প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ঢেউ, এরদোগানের অটোমান সাম্রাজ্যের স্বপ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কনস্টান্টিনোপল বিজেতা মেহমেত দ্য কনকয়ারারের সম্মানে বসফোরাস প্রণালির তীরবর্তী এদির্নে প্রদেশে একটি জাদুঘর নির্মাণ করছে তুরস্ক। যেকোনো মূল্যে চলতি বছরের মধ্যেই এটির নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। বর্তমানে নিজের শাসনামলকে অটোমান রাজত্বের উত্তরাধিকার হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছেন এরদোগান। জাদুঘরটিকে দেখা হচ্ছে এরই প্রতীক হিসেবে।

এরদোগান নিজেও এ দাবি সামনে এনেছেন বারবার। তুরস্কের অটোমান আমলের জৌলুশ ফিরিয়ে আনবেন বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে অটোমান আমলের ঐতিহ্যগুলোকেও ফিরিয়ে আনছেন তিনি। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকেও সাবেক অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোয় তুরস্কের সক্রিয়তার মাত্রা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। বিষয়টিকে পর্যবেক্ষকরা আখ্যা দিচ্ছেন ‘নিও অটোমানিজম’ হিসেবে।

এ নিও অটোমানিজমের কারণেই এরদোগানের পররাষ্ট্রনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের বৈরিতা এখন চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। এরদোগানের উত্থানের আগ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল সৌদি আরব। বর্তমানে এরদোগানের অধীনে সে ভূমিকায় আসতে চাইছে তুরস্ক।

এক সময় গোটা মধ্যপ্রাচ্যই ছিল অটোমান সুলতানদের অধীনে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে তুরস্কের সক্রিয়তা ছিল তুলনামূলক কম। পশ্চিমাঘনিষ্ঠ তুরস্ক ওই সময়ে ইউরোপের ভূরাজনীতিতেই সক্রিয় ছিল বেশি। এরদোগানের আমলে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে তুরস্ক। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি ইস্যুতেই এখন সরব হয়ে উঠেছে দেশটি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবের সঙ্গে কাতারের চলমান বিবাদে দোহার পক্ষ নিয়েছে আঙ্কারা। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই দেশের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর পাশাপাশি অনারব মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেও কঠোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এরদোগান প্রশাসন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এরদোগানের আমলের মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। শুধু আরব-অনারব নয়, শিয়া-সুন্নি বিভাজনকে কাজে লাগিয়েও পরিস্থিতি নিজের আয়ত্তে আনতে চাইছেন তিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রায় সবাই অটোমান উত্তরাধিকার বা ঐতিহ্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এর পরিবর্তনে পশ্চিমাঘেঁষা এবং এক ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিকতার বাতাবরণ তৈরি করে রেখেছিলেন তারা। এরদোগানই প্রথম সে বাতাবরণ ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নিও অটোমানিজমের ক্ষেত্রে এরদোগানের আইকন হলেন অটোমান সুলতান প্রথম সেলিম। প্রথম সেলিম ছিলেন পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনার ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনকারী প্রথম অটোমান সুলতান। এর মধ্য দিয়ে নিজের সাম্রাজ্য ও মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রথম অটোমান হিসেবে একই সঙ্গে সুলতান ও খলিফার পদ ধারণ করেছিলেন সেলিম। অন্যদিকে এরদোগান চাইছেন প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা হিসেবে উভয় পদের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।

তবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো অনারব সুন্নি দেশগুলো এখন শিয়া ইরান ও আরব সুন্নি দেশ কাতারের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। সৌদি-ইউএই-মিসরীয় অক্ষশক্তির মোকাবেলায় এ জোটই এখন এরদোগানের সবচেয়ে বড় ভরসা। বিভাজন আরো জটিল হয়েছে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব দেশ ইরাক ও ইরানের মধ্যকার মৈত্রীতে। সিরিয়া, লেবানন, বাহরাইন ও ইয়েমেনেও এ বিভাজনের প্রভাব এখন স্পষ্ট।

মালয়েশিয়ায় ২০১৯ সালে ২০ মুসলিম দেশের অংশগ্রহণে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বলা হচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন ওআইসির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেই তুরস্কের পৃষ্ঠপোষকতায় সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়েছিল। সম্মেলনে অংশ নেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত রিয়াদের অব্যাহত চাপে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায় পাকিস্তান।

অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক দিন দিন আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে এক গ্রিক সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সরব হয়ে ওঠে। এতে বলা হয়, কাশ্মীরে লড়াই করার জন্য তুর্কি মার্সেনারি পাঠাচ্ছেন এরদোগান। এজন্য তাদের প্রত্যেককে ২ হাজার ডলার করে বেতনও দিচ্ছেন তিনি। অনারব মুসলিম বিশ্বে নিজের আধিপত্য বাড়ানোর তাগিদ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব ও ইউএইর সম্পর্কের উন্নয়ন এরদোগানকে মুসলিম বিশ্বে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে নিজেকে ফিলিস্তিনিদের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করছেন তিনি। যদিও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই প্রথম ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত