিয়ে বাইক অনুসন্ধান করেন। পরে বাইকচালক স্বর্ণাকে প্রধান সড়ক ব্যবহার না করে গলিপথ দিয়ে নিতে চান। ভিন্ন পথে না গিয়ে প্রধান সড়ক ব্যবহার করতে বলায় পাঠাওচালক স্বর্ণার সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান। ফলে মাঝপথেই বাইক থেকে নেমে যান স্বর্ণা। রাইড শেয়ারিংয়ে চালকদের অসৌজন্যমূলক আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বর্ণা বলেন, ‘আমি মতিঝিল যাওয়ার জন্য সাইন্স ল্যাবের সড়ক ব্যবহার করি। অন্য পথে যেতে চাই না। এ জন্য চালক আমাকে অকথ্য ভাষায় কথা বলেছে।’ পাঠাও কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করিনি। কারণ এর আগেও অভিযোগ করে প্রতিকার পাইনি।’ স্বর্ণা আরো বলেন, ‘অনেক চালক বাইক চালাতে গিয়ে পথে ডেয়ারিং হয়ে ওঠে। অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে চালায়। ধীরে চালাতে বললেও শোনে না।’ কালের কণ্ঠ

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তৌফিক। অফিস থেকে রাতে বাসায় ফিরতে তিনি ব্যবহার করেন অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং। গেল রমজানের এক রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে মোহাম্মদপুরে যাওয়ার জন্য উবার অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ডাকেন তিনি। গন্তব্যস্থানে দ্রুত যেতে তৌফিক চালককে ভিন্ন পথ ব্যবহার করতে বললে বাধে বিপত্তি। ওই চালক ভিন্ন পথ ব্যবহার করতে না চাইলে তৌফিকের সঙ্গে হয় বচসা। ওই চালকের আচরণে বেশ বিব্রত হন তৌফিক।

নাজমুল হাসান দিশান চাকরি করেন আইটি কম্পানিতে। গেল ফেব্রুয়ারিতে রাত ১০টার দিকে মহাখালী থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য উবার অ্যাপে গাড়ি অনুসন্ধান করেন। প্রথম চালক গন্তব্যস্থান শুনে গাড়ির চাহিদাটি (রিকোয়েস্ট ) অগ্রসর (ফরোয়ার্ড) করে দেন। পরে বারবার তাঁর রিকোয়েস্ট ফরোয়ার্ড হতে থাকে। এভাবে ৫০ মিনিট পার হওয়ার পর দিশান গাড়ি পান। দিশান বলেন, ‘আমার এক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে।

অভিযোগ করেও লাভ হয়নি। এর আগেও অভিযোগ করে কোনো ফল পাইনি। সময়ক্ষেপণ হওয়ায় রিকোয়েস্টটি আমার বাতিল করতে হয়েছিল, এ জন্য পরবর্তী রাইডে মূল ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ৩০ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে। আমার কেন জরিমানা দিতে হবে। এ সমস্যা অনেক দিন ধরেই চলছে।’

যাত্রীদের এ রকম নানামুখী অনুযোগের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে চলছে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং। চালকদের অসৌজন্যমূলক আচরণের ব্যাপারে কাস্টমারকেয়ারে অভিযোগ করলে কোনো প্রতিকারই মেলে না। নেই কোনো কেয়ারিং, চালকরা ডেয়ারিং—এই মন্ত্রেই যেন চলছে ঢাকার রাজপথে রাইড শেয়ারিং। তবে উবার ও পাঠাও রাইড শেয়ারিং কম্পানি দুটি দাবি করেছে, যাত্রীদের সব অভিযোগ তারা নিষ্পত্তি করে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, রাইড শেয়ারিং কম্পানিগুলো অভিযোগ নিষ্পত্তি যথাযথভাবে করে না। কারণ সড়কে যাত্রীরা একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বারবার। অন্যদিকে রাইড শেয়ারিং কম্পানিগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও সড়কের কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যথাযথ নজরদারির অভাব রয়েছে। এই সুযোগে রাইড শেয়ারিংগুলোর চালকরা হয়ে উঠছেন বেপরোয়া।

বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ১৩টি রাইড শেয়ারিং কম্পানির বৈধ রেজিস্ট্রেশন আছে। উবার বাংলাদেশ লিমিটেড, পাঠাও লিমিটেড, ওভাই সলিউশনস লিমিটেড, সহজ লিমিটেড, ডিজিটাল রাইড লিমিটেড এবং যাত্রী সার্ভিস লিমিটেড নামের এই ছয়টি কম্পানির কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এসব কম্পানির অনিয়মের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা সরাসরি বিআরটিএতে এসে অভিযোগ করতে পারেন। গেল অর্থবছরে বিআরটিএর কাছে এসেছে মাত্র চারটি অভিযোগ, এর মধ্যে সবই নিষ্পত্তি হয়েছে।

দুর্ঘটনা, ভাড়ায় অনিয়ম, চালকের আচরণ, গাড়ির ত্রুটিসংক্রান্ত, জিপিএস সমস্যা, বেপরোয়া গাড়ি চালনাসহ নানা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি রাইড শেয়ারিং কম্পানি প্রতিবছর প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনের অনুলিপি বিআরটিএর কাছেও জমা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে উবার লিমিটেডের মিডিয়া পার্টনার বেঞ্চমার্ক পিআর। গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে কথা বলতে বেঞ্চমার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নগুলো লিখিত আকারে ই-মেইলে চায়। পরবর্তী সময়ে বেঞ্চমার্ক পিআরকে ই-মেইলে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন পাঠায়। তবে বেঞ্চমার্ক পিআর সেই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর দেয়নি। পরবর্তী সময়ে বেঞ্চমার্কের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, উবার কর্তৃপক্ষ প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর এখনো দেয়নি।

গ্রাহক অভিযোগের ব্যাপারে পাঠাও লিমিটেডের মার্কেটিং ও পাবলিক রিলেশন বিভাগের পরিচালক সায়েদা নাবিলা মাহবুবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাঠাও ব্যবহার করতে গিয়ে সেবাগ্রহীতারা কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হলে তাত্ক্ষণিকভাবে সে বিষয়টির সুরাহা করা হয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে, পাঠাও ফুড ডেলিভারির ক্ষেত্রে ৯৬ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে, যা এই খাতে সর্বোচ্চ। এ ছাড়াও দেখা গেছে, রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও গ্রাহকসেবা সন্তুষ্টির জন্য শীর্ষে রয়েছে পাঠাও।’

বিআরটিএ পরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, ‘গ্রাহক রাইট শেয়ারিং কম্পানিতে অভিযোগ করে প্রতিকার না পেলে বিআরটিএতেও অভিযোগ জানাতে পারেন। আমরা কম্পানি ও চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। গাড়ির নম্বর স্ক্রিনশট নিয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করতে হবে। বিআরটিএর ওয়েবসাইটে এই অভিযোগ করতে হবে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক  বলেন, ‘বিআরটিএ সড়কের কর্তৃপক্ষ। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ সার্ভিসগুলো নিয়ম-নীতির মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে না। রাইড শেয়ারিং সার্ভিসগুলো অ্যাপের মাধ্যমে বাণিজ্য করছে। বিআরটিএর প্রযুক্তির মাধ্যমে এটিকে তদারকি করতে হবে। অথচ বিআরটিএর এ ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ নেই।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত