প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আপনি-তুমি-তুই

সেলিম জাহান, ফেসবুক থেকে, তিরস্কৃত হয়েছি বহুবার, ভর্ৎসনাও জুটেছে কপালে। তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করেছেন আমার অতি আপনজন, আমার প্রিয়জনেরা – এই যেমন আমার কন্যারা। বিষয়টি তেমন কিছু নয় – এই ‘আপনি’ ‘তুমির’ সম্বন্ধ নিয়ে। ক’বছর আগে ঢাকায় আমার কন্যাগৃহে তার পঞ্চদশ- বর্ষীয় গৃহসাহায্যকারিনী মেয়েটিকে ‘আপনি’ বলায় তো আমার কন্যা যারপর নাই রেগে গিয়েছিল। ‘হয়েছে কি তোমার? ওর বয়স মাত্র পনেরো।’

বুঝেছিলাম তার তিরস্কারের কারন। বাংলা ভাষায় ‘আপনি’, ‘তুমি’ ও ‘তুইয়ের’ একটা ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগ আছে। তার একটা দিক বয়ো:সম্পৃক্ত। বয়সে যারা জৈষ্ঠ্য, তাঁদেরকে ‘আপনি’ বলতে হবে, ‘তুমি’ বলা যায়, তাঁদেরকে যাঁরা সমসাময়িক, বন্ধুস্হানীয়, বয়োকণিষ্ঠ, আর যারা বয়সে খুব ছোট, তাদেরকে ‘তুই’ বলা যেতে পারে।

কিন্তু এ সম্বোধন-বিন্যাসের আরেকটি প্রেক্ষিত আছে। সেটি অবশ্য সম্পৃক্ত শ্রেনী বিভাজনের সঙ্গে। তাই দরিদ্র ও নিম্নস্হানীয় শ্রমজীবি মানুষদের অবলীলাক্রমে আমরা ‘তুই’ বা ‘তুমি’ বলি – যদিও বয়সে তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক বড় হন। সে জন্য বৃদ্ধ রিক্সাচালককেও তরুন যাত্রী ‘তুমি’ বলে, আবার গৃহস্বামীর কিশোরী কন্যা বয়স্ক গৃহপরিচারিকা কতৃক ‘আপনি’ বলে সম্বোধিত হয়। অন্যদিকে, ক্ষমতাবান আর বিত্তবানদের ‘তুমি’ বলতে আমাদের বাধে, কারন তাঁরা সমাজ কাঠামোয় উচ্চশ্রেণীর। তাই তরুন ক্ষমতাধর বিত্তবান তরুনকেও বর্ষীয়ান ব্যক্তিরা ‘ আপনি’ বলেই সম্বোধন করেন।

আমার ‘আপনি’ ‘তুমি’, ‘তুই’ সম্বোধনের তিনটে প্রেক্ষিত আছে। প্রথমত: আমি সম্বোধনের বিভাজন-বিন্যাস নির্ণয় করি সম্পর্কের নৈকট্য ও গভীরতা দিয়ে। তাই সাধারনত: আমি ‘আপনি’ দিয়ে শুরু করি ছোট/ বড় সবাই কে। তারপর জানাশোনা ও নৈকট্য গভীর হলে আমার সম্বোধন ‘আপনি’ থেকে ‘তুমিতে ‘ নেমে আসে। আর আমার মুখে ‘তুই’ ডাকটি মুষ্টিমেয় ক’জন অতি প্রিয়জনের জন্যে।

দ্বিতীয়ত: আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি যে একজন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষকে ‘আপনি’ বলব না ‘তুমি’ বলব – সেটা তাঁর অনুমোদন সাপেক্ষ। সুতরাং আমি সেই সর্বোচ্চ ‘আপনি’ দিয়েই শুরু করি। তারপর যদি সে সম্বোধিত ব্যক্তিটি আমাকে বলেন, ‘ আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে ডাকলেই আমি খুশী হবো’, শুধু তখনই আমি তাঁকে ‘তুমি’ ডাকি। আমার মনে হয় এ অনুমতি ব্যতিরেকে কাউকে সরাসরি ‘তুমি’ বলাটা ঠিক নয়।

তৃতীয়ত: কোন নিম্নস্হানীয় শ্রমজীবি মানুষকে আমি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটুকু সম্মান তাঁদের প্রাপ্য – সেখানে আমি আপোষহীন।

বহু শ্রদ্ধাভাজন মানুষকে আমি জানি, যাঁরা সবাইকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। প্রয়াত অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল সবাইকে ‘আপনি’ বলতেন। শিশুদেরও তিনি ‘আপনি’ বলতেন। বি.এম. কলেজে আমার প্রানীবিজ্ঞানের শিক্ষক প্রয়াত আসহাবউদ্দীন আহমেদ সবাইকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। বেনুর মাতামহ তাঁর সন্তানদের ‘আপনি’ বলতেন। প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাকে সরাজীবন ‘আপনি’ বলেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল, কন্যার শিক্ষককে তিনি ‘তুমি’ বলতে পারবেন না।বেনুর শত অনুযোগেও তিনি টলেন নি।

ইদানীং সময়ে আমার এই ‘আপনি-তুমির’ সমস্যা অন্য একটি মাত্রিকতা পেয়েছে। এতেদিন এ ব্যাপারে শুধু অতি প্রিয়জন দ্বারা তিরস্কৃত ও ভর্ৎসিত হয়েছি। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনুযোগ – আমার এক সময়ের শিক্ষার্থী ও তরুন শুভ্যানুধায়ীদের দ্বারা। প্রাক্তন শিক্ষককে অনেকেই স্মরন করিয়ে দেন, ‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। আমাকে তুমিই বলবেন’।

কোন কোন তরুন শুভানুধ্যায়ী লেখেন, ‘তুমি বললেই প্রীত হই, আপনি আমাদের নমস্য’। কেউ কেউ আবার অনেকটা অবাক এবং বিরক্তি মেশানো স্বরে বলেন, “আপনি আমাকে ‘আপনি’, ‘আপনি’ করছেন কেন?’

এ দু’গোষ্ঠীর সবাইকে প্রতিশ্রুতি দেই যে, তাঁদের আমি এবার থেকে ‘তুমিই’ বলব। কিন্তু তারপর আর মনে থাকে না কাকে কাকে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। যে আমার ভুলো মন আর যা আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তি! সুতরাং আবার শুরু হয়ে যায় আমার ‘আপনি-তুমির’ ভজঘট! এবং সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে অনুযোগ।

আমার ইংরেজ বন্ধু পল রবিন্স্ প্রায়ই অনুযোগ করে যে, তাঁর জীবনে সমস্যার শেষ নেই। দেখা হলেই সে তাঁর জীবনের নানান সমস্যার কথা বলে – বলেই চলে, বলা চলে। বোধহয় আমার মতো এতো অখন্ড মনোযোগী শ্রোতা সে আর জীবনে পায় নি। পলের গল্প শুনতে শুনতে আমার এক ধরনের ঈর্ষাও হয় – মনে হয় বেঁচে গেছে সে। পড়ত ‘আপনি-তুমি-তুইয়ের’ জটাজুটে, বুঝতো তা’হলে ‘কত ধানে, কত চাল’!

সর্বাধিক পঠিত