প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দারিদ্র্য হ্রাসের গতি থামিয়ে দিয়েছে করোনা

নিউজ ডেস্ক: দেশে ২০১৬ সালের হিসাবে যে দারিদ্র্যের হার ছিল বর্তমানে ওই অবস্থায় আটকে আছে। করোনার প্রকোপ শুরুর পর প্রথম ধাক্কায় সাধারণ মানুষের আয় যে পরিমাণ কমেছিল তার ৮০ ভাগ পুনরুদ্ধার হয়েছে। এসময়ে নতুন করে দারিদ্র্য হার বেড়ে গেলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের অবস্থায় ফিরেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন এ তথ্য জানান। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘এক্সট্রিম পোভার্টি :দ্য চ্যালেঞ্জ অব ইনক্লুশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) গতকাল বৃহস্পতিবার এনইসি মিলনায়তনে এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিনায়ক সেন বলেন, কোভিডের দ্বিতীয় ধাক্কায় অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হয়েছে সে হিসাব এখনো আসেনি। তবে প্রথম ধাক্কায় মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বহু মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন হিসাব প্রকাশ করলেও মানুষের আয় আবার বেড়েছে। তবে এখন দারিদ্র্যের যে হার (২৫ শতাংশ) পাওয়া গেছে তা ২০১৬ সালের খানা আয় ব্যয় জরিপে পাওয়া হিসাবের সমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। আরো বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য নাসিমা বেগমসহ আরো অনেকে। ইত্তেফাক

বক্তারা বলেন, শুধু আয় দিয়ে হিসাব করে দরিদ্রের সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে না। দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য এসেছে কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে বৈষম্য তুলনামূলক বেশি। প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন বিআইডিএস-এর জেষ্ঠ্য গবেষক জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্য রেখার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে যদি ১০ শতাংশ মানুষের আয় কমে যায় সেক্ষেত্রে দেশের ৩০ ভাগ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়বে। কোভিডের আগের হিসাবে দেশে ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য রেখার নিচে অবস্থান করছিল। গবেষণায় মাল্টি-ডাইমেনশনাল পোভার্টি ইনডেক্স বা বহুমাত্রিক দারিদ্র্য অবস্থার একটি বিশ্লেষণ দেওয়া হয়। আয় দারিদ্র্যের হিসাবের চেয়ে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য হার কোথাও বেশি লক্ষ্য করা গেছে। মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টিসহ সামাজিক বিভিন্ন সূচকের মানদণ্ডে এই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হিসাব করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শীর্ষে রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা। এই জেলার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। এর পর রয়েছে হবিগঞ্জ (৪৩.২৪%), শেরপুর (৪১.৯৪%), নেত্রকোনা (৪০.৭২%), বান্দরবান (৩৮.৮৬%), ভোলা (৩৬.৬৫%) ও কিশোরগঞ্জ (৩৬.৩৮%) উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় বলা হয়েছে ২৫ দশমিক ৮৭ ভাগ বহুমাত্রিক দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ধর্মভিত্তিক বিভাজনে মুসলামন ২৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ, হিন্দু ২০ দশমিক ৮৯, খ্রিস্টান ৩০ শতাংশ এবং বৌদ্ধ ধর্মের ২৭ শতাংশ। তবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্য দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। যেমন সাঁওতাল ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, চাকমা ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ, মণিপুরি ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, মারমা ৩০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ম্র্রো সম্প্রদায়ের ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৩১ ভাগই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার।

আয়ের ভিত্তিতে উপজেলা ভিত্তিক সবচেয়ে বেশি দরিদ্র বান্দরবানের নাইঙ্খ্যংছড়িতে ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর আলীকদমে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ, চিলমারিতে ৬০ শতাংশ।

গবেষণায় কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের ৬০ ভাগ মানুষ ভূমিহীন। জাতীয় পর্যায়ে এই হার মাত্র ৮ শতাংশ। কুড়িগ্রামে ৫৭ ভাগ মানুষ অসুস্থতায় ভোগে। তাছাড়া এই অঞ্চলে নারী প্রধান পরিবার ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ যা জাতীয় পর্যায়ে সাড়ে ১২ শতাংশ। এই অঞ্চলে মাত্র ৫১ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত্ সুবিধার আওতায় এসেছে। ৮২ শতাংশ মানুষ পরিবারিক দারিদ্র্য ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উচ্চ অগ্রাধিকার হলো দারিদ্র্য বিমোচন। একজন লোকও যদি না খেয়ে থাকে সেটি স্বস্তির বিষয় হতে পারে না। তিনি বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলে বহু জলাশয় রয়েছে যেগুলো ইজারা দেওয়া হয়। এসব ইজারা দিয়ে আমরা খুব বেশি আয় করি না। এগুলো দরিদ্র্য মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে তারা আয় করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. শামসুল আলম বলেন, গবেষণায় উঠে এসেছে নদীভাঙন প্রবণ এলাকায় দারিদ্র্য হার বেশি। প্রতি বছর ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ শুধু নদীভাঙনের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এই সব অঞ্চলে পকেট দরিদ্রদের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামকে প্রাধান্য দিচ্ছি। গ্রাম-শহরের ব্যবধান কমাতে পারলে বৈষম্য কমে আসবে। ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শহুরে দারিদ্র্য কমানো যাচ্ছে না। এজন্য শিশু পুষ্টিসহ শিক্ষার বিস্তারে সামাজিক সুযোগগুলো পৌঁছে দিতে হবে। ড. বিনায়ক সেন বলেন, এত অবকাঠামোর উন্নতির পরেও দেখা যাচ্ছে কুড়িগ্রামে ৭৫ ভাগ মানুষ দরিদ্র। দেশে উন্নতি হলেও কিছু অঞ্চলে অতি উচ্চ হারে দরিদ্র রয়ে গেছে।

 

সর্বাধিক পঠিত