প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনোয়ার শাহাদাত: জীবন হলো আসলে এক বাসি পান্তা ভাত, বাসি ইলিশ, গরম ডিম ভাজা ও পোড়া মরিচ!

আনোয়ার শাহাদাত: পান্তা ভাত দিয়ে ডিনার করলাম। বছরে আমার দু’চারবার পান্তা খাওয়া লাগে, ডিম ভাজা ও তেলে ভাজা মরিচের সঙ্গে। যদিও পোড়া মরিচের বদলে তেলে ভাজা মরিচ। আদিতে যে পান্তা-ভাত স্বাদের কারণে এই নিয়মিত পান্তা খেতে চাওয়া তাতে যে মরিচের স্বাদ পেতে আশা করা হয় তা হলো তাওয়ার ছাইয়ে পোড়ানো মরিচ। সেই তাওয়ার ছাইয়ে পোড়ানো মরিচ যেহেতু সম্ভব নয়, ফলে মরিচের এই ব্যবস্থা হচ্ছে বিকল্প। অথবা পান্তা ভাত, যা অন্তত এক রাতের পুরনো, অর্থাৎ তা অবশ্যই যথার্থ বাসি হতে হয় [ফারমেন্টেড]।

এ বছর সময় অভাবে আমার পান্তা খাওয়া হয়নি। বউ ইলিশ করলো আর আমার মনে হলো যে আমি এ গ্রীষ্মে ‘পান্তা’ খাইনি। যখন বললাম, বউ তখনই ভাতে পানি দিয়ে দিলো এবং সিদ্ধান্ত হলো আজ ডিনারে আমি পান্তা ভাত আর ইলিশ খাবো। বছরে পান্তা না খাওয়া হলে আমি ‘ঘ্যানর-ঘ্যানর’ করে থাকি খেলাম না বলে। বউ সেটা জানে, ফলে তখনই আয়োজন। ভাত যা আছে তাতে আমার একার হয়ে যাবে যেহেতু বউ ভাত খায় না। সন্ধ্যায় শ্যালওট দেশী পিঁয়াজ দিয়ে আবার ডিমও ভাঁজলাম,যেহেতু আর একদিন যোগার যন্তর করবার ঝামেলা আছে। ফলে একই দিনে ডিম ও ইলিশ পান্তা খাওয়া হয়ে গেলো। মাছের সঙ্গে সাদা শরাব ভালো যায়। তাই ধরে নিয়েছি ইলিশের সঙ্গেও তাই এবং আমি একটা ইতালিয়ান পিনো গ্রিজিও ঠাণ্ডা চিল্ড শরাব খুললাম। তো পিনো গ্রিজিও, সানফ্লাওয়ার তেলে ভাজা মরিচ, জলপাই তেলে ভাজা ডিম, ইলিশ মাছ বারেব্বা,এর নাম দিয়েছি ‘ডিনার’। পান্তা ডিনার। বাংলায় ‘ভূখণ্ড অর্থে’ আমাদের পান্তা খাওয়ার কাহিনী ঠিক উচ্চবিত্তের আদিকার দিনকালের সস্তা লোক দেখানো নাটক প্রদর্শন নয়। বরং এ বড় কঠিন সত্য গ্রামের মানুষদের জন্য, এ হচ্ছে ওই জপদের ওই জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা নিবারণ পদ্ধতি মাত্র।

একবার ঠিক কৈশোরত্তীর্ণ কালে একজন বন্ধু নারী বরিশাল যখন জেনেছিলেন যে আমি সকালে পান্তা খাই তার মুখটা মলিন হয়েছিলো। এমন নয় যে যারা পান্তা খায় তাদের প্রতি অবজ্ঞা থেকে, বা তাদের অসহায় ভেবে, এমন ধারণা করে থাকি। হতে পারে যেহেতু পারিবারিকভাবে তার অবস্থান ছিলো আমাদের চাইতে বিত্তশালী, ফলে কোনো ছেলে তার বন্ধু হতে পারে যে কিনা পান্তা খায় সকালের নগরীয় মধ্য ও উচ্চবিত্তেদের প্রথা নাস্তা খাওয়ার বদলে,সেটাই তাকে হতবাক করেছিলো। সেই পান্তা হোচটে ক্ষাণিক দেখা তার অপরূপ মলিন মুখ আমার আজও এক অদ্ভুত বেদনার বিনোদন হয়ে আছে। হতে পারে তার হয়তো উচ্চবিত্তের মনোজগতকে ওই পান্তা তথ্য এক চমকিত বিস্ময় জাগিয়েছিলো যার ছাপ ওই মলিন মুখের অভিব্যক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছিলো। তার জগতে হয়তো এমন কোনো সম্ভাবনা ছিলো না যে, কেউ তার জীবনে বন্ধু হতে পারে যে কিনা পান্তা খায়। সে প্রায় চল্লিশ বছর হতে যাচ্ছে আগের ঘটনা এবং মহাদর্পে আমি এই একটু আগেও পান্তাই খেলামে ঠিক আদি গ্রামীণ মানুষদের মতো। টিক সেই স্বাদ বা তৃপ্তি নেই,যে স্বাদের আশায় এসব পান্তা খাওয়া ঘুটচাল করে থাকি। সেটা স্বাভাবিক, আমার শৈশব ও কৈশোরের গ্রামের এসব অভিজ্ঞতা আর কোনো ক্রমেই পাওয়া হয় না। কিন্তু আমার অবস্থা হলো- ঠিক সে মতোই হোক কিনা হোক তাতে কী? তারপরও পান্তা হলো, ইলিশ হলো, ডিম ভাজা হলো, পোড়া মরিচ হলো এবং এভাবে ডিনার হলো এবং এমন করে আমি কতবার যে হিসাব করে দেখেছি, জীবন হলো আসলে এক বাসি পান্তা ভাত, বাসি ইলিশ, গরম ডিম ভাজা, পোড়া মরিচ আমার ক্ষেত্রে তেলে ভাজা সঙ্গে পিনো গ্রিজিও শরাব। এরই নাম জীবন, যা আগাগোড়া একটা মরে যাওয়ার প্রস্তুতি ছাড়া আরকিছু নয়। চিয়ার্স। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত