প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোরশেদ শফিউল হাসান: বিষয়: লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক

মোরশেদ শফিউল হাসান: প্রকাশক যদি একজন লেখকের কোনো একটি বই প্রকাশ করে [১] আর্থিক, [২] প্রতিষ্ঠানের সম্মান বা মর্যাদা বৃদ্ধি, কিংবা [৩] ব্যক্তিগত/সামাজিক সম্পর্ক বা প্রভাব-প্রতিপত্তিএই তিনটির কোনো এক বা একাধিক দিক দিয়ে লাভবান হবেন বলে মনে করেন, তবেই কেবল সে বই প্রকাশ করবেন (আমি এখানে তৃতীয় কারণটির কথা বললাম কেবল আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে, অন্য দেশের বেলায় হয়তো ততোটা প্রযোজ্য নয়)। প্রকাশক যদি দেখেন বইটি প্রকাশ করে উল্লিখিত কোনো অর্থেই তার লাভবান হবার সম্ভাবনা নেই, তবে তার উচিত হবে সে পাণ্ডলিপিকে নির্দ্বিধায় ‘না’ বলা। অবশ্যই যথোচিত বিনয় ও ভদ্রতার সঙ্গেই তিনি এ বিষয়ে তার অপারগতা বা ‘অক্ষমতা’ প্রকাশ করবেন। কিন্তু এই তিনটির কোনো একটি দিক বিবেচনায়ও যদি তিনি পাণ্ডলিপিটি প্রকাশের জন্য গ্রহণ করেন, তারপর বইটি প্রকাশ করেন, সাধারণভাবে বই বিক্রির দায়িত্ব কিন্তু এরপর প্রকাশকের ওপরই বর্তায়। তা তিনি নিজে কিংবা পরিবেশক বা অন্য বই বিক্রেতা যার মাধ্যমেই সে বিক্রির কাজটি করুন। আর লেখক বা তার পক্ষে কোনো সংস্থা বা অন্য কেউ যদি এক্ষেত্রে বইয়ের সবটা বা নির্দিষ্ট সংখ্যক কপি কিনে নিতে স্বীকৃত হন, তবে বই প্রকাশ সংক্রান্ত চুক্তিপত্রে তা সুস্পষ্টভাবে লিখিত থাকা উচিত। যেকোনো অবস্থায় বই প্রকাশের কাজ শুরু করার আগেই প্রকাশক লেখকের সঙ্গে চুক্তিটা করে নেবেন। বলা বাহুল্য, সাদা কাগজে চুক্তি নয়, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রীতিসম্মত ব্যবসায়িক চুক্তি, যা আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

সব দেশেই প্রকাশনা ক্ষেত্রে কমবেশি এমন নিয়ম প্রচলিত আছে যে, লেখক বা তার পক্ষে তার নিয়োজিত এজেন্ট, কোনো সংস্থা বা আর কেউ বইয়ের সম্পাদনা কিংবা তার প্রকাশনা বাবদ (পুরো বা আংশিক) ব্যয় বহন করেন, কিংবা বই প্রকাশের পর তার বৃহদংশ বা নির্দিষ্ট সংখ্যক কপি কিনে নেন। কিংবা এই মর্মে স্বীকৃত হন যে বইয়ের প্রথম এক বা একাধিক সংস্করণের জন্য লেখক কোনো রয়েলটি নেবেন না। তবে লেখক-প্রকাশকের পূর্ব সমঝোতার ভিত্তিতেই তা হয়ে থাকে। আর সেটিও চুক্তিপত্রে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে। এ ব্যাপারে দ্বিধা-সংকোচ বা লুকোছাপার কোনো ব্যাপার থাকা উচিত নয়।

একজন লেখকের প্রতিটি বইয়ের জন্য প্রকাশক লেখকের সঙ্গে আলাদা আলাদা চুক্তি করবেন এবং বছর শেষে (সেটা ইংরেজি অর্থ বছর বা বাংলা বর্ষ যে নিয়মেই হোক না কেন) প্রতিটি বইয়ের আলাদা আলাদা বিক্রির হিসাব দেখিয়ে একটি লিখিত বিবরণী দেবেন এবং সে অনুযায়ী রয়েলটি পরিশোধ করবেন। ধরা যাক, একজন প্রকাশক একজন লেখকের মোট পাঁচটি বই প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে দুটি বই ওই বছরে কিছু কপি হলেও বিক্রি হয়েছে, বাকি তিনটি বইয়ের এক কপিও বিক্রি হয়নি। সেক্ষেত্রে কী করা হবে? প্রকাশক কী বিক্রি হওয়া ওই দুটি বইকেও বাকি তিনটি বইয়ের সারিতে ঠেলে দিয়ে ‘আপনার বা অমুক লেখকের বই একেবারেই বিক্রি হয় না’ ক্রমাগত এই আবৃত্তির রেকর্ড বাজাতে থাকবেন? নাকি লেখককে তার বই বিক্রির লিখিত হিসাব বিবরণী যথাসময়ে সরবরাহ করে প্রকাশক তার বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করবেন? তিনি যদি তা না করেন তবে তা থেকে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি বা প্রচার-অপপ্রচারের দায়-দায়িত্ব কার ওপর বর্তাবে? প্রকাশকের নাকি লেখকের? প্রকাশক কোনো লেখকের পাঁচটি বা সাতটি বই ছেপেছেন, তার মধ্যে কয়েকটি বই বিক্রি হয়, কয়েকটি হয় না। যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রেই তো এই ঝুঁকিটা আছে, নিতে হয়। আর বই তো খাদ্য, কাঁচামাল বা যাকে বলে পচনশীল পণ্যও নয় যে গত মেলায় বা এ বছর বিক্রি হয়নি বলে আর কখনো বিক্রি হবে না। আর তেমন পচনশীল কিছু যদি হয়, তবে কী ভেবে, কোন লোভে পড়ে বা কোন চাপের মুখে প্রকাশক তার আড়তে বা গুদামে তেমন জিনিস তুলেছিলেন? বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত তো তিনিই নিয়েছিলেন, নাকি? ভালো বা উপযুক্ত মানের পাণ্ডলিপি বিবেচনায় যদি তিনি বা তার প্রকাশনা সংস্থা সেটি প্রকাশের জন্য নির্বাচন করে থাকে এবং নিজেদের বিবেচনাবুদ্ধির ওপর যদি তাদের সামান্যও আস্থা থাকে, বই বিক্রি না হওয়ার দায় তারা লেখকের ওপর চাপাতে পারেন কী? বই প্রকাশের পর (অন্য যে কোনো পণ্যের মতোই) তার যে একটা প্রমোশনাল দিক আছে – বিজ্ঞাপন, পুস্তক-আলোচনা বা অন্যভাবে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পাঠককে যে জানাতে-বোঝাতে হবে, কেন তাদের বইটি পড়া দরকার, অন্তত বইয়ের খবরটি তাদের পৌঁছাতে হবে, সে সম্পর্কে আমাদের ক’জন প্রকাশক সচেতন ও সক্রিয়? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লেখক বা অন্যদের সঙ্গে আলোচনা, তাদের পরামর্শ বা সহযোগিতা কামনা তারা কখনো করেন কী? নাকি মনে করেন বই প্রকাশের পরই প্রকাশকের দায়িত্ব শেষ? এরপর দায়িত্ব একমাত্র পাঠকের। তারাই দরকার মনে করলে বই খুঁজে নেবে।

লেখকের একটি বা একাধিক বই বিক্রি করতে না পারা কিংবা অন্য যেকোনো কারণে প্রকাশক যদি কোনো এক বছর বা দু’বছর লেখককে রয়েলটি পরিশোধ করতে না পারেন, এমনকি ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক অসামর্থ্য, অসুবিধা/বিপর্যয়ের জন্য হিসাব বিবরণী দিতেও ব্যর্থ হন, তবে সে অপারগতার কথা জানিয়ে লেখকের কাছে লিখিত বা মৌখিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু এই হিসাব না দেওয়া বা রয়েলটি পরিশোধে অনাগ্রহের বিষয়টিকে যদি প্রকাশকের তরফে নিয়মিত আচরণে পরিণত করা হয়, তখনই লেখক-প্রকাশক সম্পর্কের অবনতির কারণ ঘটে।

এদেশে লেখকদের পেশাগত স্বার্থের পক্ষে কথা বলতে ও কাজ করতে পারে, দলমতের ঊর্ধ্বে এমন কোনো প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন কখনো গড়ে ওঠেনি। অবশ্য নেই যে, আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় তাকে একদিক থেকে ভালো বলেও মনে হয়। কারণ, থাকলে সে সংগঠন যে শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থে বা কি উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পক্ষান্তরে নানা নামে প্রকাশকদের একাধিক সংগঠন এখানে ক্রিয়াশীল। তাদের নিজেদের মধ্যে যতো দ্ব›দ্ব-বিরোধই থাকুক, একটি বিষয়ে তারা একাট্টা। সেটা হলো প্রকাশনার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটতে না দেওয়া। প্রকাশক সংগঠনের নেতৃত্বের বড় অংশই দেশে জ্ঞানবিদ্যার চর্চা এবং সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে যতোটা না ভাবিত, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ ও শ্রম তাদের ব্যয়িত হয় ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী মহলের (যখন যারা চেয়ারে থাকেন)পায়রবির মাধ্যমে ও তাদের বইপত্র ছেপে ও সাপ্লাই দিয়ে দ্রæত অর্থবিত্ত সঞ্চয়ের দিকে। সত্যি কথা বলতে, আমাদের প্রকাশকদের বড় অংশের কাছেই প্রকাশনা আর দশটা ব্যবসার মতোই একটা ব্যবসা মাত্র। তাদের কাছে মৌলভীবাজার ও বাংলাবাজারে যেন কোনো পার্থক্য নেই। মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের তবু তাদের দৈনন্দিন আচরণে সংশ্লিষ্টদের প্রতি যে নিয়মরীতি মানতে বা আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হয়, বাংলাবাজার-অবাংলাবাজার নির্বিশেষে এদেশের বেশিরভাগ প্রকাশক সেটুকুরও ধার ধারেন বলে মনে হয় না। প্রকাশকদের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশ যারা হয়তো এদেশের প্রকাশনা শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ, সৃজনশীলতা ও পেশাদারিত্বের চর্চা নিয়ে অল্পাধিক ভাবেন, তারাও মনে হয় প্রকাশক সমিতির ভোটের রাজনীতির দিকে তাকিয়ে নীরব থাকাকেই যথার্থ বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন। কারণ সমিতির এই ভোটারদের এক বড় অংশ হলো প্রকাশক পাড়ার চালু পরিভাষা অনুযায়ী, ‘মোরগা’যারা বইমেলার আগে এবং হয়তো বছরের অন্য সময়ও অর্থবিত্তশালী লেখক বা লেখক-যশোপ্রার্থীদের কাছ থেকে নগদ অর্থপ্রাপ্তির বিনিময়ে ‘ফেল তক্তা মারো পেরেক’ পদ্ধতিতে অল্প থেকে অধিক লাভ রেখে কেবল বই ছেপে দেন। টাকার সঙ্গে আজকাল লেখকের কাছ থেকে শুধু একটা পেনড্রাইভ পেলেই তাদের কাজ চলে যায়। একটা পালিপি কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় বই হয়ে ওঠে, সেটা জানার যেমন তাদের প্রয়োজন হয় না, তেমনি বইয়ের সম্ভাব্য পাঠক কারা, কিংবা পাঠকরা সেসব বইকে কীভাবে নেন, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এভাবে বই-বাণিজ্যে বলা যায় তাদের সবটাই লাভ, লোকসান বা ঝুঁকি বলে আসলে কিছু নেই। সেই সঙ্গে মন্ত্রী-আমলা ও সমাজের প্রভাবশালী দু’চারজনের বই প্রকাশের সুযোগ যদি কোনোভাবে জোটানো যায়, তারপর তদবির-তোষামুদির দ্বারা কোনোভাবে যদি তার দু’একখানাও সরকারি সাপ্লাইয়ে ঢোকানো যায়, তবে তো যাকে বলে পোয়া বারো অবস্থা! ভোটের রাজনীতিতে বনেদি প্রকাশকদের সঙ্গে এই মওসুমি ও/বা মোরগা প্রকাশদেরও কিন্তু একটা ‘মূল্যবান’ ভোট! সুতরাং বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে সুবাতাসের সম্ভাবনা দূরপরাহত বলেই অন্তত আমার মনে হয়। এখানেও পরিবেশ-পরিস্থিতিটা আজ অনেকটা দেশের আর পাঁচটা খাতের মতোই ‘ছড়িয়ে দে মা, লুটেপুটে খাই’ ধরনের। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত