প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: আপনি-তুমি-তুই

ড. সেলিম জাহান: তিরস্কৃত হয়েছি বহুবার, ভর্ৎসনাও জুটেছে কপালে। তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেছেন আমার অতি আপনজন, আমার প্রিয়জনেরা এই যেমন আমার কন্যারা। বিষয়টি তেমন কিছু নয় এই ‘আপনি’ ‘তুমির’ সম্বন্ধ নিয়ে। ক’বছর আগে ঢাকায় আমার কন্যাগৃহে তার পঞ্চদশ বর্ষীয় গৃহসাহায্যকারিণী মেয়েটিকে ‘আপনি’ বলায় তো আমার কন্যা যারপর নাই রেগে গিয়েছিলো। ‘হয়েছে কী তোমার? তার বয়স মাত্র পনেরো।’ বুঝেছিলাম তার তিরস্কারের কারণ। বাংলা ভাষায় ‘আপনি’, ‘তুমি’ ও ‘তুইয়ের’ একটা ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগ আছে। তার একটা দিক বয়োঃসম্পৃক্ত। বয়সে যারা জেষ্ঠ্য, তাদের ‘আপনি’ বলতে হবে, ‘তুমি’ বলা যায়, তাদের যারা সমসাময়িক, বন্থুস্থানীয়, বয়োঃকনিষ্ঠ, আর যারা বয়সে খুব ছোট, তাদের ‘তুই’ বলা যেতে পারে। কিন্তু এ সম্বোধন-বিন্যাসের আরেকটি প্রেক্ষিত আছে। সেটি অবশ্য সম্পৃক্ত শ্রেণি বিভাজনের সঙ্গে। তাই দরিদ্র ও নিস্থানীয় শ্রমজীবী মানুষদের অবলীলাক্রমে আমরা ‘তুই’ বা ‘তুমি’ বলি যদিও বয়সে তারা আমাদের চেয়ে অনেক বড় হন।

সে জন্য বৃদ্ধ রিকশাচালককেও তরুণ যাত্রী ‘তুমি’ বলে, আবার গৃহস্বামীর কিশোরী কন্যা বয়স্ক গৃহপরিচারিকা কর্তৃক ‘আপনি’ বলে সম্বোধিত হয়। অন্যদিকে, ক্ষমতাবান আর বিত্তবানদের ‘তুমি’ বলতে আমাদের বাধে, কারণ তারা সমাজ কাঠামোয় উচ্চ শ্রেণির। তাই তরুণ ক্ষমতাধর বিত্তবান তরুণকেও বর্ষীয়ান ব্যক্তিরা ‘ আপনি’ বলেই সম্বোধন করেন। আমার ‘আপনি’ ‘তুমি’, ‘তুই’ সম্বোধনের তিনটি প্রেক্ষিত আছে। প্রথমত: আমি সম্বোধনের বিভাজন-বিন্যাস নির্ণয় করি সম্পর্কের নৈকট্য ও গভীরতা দিয়ে। তাই সাধারণত আমি ‘আপনি’ দিয়ে শুরু করি ছোট/ বড় সবাইকে। তারপর জানাশোনা ও নৈকট্য গভীর হলে আমার সম্বোধন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমিতে ‘ নেমে আসে। আর আমার মুখে ‘তুই’ ডাকটি মুষ্টিমেয় ক’জন অতি প্রিয়জনের জন্য। দ্বিতীয়ত: আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে ‘আপনি’ বলবো না ‘তুমি’ বলবো সেটা তার অনুমোদন সাপেক্ষ। সুতরাং আমি সেই সর্বোচ্চ ‘আপনি’ দিয়েই শুরু করি। তারপর যদি সে সম্বোধিত ব্যক্তিটি আমাকে বলেন, ‘আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকলেই আমি খুশি হবো’, শুধু তখনই আমি তাকে ‘তুমি’ ডাকি। আমার মনে হয় এ অনুমতি ব্যতিরেকে কাউকে সরাসরি ‘তুমি’ বলাটা ঠিক নয়। তৃতীয়ত: কোনো নি¤œস্থানীয় শ্রমজীবী মানুষকে আমি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটুকু সম্মান তাদের প্রাপ্য সেখানে আমি আপোসহীন। বহু শ্রদ্ধাভাজন মানুষকে আমি জানি, যারা সবাইকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। প্রয়াত অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল সবাইকে ‘আপনি’ বলতেন।

শিশুদেরও তিনি ‘আপনি’ বলতেন। বি.এম. কলেজে আমার প্রাণিবিজ্ঞানের শিক্ষক প্রয়াত আসহাবউদ্দীন আহমেদ সবাইকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। বেনুর মাতামহ তার সন্তানদের ‘আপনি’ বলতেন। প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাকে সারাজীবন ‘আপনি’ বলেছেন। তার যুক্তি ছিলো, কন্যার শিক্ষককে তিনি ‘তুমি’ বলতে পারবেন না। বেনুর শত অনুযোগেও তিনি টলেননি। ইদানীং সময়ে আমার এই ‘আপনি-তুমির’ সমস্যা অন্য একটি মাত্রিকতা পেয়েছে। এতোদিন এ ব্যাপারে শুধু অতি প্রিয়জন দ্বারা তিরস্কৃত ও ভর্ৎসিত হয়েছি। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুযোগ আমার একসময়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ শুভ্যানুধায়ীদের দ্বারা। প্রাক্তন শিক্ষককে অনেকেই স্মরণ করিয়ে দেন, ‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। আমাকে তুমিই বলবেন’। কোনো কোনো তরুণ শুভানুধ্যায়ী লেখেন, ‘তুমি বললেই প্রীত হই, আপনি আমাদের নমস্য’। কেউ কেউ আবার অনেকটা অবাক এবং বিরক্তি মেশানো স্বরে বলেন, ‘আপনি আমাকে ‘আপনি’, ‘আপনি’ করছেন কেন?’ এ দু’গোষ্ঠীর সবাইকে প্রতিশ্রতি দিই যে, তাদের আমি এবার থেকে ‘তুমিই’ বলবো। কিন্তু তারপর আর মনে থাকে না কাকে কাকে এমন প্রতিশ্রতি দিয়েছিলাম। যে আমার ভুলো মন আর যা আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তি! সুতরাং আবার শুরু হয়ে যায় আমার ‘আপনি-তুমির’ ভজঘট! এবং সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে অনুযোগ। আমার ইংরেজ বন্ধু পল রবিন্স্ প্রায়ই অনুযোগ করে যে, তার জীবনে সমস্যার শেষ নেই। দেখা হলেই সে তার জীবনের নানা সমস্যার কথা বলে বলেই চলে, বলা চলে। বোধহয় আমার মতো এতো অখ মনোযোগী শ্রোতা সে আর জীবনে পায়নি। পলের গল্প শুনতে শুনতে আমার একধরনের ঈর্ষাও হয় মনে হয় বেঁচে গেছে সে। পড়তো ‘আপনি-তুমি-তুইয়ের’ জটাজুটে, বুঝতো তাহলে ‘কতো ধানে, কতো চাল’! লেখক : অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত