প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাদকাসক্ত নিরাময়-পুনর্বাসনে এবার এগিয়ে এলো পুলিশ

নিউজ ডেস্ক: ইয়াবা-ফেনসিডিল, হেরোইন, এলএসডি ও আইসসহ অধিকাংশ মাদকেরই উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশ না হলেও দেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশাল এক জনগোষ্ঠী মাদকের ভয়াল থাবায় পুড়ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা বিভিন্ন মাদক ক্রমেই তরুণ প্রজন্মকে গ্রাস করছে। অধিকাংশ অপরাধের ‘আঁতুড়ঘর’ এই মাদকের ব্যাপকতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা খুবই নগণ্য। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ মিলে মোট মাদকাসক্তের এক শতাংশেরও কম ব্যক্তিকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতিতে মাদকাসক্ত নিরাময়ে এবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনী এগিয়ে এসেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে এবার পরিচালিত হবে ‘ওয়েসিস’ নামে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি আগামী ৭ অক্টোবর উদ্বোধন করা হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জের পর মানিকগঞ্জেও আলাদা আরও একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে বলে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমসংখ্যক পুনর্বাসন কেন্দ্র, সাধারণ হাসপাতালে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা, অভিজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সের অভাব এবং সচেতনতার অভাবে মাদকাসক্তরা চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সবশেষ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এ সংখ্যাই উলেস্নখ করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের এক জরিপ প্রতিবেদনে দেশে মাদকসক্তের সংখ্যা ৬৬ লাখ বলা হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৬ লাখ। তারা ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, কোকেন, গাঁজা, বিভিন্ন ধরনের মদ, প্যাথেড্রিন, বুপ্রেনরফিন, মরফিন, এলএসডি, আইস ও রিকোডেক্সসহ ত্রিশটির বেশি মাদকে আসক্ত। এদের মধ্যে গত ১০ বছরে মাত্র ৬০ হাজার ২৩২ জনকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

জানা যায়, সরকারিভাবে চারটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থাকলেও এদের অধিকাংশই ভুয়া। অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থাও অনুন্নত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসাই চলছে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের কল্যাণ ট্রাস্ট যে উদ্যোগ নিয়েছে তা মাদকাসক্ত নিরাময়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

এ বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এবং ওয়েসিসের তত্ত্বাবধায়ক হাবিবুর রহমান বলেন, স্রেফ জনকল্যাণের টার্গেট নিয়েই পুলিশের পক্ষ থেকে ওই প্রতিষ্ঠানটি চালানো হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। আগামী ৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিদু্যৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আইজিপি ডক্টর বেনজীর আহমেদ।

হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কেরানীগঞ্জের পর মানিকগঞ্জে আরও একটি অত্যাধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সেখানে ইতোমধ্যে ১০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। আরও জমি কেনা হবে। ওই কেন্দ্রটিতে সুইমিং পুল এবং গার্ডেনসহ নানা ধরনের অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।’ সম্পূর্ণ অলাভজনক এই সেবা সফলতার মুখ দেখবে বলে আশা করছি।’

জানা গেছে, ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে জনবলের সংখ্যা ৮৫ জন। এর মধ্যে একজন পরিচালক (এসপি পদমর্যাদার), তিনজন সহকারী পরিচালক, চারজন কো-অর্ডিনেটর এবং ২৭ জন নার্সিং অফিসার বা মেট্রন থাকবে। এ ছাড়া হিসাব শাখায় ২ জন, নিরাপত্তা ও রিসিপশন শাখায় ১১ জন, কন্ট্রোল রুমে ছয়জন এবং প্রশাসন শাখায় জনবল আছে আরও ১৪ জন। পুলিশের অত্যাধুনিক এই মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটির অন্যতম চমক গ্যাস ক্রমোটোগ্রাফি মেডিকেল ইকুইপমেন্ট। এই মেশিনের মাধ্যমে রক্ত ও প্রস্রাব ছাড়াও চুল থেকেও ডোপ টেস্ট করা যাবে। তিন মাস আগেও কেউ মাদক সেবন করে থাকলে তা ধরা পড়বে। দেশে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক এই মেশিনটি স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে দ্রম্নততম সময়ে শতভাগ নির্ভুল রিপোর্ট পাওয়া যাবে।

ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক ডা. এসএম শহীদুল ইসলাম বলেন, সাততলা বিশিষ্ট আধুনিক এই মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রটি খোলা থাকবে ২৪ ঘণ্টা। ৬০ শয্যার এই কেন্দ্রে আছে ২২টি রুম। পুরুষদের জন্য ১৬টি রুমে থাকছে ৪৬টি শয্যা। মহিলাদের ছয়টি রুমে শয্যা আছে ১৪টি। ডাবল কেবিন ২৮টি, ট্রিপল কেবিন ১৫টি এবং জেনারেল ওয়ার্ডে আছে ১১টি বেড। এ ছাড়া জেনারেল ট্রিপল বেড আছে ছয়টি। জেনারেল ওয়ার্ড ছাড়া সব ওয়ার্ড বা কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।

জানা গেছে, সরকারি হিসাবে দেশে ৩৬ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায়ই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। যেখানে কেউ চাইলেও আত্মহত্যা করার সুযোগ পাবেন না। প্রতিটি রুমেই বিশেষ ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ২০ কেজি ওজনের বেশি কিছু ঝুললেই নিজ থেকেই ভেঙে পড়বে ফ্যানটি। বাথরুমে গিয়ে যাতে আত্মহত্যা করতে না পারে সেজন্য কোনো বাথরুমেই লক সিস্টেম রাখা হয়নি। বাথরুমগুলোর দরজায় লাগানো হয়েছে ম্যাগনেট। বাথরুমের শাওয়ারে রডের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে বিশেষ পস্নাস্টিক। তাই শাওয়ারেও আত্মহত্যার সুযোগ নেই। প্রতি ফ্লোরের সিঁড়িতে আছে বিশেষ লকের ব্যবস্থা। তাই কোনো রোগী ইচ্ছে করলেই এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে অবাধে চলাচল করতে পারবেন না। ওয়েসিস মাদক নিরাময় কেন্দ্রের জানালায় রয়েছে স্বচ্ছ কাচ। জানালার গ্রিল হিসেবে দেওয়া হয়েছে শক্ত নেট। জানালার পর্দাগুলোও জোরে টান দিলে নিচে পড়ে যাবে। এ কারণে পর্দা ব্যবহার করে আত্মহত্যার কোনো সুযোগ নেই। ভবনের ছাদে রয়েছে গার্ডেন। ছাদবাগানে প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলা আকাশের নিচে রোগীদের বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইয়োগা এবং মেডিটেশন করার সুযোগ রয়েছে। ৬ষ্ঠ তলায় নার্সিং স্টেশন ও পঞ্চমতলায় রয়েছে বিশেষ কেবিন ও ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা। চতুর্থতলায় রয়েছে ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা। তৃতীয়তলায় আছে কেবিন বস্নক, ডাইনিং ও বিশেষ নার্সিং স্টেশন। ভবনের দ্বিতীয়তলায় প্রশাসনিক বস্নকের পাশাপাশি থাকছে প্যাথলজি বিভাগও।

ওয়েসিস মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক পুলিশ সুপার ডা. এস এম শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকাসক্ত মানুষের কথা মাথায় রেখেই আমরা এই নিরাময়কেন্দ্র চালু করছি। প্রচলিত নিরাময় কেন্দ্রের বাইরে গিয়ে পাঁচতারকা হোটেলের আদলে এই নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এর আগে অন্তত ৩০টি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে তাদের ত্রম্নটিগুলো দেখে নতুন করে এই প্রতিষ্ঠান সাজানো হয়েছে। অন্য মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের থেকে এখানে তুলনামূলক অনেক কম খরচে রোগীরা সেবা পাবেন। সূত্র: যায়যায়দিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ