প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চালের রেকর্ড মজুদেও কমছে না দাম

নিউজ ডিস্ক: সরকারিভাবে চালের মজুদ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সর্বোচ্চ। তবে প্রায় ১৫ লাখ টন সরকারি চালের মজুদ খাদ্যশস্যটির দাম কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখছে সামান্যই। প্রায় দুই মাস আগে সাধারণ মোটা চাল ও চিকন চালের যা দাম ছিল, এখনো তা প্রায় সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে। যদিও সরকারের কাছ থেকে চালের শুল্ক সুবিধা কমানোসহ সংগ্রহকালীন সুবিধা নিয়েছেন মিলার ও ব্যবসায়ীরা। বণিক বার্তা

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন, গম ১ লাখ ৩৬ হাজার টন ও ধান ৩৮ হাজার টন। এদিকে চলতি অর্থবছরে শুল্ক সুবিধার মাধ্যমে চাল আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে চাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধার আওতায় বেসরকারিভাবে প্রায় আট লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরও একই সুবিধায় ৪১৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৬ লাখ ৯৩ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সেদ্ধ নন-বাসমতী চাল ১৪ লাখ ৮৩ হাজার টন ও আতপ চাল ২ লাখ ১০ হাজার টন।

চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি বছরের ১২ আগস্ট চাল আমদানির শুল্ক কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চালের আমদানি শুল্ক ৬২ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করে এনবিআর। এ সুবিধা ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকবে। যদিও চাল আমদানিতে উচ্চশুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল দেশীয় কৃষকদের সুবিধার জন্য। তবে গত বছর চালের উচ্চমূল্যের কারণে ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্ব্বর বেসরকারিভাবে চালের আমদানি শুল্ক কমাতে প্রধানমন্ত্রী অনুমতি দিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্কহার ৬২ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, শুল্ক সুবিধার পরও চালের দাম কমেনি। গত আগস্টে সাধারণ মোটা চাল ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। একই চালের দাম ১ অক্টোবর ছিল ৪৫-৪৮ টাকা। আগস্ট থেকে অক্টোবরের বেশির ভাগ সময় এ চালের দাম ৪৫-৫০ টাকার মধ্যেই ওঠানামা করেছে। অন্যদিকে চিকন চালের দাম কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে সেটিও খুব বেশি কমেনি। আগস্টে ৬০-৬৮ টাকায় বিক্রি হওয়া চিকন চাল বর্তমানে ৫৬-৬৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সরকারের শুল্ক সুবিধার পরও চালের দাম খুব বেশি না কমার পেছনে মিলার ও ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র প্রভাব কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, চালের দাম মূলত গত বছরের অক্টোবরেই বাড়তে শুরু করে। সরকারের মজুদ বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং সরবরাহ বাড়াতে শুল্ক কমানোসহ নানা উদ্যোগ নিয়েও বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের বড় ৫০টি অটো রাইস মিলের হাতেই থাকে বেশির ভাগ ধান-চালের মজুদ। প্রচলিত আইনের মধ্যেই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে তারা। ফলে মজুদ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যমান আইনের আওতায় অটো রাইস মিলগুলোর চলার মতো ধান দেশে আছে কিনা সেটি ভাবতে হবে। ফলে কয়টা অটো রাইস মিলকে অনুমোদন দেয়া যায় ও সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু হবে, সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তবে মিলাররা জানাচ্ছেন, বেশি দামে ধান কেনার পর মাড়াই, বহন, ব্যাংক সুদ, মজুরির খরচ যুক্ত করে দাম নির্ধারণের মাধ্যমে ন্যূনতম মুনাফা করছেন মিলাররা। প্রতিটা মিলের পরিচালন সক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মজুদ রাখার বিষয়টি সরকারি আইন দ্বারা স্বীকৃত। সরকারের সেই আইন মেনেই দেশের প্রতিটি চালকল পরিচালনা হচ্ছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ মুনাফা করলে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারা দেশের কৌশলগত স্থানে সাইলো, সিএসডি ও দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় কমপক্ষে একটি এলএসডি, গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় দুই বা ততোধিক এলএসডির মাধ্যমে খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক ও পরিচালন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সরকারের মজুদাগারের কার্যকরী ধারণক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ ৪০ হাজার টন। এক সময় চালের মজুদ পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে এলে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়। এতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৭০ টন চাল আমদানি হয়েছে। সরকারিভাবে চাল আমদানি ছিল ৫ লাখ ৭২ হাজার ৮৯০ টন ও বেসরকারিভাবে আমদানি ছিল ৭ লাখ ৮৬ হাজার ২৮০ টন। চলতি বছর সরকারি মজুদ বৃদ্ধির ধারা চলমান রাখতে চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, চালের দাম সহনীয় করতে সরকার বিভিন্নভাবে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা কমানো ও সরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত চালের রেকর্ড মজুদ রয়েছে। সামনে আরো কয়েক লাখ টন চাল ও গম দ্রুত দেশে চলে আসবে। ফলে সরকারি মজুদের কোনো দুর্বলতা এ মুহূর্তে নেই। তবে সরকারিভাবে চালের মজুদ জানা গেলেও বেসরকারিভাবে মজুদের তথ্য জানা যায় না।

চালের মজুদ ও দামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে খাদ্য মন্ত্রণালয় আরো কঠোর হচ্ছে উল্লেখ করে ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ফুড গ্রেইন লাইসেন্স ছাড়া চালের ব্যবসা করতে পারবেন না। তাদের ১৫ দিন পরপর ব্যবসায়িক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। মজুদ পরিস্থিতি ও কী দামে কিনছে এবং কী দামে বিক্রি করছে, সেটি উল্লেখ থাকতে হবে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে। পদ্ধতিটি এখন ম্যানুয়ালি চলমান রয়েছে। খুব দ্রুত ডিজিটাল হলে বাজার তদারকিতে আরো দক্ষতা আসবে। এছাড়া সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষম এমন ১০০টি অটো রাইস মিলের মিলগেটের দাম পর্যবেক্ষণের জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এদিকে মিলাররা যৌক্তিক আচরণ করছেন কিনা, তা যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর। তিনি বলেন, দেশের কোথাও চালের ন্যূনতম সরবরাহ সংকট নেই। সরকারের মজুদ পরিস্থিতি এখন বেশ ভালো। তবে দেশে পর্যাপ্ত চালের সরবরাহ থাকলেও দামের পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক না হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কারা একচ্ছত্র আধিপত্য রাখছে, কী করণীয় সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মিলারদের মজুদ পরিস্থিতি যেমন জানতে হবে, তেমনি কতটুকু মুনাফা করছেন সেটিও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তারা সঠিক দামে মিলগেটে চাল বিক্রি করছেন কিনা, তা যাচাই করতে হবে। কারণ মিলাররা তাদের মুনাফা দেখানোর সময় এক ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেন। অনেক সময় উপজাত দ্রব্য ভালো দামে বিক্রি করলেও সেটির হিসাব দেখান না তারা।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত