প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনিলাদের অন্যরকম লড়াই, বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী দিবস আজ

নিউজ ডেস্ক: ‘যেখানে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে, সেখানে কীভাবে একটি গণমাধ্যম এমন নাটক প্রচার করে যেখানে দেখানো হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাবা-মায়ের পাপের ফল! আমার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি নিজেই ঠিক করেছি যারা এটা করেছে তাদের বোঝাব তারা ভুল করেছে। তাদের দুঃখিত হতে হবে। তাই আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করি। আমার সঙ্গে চাইল্ড ফাউন্ডেশনও মামলা করে। তাদের বোঝাতে চাই, যাদের ঘরে কোনো প্রতিবন্ধী শিশু নেই, তাহলে কি তারা নিষ্পাপ?’ ইত্তেফাক

এভাবেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের মামলা করার কথা জানালেন আফিয়া কবির আনিলা। আনিলা সেরিব্রাল পালসি (সিপি) প্রতিবন্ধী। পড়াশুনা করছেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ২য় বর্ষে। এ পর্যন্ত আসতে প্রতিদিন আনিলাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে প্রতিকূলতার সঙ্গে। আনিলা জানান, তার জন্য তার বাবা-মা অনেক করেছেন। কিন্তু দেশে এখনো এমন অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছে তাদের অবস্থা অনেক খারাপ। তারা কথা পর্যন্ত বলতে পারে না। তাদের অধিকার আদায় তো দূরের কথা। এমন বাস্তবতার মধ্যে আজ ৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী দিবস-২০২১।’

এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিবন্ধিতা কি তা নিয়েই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। আনিলা বলেন, বেশির ভাগ মানুষই আমাদের অটিস্টিক বলেন। তখন খুব খারাপ লাগে। আনিলা জানান, ছেলেবেলা থেকেই তাকে একটি বিশেষ চেয়ারে বসতে হয়। একদমই চলতে পারে না সে। তারপরও তার পরিবারের জন্য স্বাভাবিক স্কুলে পড়াশুনা করে ‘এ’ লেভেল, ‘ও’ লেভেল শেষ করে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই সেরিব্রাল পালসি রোগ নিয়ে কাজ করছেন আনিলা, সরকারি প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে বিদেশ সফরও করেছেন। কিন্তু প্রতিটি পর্যায়ে তাকে অনেক রকমের বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। আজও অনেক টিচার ক্লাসে বলেন, ‘এই ও কি বলে, তোমরা একটু শোন তো? ওর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারি না।’

দেশে সেরিব্রাল পালসি আক্রান্তের সংখ্যা অনেক। সরকারের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজএবিলিটি প্রটেকশন ট্রাস্ট (এনডিডি ট্রাস্ট) কাজ করছে সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আদায়ে। এনডিডি ট্রাস্ট চার ধরনের মস্তিষ্কজনিত প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করে। সরকারের হিসাব মতে, দেশে মস্তিষ্কজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩ লাখ ৩৮ হাজার। তার মধ্যে ৪২ শতাংশ অর্থাত্ ৯০ হাজার ৪৪৩ জন সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

কি এই সেরিব্রাল পালসি? এ সম্পর্কে আনিলার মা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মারুফা হোসেন বলেন, সিপি এমন একটি ব্যাধি যা দেহের অংশবিশেষ বা পেশি বা ক্রিয়াকলাপকে প্রভাবিত করে। সাধারণত জন্মের আগে মস্তিষ্কের আঘাতের কারণে এই ব্যাধি হয়। সেরিব্রাল অর্থ মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়া এবং পালসি অর্থ পেশির দুর্বলতা এবং ব্যবহারে সমস্যা। সাধারণত সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পেশি দুর্বলতা, অঙ্গ শিথিল হওয়া লক্ষ্য করা যায়। এদের কথা বলতেও সমস্যা হয়। এদের শারীরিক ও স্পিচ থেরাপি দিতে হয়।

যশোরের ঝিকরগাছা বাজার এলাকায় স্টেশনারি দোকান করেন মোহাম্মদ উল্লাহ সাদ। উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। পড়াশোনায় ভালো হয়েও সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হওয়ায় তার কথা বলতে অসুবিধা হয়। তাই বারবার তাকে শিক্ষকদের অপমান সহ্য করতে হয়েছে। আর তাই মাঝেমধ্যেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হয় তার। দোকান করার পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন সাদ। তিনি জানান, আমার পড়ার খুব ইচ্ছা, আমার সঙ্গে সুস্থ যমজ ভাই পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করছে। সবাই বলে আমি ওর চেয়ে মেধাবী, কিন্তু আমারই পড়া শেষ হচ্ছে না। পড়াশোনা শেষ করাটা আমার লড়াই।

আনিলা আরো বলেন, আমাদের সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য অনেক কাজ করছে কিন্তু সবাই তা বুঝতে পারে না, বুঝতে চায়ও না। আমাদের কষ্টটারও মূল্যায়ন হয় না। এই যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মনের মতো বন্ধু পাই না। সবাই আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেও না। কিন্তু আমার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে সব কিছুর শেয়ার করতে ইচ্ছা করে। নিজের স্বপ্ন নিয়ে আনিলা বলেন, বাবা-মা চাইবে আমি যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য করা তাদের প্রতিষ্ঠান দেখি। কিন্তু আমি চাই, সেরিব্রাল পালসি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আদায়ে কাজ করব।

সিপি ব্যক্তিরা কিছুটা পেছনেই আছে বলে মন্তব্য করলেন এনডিডি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. আনোয়ার উল্লাহ। তিনি বলেন, সেরিব্রাল পালসি দিবসটাও আমরা সেভাবে পালন করি না। কিন্তু করা উচিত। মানুষকে এই বিষয় সচেতন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ১৫ জন বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি করে কেন্দ্র করছি। তারা যেন এই শিশুদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারে। তাদের খাওয়া থেকে শুরু করে, পড়াশোনা, থেরাপি—সবকিছুর ব্যবস্থা থাকবে কেন্দ্রে। তিনি আরো বলেন, অনেক অভিভাবক আমাদের বলেন, আমাদের ভাতার দরকার নেই। আমরা যখন থাকব না তখন যেন ওরা নিজেরা চলতে পারে এমন ব্যবস্থা করে দেন। তাই আমরা তাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত