প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কন্যাশিশুদের পিছিয়ে দিচ্ছে বাল্যবিয়ে

নিউজ ডেস্ক: দারিদ্র্য, নিরাপত্তা, পারিবারিক সমস্যা, বয়স বাড়লে যৌতুকের অঙ্ক বেড়ে যাওয়া এবং সামাজিক চাপের মতো বিষয়গুলোর কারণে কন্যাশিশুদের বাল্যবিয়ের লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগেও নেই কঠোরতা। বাল্যবিয়ের কারণেই মেয়েদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি, ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া কন্যাশিশুদের বাসাবাড়ির কাজে দিলেও অহরহ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার পাচ্ছে না তারা। কন্যাশিশুদের পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। কালের কণ্ঠ

এ প্রসঙ্গে আরএইচ স্টেপের নির্বাহী পরিচালক কাজী সুরাইয়া সুলতানা বলেন, ‘বাল্যবিয়ে ও কিশোরীদের অধিকার লঙ্ঘন এখন সমাজের বড় সমস্যা। ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে ভেদাভেদ বাদ দিতে হবে। মেয়ে শিশুর বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে এবং তা মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে। অভিভাবক, স্থানীয় নেতা ও প্রশাসকদের যুক্ত করে বাল্যবিয়ে বন্ধে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।’ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কন্যাশিশুদের শিক্ষার আলোয় বিকশিত হওয়ার সুযোগ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সমতাবিধান নিশ্চিত হবে। দারিদ্র্য বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বন্ধ হবে। এ ছাড়া ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের বেড়ে ওঠাটা যেন আনন্দময়, শঙ্কামুক্ত ও সহিংসতামুক্ত হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে।

কন্যাশিশু ও ছেলে শিশুর মধ্যে বৈষম্য বহুকালের। দেশ ও সমাজ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এ বৈষম্য এখনো আছে। অভিভাবকদের চোখে ছেলেরা এখনো বুড়ো বয়সের ‘অবলম্বন’, আর মেয়েদের অনেকে বিবেচনা করে পরিবারের ‘বোঝা’ হিসেবে। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের কারণে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ পরিবারে ছেলে শিশুটিকে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও কন্যাশিশুটির ক্ষেত্রে হয় না। অল্প বয়সে (বাল্য) বিয়ে দেওয়া হয়। অনেক কন্যাশিশু শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। করোনার মধ্যে কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য আরো বেড়েছে।

কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে বিশেষজ্ঞরা মানুষের ধ্যানধারণায় পরিবর্তনে জোর দিয়েছেন। কন্যাশিশুদের বাল্যবিয়ে বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন তাঁরা। মেয়েদের সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোয় পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

শিশু অধিকার নিয়ে পিএসটিসির এক জরিপে দেখা যায়, করোনার কারণে নতুন করে যারা আর্থিক সংকটে পড়েছে, তারা কন্যাশিশুদের পড়ালেখা থেকে সরিয়ে নিয়েছে। পরে টাকার বিনিময়ে বাল্যবিয়ে দিয়েছে—এমন শ্রমজীবী পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ। যেসব নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত, তাঁদের পক্ষে নিজের পরিবারের বা আশপাশের বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সহজ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ১৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক থেকে ৪৬ শতাংশ কন্যাশিশু পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়েছে। পিছিয়ে থাকা কন্যাশিশুদের করোনাকালীন পরিস্থিতি আরো পিছিয়ে দিয়েছে। মেধার দিক দিয়ে অনেক কাজে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। অভিভাবক ও তাঁদের মেয়েদের বাল্যবিয়ে ও অসচেতনতার কারণে শুধু মাধ্যমিক পর্যায়ের ৪০ শতাংশের বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের আর্লি চাইল্ডহুড স্পেশালিস্টের (এডুকেশন সেকশন) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়নি এমন ৩০ শতাংশ কন্যাশিশু ও ৪৫ শতাংশ নারী করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের দেশে নতুনভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই হিসাবের অর্ধেক কন্যাশিশুকে বাল্যদিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পড়ালেখা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অনেক পরিবার কন্যাশিশুদের বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে কাজ দিয়েছে। এখানেও শারীরিক ও মানসিক নির্যিতনের শিকার হয় কন্যাশিশুরা। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য বলছে, মেয়ে গৃহকর্মীদের বেশির ভাগেরই বয়স আট থেকে ১৪ বছর। গেল এক বছরে গৃহকর্মী নির্যাতনের হার বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, মেয়ে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় বেশির ভাগ মামলার সাক্ষী হাজির হয় না। ফলে মামলাগুলো ঝুলে যায়। এ ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ উদ্যোগী হয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টাকার বিনিময়ে ফয়সালা করে ফেলে। ফলে গৃহকর্মী কন্যারা ন্যায্য বিচারও পায় না।

তিনি আরো বলেন, সাধারণ, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় কন্যাশিশুদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বাল্যবিয়ের কারণে কন্যাশিশুরা পিছিয়ে আছে। এসব ক্ষেত্রে নারীর অবস্থানের উন্নয়ন হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গেল এক দশকে শ্রমবাজারে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়েনি। দেশের ৮০ শতাংশ ছেলে যোগ্য হয়ে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করলেও এ ক্ষেত্রে কন্যারা যোগ্য হয়ে অংশগ্রহণের হার ৩৬ শতাংশ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত