প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চিররঞ্জন সরকার: করুণাসাগর ‘বিদ্যাসাগর’

চিররঞ্জন সরকার: বিদ্যাসাগর আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। রামমোহন রায় ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা রদ করে যে সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র তার পরিসমাপ্তির দায়ভার নিজের কাঁধেই নিয়েছিলেন। তিনি আমাদের দেশে মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্বে পৌঁছে দেওয়ার কর্মযজ্ঞের প্রধান হোতা। লোকহিত ও মানবসেবাই ছিলো তাঁর জীবনের ধর্ম। সমাজ ও মানুষের কল্যাণের জন্য বিদ্যাসাগরের চেয়ে বেশি পরিশ্রম অন্য কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তিনি বিধবাবিয়ে চালু করেছেন। বহুবিবাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। বাল্যবিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। নারীশিক্ষা প্রসারে ভ‚মিকা পালন করেছেন। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে নিরলস ভ‚মিকা পালন করেছেন। শিক্ষাকে তিনি জাত-ধর্মের সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছেন। নারীশিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলা ছিলো তাঁর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি নারীশিক্ষার পক্ষে, বাল্যবিবাহ, ও বহুবিবাহ বন্ধে এবং বিধবাবিবাহ চালুর পক্ষে কলম ধরেছেন। মেয়েদের জন্য স্কুল বানিয়েছেন। সেখানে পড়ানোর জন্য নিজেই বই লিখেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুসংস্কাচ্ছন্ন অভিভাবকদের বুঝিয়ে ছাত্রী যোগাড় করেছেন। স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে মেয়েদের নিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছেন। বাল্যবিয়ে বন্ধ করতেও তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। বাংলা ব্যাকরণের নিয়ে বই লিখেছেন। সাহিত্য চর্চা করেছেন। দরবার, বৈঠক, সাহিত্যসভা ইত্যাদি নিয়েও মাথা ঘামিয়েছেন। তিনি বাঙালি অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়েছেন। প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। তিনি শিক্ষা ও নারীর স্বার্থে ব্রিটিশদের সঙ্গে দেনদরবার করেছেন। প্রয়োজনে উঁচু গলায় কথা বলেছেন। তিনি আইনসংস্কারের পক্ষে লিখেছেন। সংস্কারকৃত আইন কেমন হওয়া উচিত, তারও দিশা দিয়েছেন।

ঈশ্বরচন্দ্রের লক্ষ্যই ছিলো দেশের মানুষের সার্বিক প্রগতি। স্বেচ্ছায় পারিবারিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশ আত্মীয়পরিজনহীন নিঃসঙ্গতার মধ্যেও আজীবন জনসেবা চালিয়ে গেছেন। মানসিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও তিনি থেমে যাননি। শুধু বিদ্যাই নয়, তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। করুণাসাগর। জীবনভর মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বাড়িতেই অন্তত একশ বিধবাবিবাহের আয়োজন হয়। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি গরিব মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেন। রেলি ব্রাদার্সের তৈরি একটা থান কাপড়কে ফেঁড়ে একখÐ পরতেন আর একখÐ গায়ে দিতেন। পায়ে থাকত দেশি চর্মকারের বানানো শুঁড়তোলা চটি। তাঁর সামনের চুল ছিল অবাঙালিসুলভ ছাঁটা। ভীষণ উদার, মহৎ, স্বাধীনচেতা এই মানুষটি ছিলেন অসম্ভব জেদি। নিজের একমাত্র ছেলেকে তিনি ত্যাজ্য করেছিলেন। ছেলেকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে এবং তাঁর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে একটি বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য তিনি বাবা-মা এমনকি স্ত্রীকেও পরিত্যাগ করেছিলেন! আজ ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন!বিদ্যাসাগরের মতো এমন মহৎ ও কর্মী-মানুষ পৃথিবীতে খুব কম জন্মেছেন। তাঁর কাছে আমাদের অনেক ঋণ! অথচ আমরা আজ তাঁর জন্মদিনটিও মনে রাখি না! তথ্যসূত্র : বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ, বিনয় ঘোষ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, গোলাম মুরশিদ। করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, ইন্দ্রমিত্র। বিদ্যাসাগর, চচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত