প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অঞ্জন রায়: বাবাকে স্পর্শ করার উজ্জ্বল আনন্দ

অঞ্জন রায়: আমি আধাস্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন হিসেবে বড় হয়ে উঠেছি। স্কুল জীবনের বেশি সময়েই নিজের চোখে বাপীকে দেখতে পাইনি, তিনি সেই সময়ে রাজনৈতিক কারণে কারাগারে আটক ছিলেন। মা চাকরি করতেন পাবনার একটি নামকরা স্কুলে, তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। সত্তর দশকের মধ্যভাগ বঙ্গবন্ধু হত্যাকার পরে বাবা জেলখানায়, মা চাকরিহীন। মা ছুটে বেড়াচ্ছেন বাপীর খোঁজেকারণ তিনি কোন কারাগারে তা আমরা জানতাম না। আমি পড়ি জেলা স্কুলে-দিদিভাই গার্লস স্কুলে। সামনে দুর্গাপূজা, বাকি আর মাত্র চারদিন। পাশের বাড়ির সবাই নতুন জামা-জুতা নিয়ে ব্যস্তআর আমাদের তখনো একটুকরো সুতা জোটেনি। মা আমাদের অভয় দিচ্ছেন তোদের ঠিকই নতুন কাপড় দেবো। আমরা মুখ শুকিয়ে ঘুরছি।

ঠিক সেই সময়েই মা নিচের নিমাইদার কাছে থেকে কয়েকটা টাকা ধার নিলেন আমরা নিউমার্কেটে গেলাম। দিদিভাইয়ের ফ্রকের কাপড়, আমার শার্টের কাপড় কেনা শেষ। আমরা দু’জনে মায়ের হাত ধরে ঝুলে আছি তোমাকে শাড়ি কিনতে হবে। মা রাজি নন, আমাদের চোখের জল দেখে মা শেষে ঢুকলেন লাকী কর্নারে। ১৫০ টাকার সুতি শাড়ি, বেগুনি জমিনে সাদা ছোপ। আমরা নাম দিলাম বিস্কুট শাড়ি। কারণ প্রিন্টটা বিস্কুটের মতো।

সুভাস দাদার টেইলার্সে কাপড় সেলাই হচ্ছেআমরা দু’ভাইবোন আনন্দে উড়ছি। পূজার একদিন বাকি চলে এসেছে নতুন কাপড়। সকালে ঘুম ভাঙলো ভট ভট ভট ভট যন্ত্রের শব্দে অবাক হয়ে দুই ভাইবোন নিচে নামলামÑ বাড়ির পেছনের পুকুর থেকে শব্দ আসছে। দু’জনে দৌড়ে গেলাম, দেখলাম ক্রয়সূত্রে পুকুরের ২৫ ভাগের মালিক লোকটি পুকুরের জল সেচতে পাম্প লাগিয়ে জাল টানাচ্ছেন পুকুরে। আমি ছুটে গিয়ে আগের অভ্যাস মতো একটা কাতলা মাছ হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে ছুট দিলাম। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই একটা সাঁড়াশির মতো হাত আমার ঘাড় চেপে ধরলো, শুনলাম অকথ্য গালি… বাচ্চা, মাছ দে। মাছটা ফেরত দিয়ে দু’চোখে জল নিয়ে মায়ের কাছে গেলাম। আমাদের পুকুরের মাছ নয়, সেদিন দুপুরে খেলাম সুতা দিয়ে দু’টুকরো করা ডিমের অর্ধেক।

পূজা শেষ হলোবাইরে প্রথম শীত। মা নিচের দরজা আটকে পাখির ছানার মতো আমাদের দু’জনকে দু’পাশে নিয়ে সদ্য শুয়েছেন। এই সময়েই বাইরের দরজার কড়া নড়ে উঠলো বুড়ু বাবু। গম্ভীর কণ্ঠের ডাক। না তাহলে লোকটা বেঁচে আছে, এটি আমার মায়ের প্রথম কথা। তিনজন ছুটে গেলাম নিচে। দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের বাবা কমরেড প্রসাদ রায়, কয়েক বছরের জেলবাসের ক্লান্তি স্পর্শ করেনি চশমার কাচের নিচের তার উজ্জ্বল চোখকে। মাঝরাতে আবারও ভাতের হাঁড়িতে টগবগ শব্দ। নিজের বাবাকে স্পর্শ করার উজ্জ্বল আনন্দ। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত