প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অনলাইনে আয়ের টোপে আড়াই শ’ কোটি টাকা গায়েব, ডেসটিনি টু ইভ্যালি

নিউজ ডেস্ক: প্রতিদিন আয় ১ থেকে ৫০০০ টাকা। এ্যাকাউন্ট খুললেই ২ ডলার। ইউটিউবে এমন একটি ভিডিও ক্লিপে চোখ আটকে যায় বেসরকারী ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হেনা মোঃ আহসান হাবিবের। সহজেই ঘরে বসে টাকা আয়ের লোভে পড়ে গত ২২ জুলাই ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ‘বাইন্যান্স’-এর মাধ্যমে টু লাইকের একটি আইডি ২৮ হাজার এবং গোল্ড রাশের একটি আইডি ৪০ হাজার টাকায় কেনেন হাবিব। এরপর আয় করা ডলার ‘বাইন্যান্স’ এ্যাপ থেকে লেনদেনও করেছেন তিনি। এই টোপে গত ১৬ আগস্ট আরও পাঁচটি আইডি কেনেন হাবিব। কিন্তু পরদিন ১৭ আগস্ট সকালে টু লাইক ও গোল্ড রাশের ওয়েবসাইটে ঢুকতে গিয়ে দেখেন ওয়েবসাইট দুটি আর নেই। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত আরও যারা ওই দুই ওয়েবসাইটে বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন হাবিব। কথা বলে জানতে পারেন তারাও ওয়েবসাইট দুটিতে আর ঢুকতে পারছেন না। তখন অনলাইন প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন হাবিব। এরপর তিনি যে ইউটিউব চ্যানেলের বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারিত হয়েছেন তার মালিকের বিরুদ্ধে যশোরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

এরপর আহসান হাবিবের করা মামলার তদন্তে নেমে গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভার থেকে ইউটিউব চ্যানেলের মালিক শোভন ইসলাম (২৪) এবং ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর থেকে প্রিন্স হোসেনকে (২১) গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। এরপরই তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সিআইডি জানতে পারে, আহসান হাবিবের মতো লাখো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। ভুক্তভোগী আবু হেনা মোঃ আহসান হাবিব জনকণ্ঠকে জানান, ‘মি. টিস বাংলা’ ও ‘ইনকাম বাংলা’ নামে দুটি ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি টু লাইক ও গোল্ড রাশে বিনিয়োগে উৎসাহ পান। এই ওয়েবসাইট দুটিতে বিনিয়োগ করে তার পরিচিত আরও অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় কেউ প্রকাশ্যে এসে অভিযোগ করছেন না। সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চক্রটি অনলাইনে একইসঙ্গে টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ নামে কথিত তিনটি এ্যাপসের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত আড়াই শ’ কোটি টাকা। তারা ইউটিউবে ডলার আয়ের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে মাত্র দেড় মাসে সারাদেশে লাখের বেশি সদস্য সংগ্রহ করে। যাদের বেশিরভাগই তরুণ। এরপর হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যায় জালিয়াতির জন্য খোলা এসব এ্যাপস ও ওয়েবসাইট।

হাবিবের মতো লাখো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হলেও দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় তারা সংশ্লিষ্ট কোন সরকারী দফতর বা আদালতে অভিযোগ করতে পারছেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির সাইবার ক্রাইম কমান্ড এ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার (সি-৪)-এর অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, ‘সাইবার জগতে যেকোন আর্থিক বিনিয়োগ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। যারা টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ নামে এ্যাপসে টাকা বিনিয়োগ করেছে, তারা তলে তলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করেছে। আমরা জানতে পেরেছি এখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাত্র দেড় মাসে অন্তত আড়াই শ’ কোটি টাকা নিয়ে গায়েব হয়ে গেছে একটি চক্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের বিনিয়োগে কিছু লোক স্বল্প সময়ে লাভবান হলেও দীর্ঘসময়ে বেশি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া এ ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাইক্রোক্রেডিট অথরিটির সব নীতিমালার বাইরে।’

জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতারক চক্র প্রথমে টু লাইক, গোল্ড রাশ বা গোল্ড লাইন এই তিনটির মধ্যে যেকোন একটি এ্যাপস এ্যান্ড্রয়েড ফোনে ইনস্টল করে এ্যাকাউন্ট খুলতে বলে। এসব কথিত এ্যাপসের ওয়েবসাইটও ছিল। সেখানে কোন প্যাকেজে কাজ করবে তার অপশনও ছিল। একেকটি প্যাকেজের একেক দাম। সবচেয়ে দামী প্যাকেজ ৭৪ হাজার এবং সর্বনিম্ন দামের প্যাকেজ ২০ হাজার টাকার। এসব এ্যাকাউন্ট থেকে দিনে সর্বোচ্চ আয় করতে দুই থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগত। চম্পট দেয়ার ১৫ দিন আগে গোল্ড রাশ ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ৩০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত প্যাকেজের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। হঠাৎ সব ধরনের সেবা বন্ধ করে উধাও হয়ে যায় তারা। একই সময়ে উধাও হয়ে যায় গোল্ড লাইন নামের আরেকটি এ্যাপভিত্তিক কোম্পানি। এটির গ্রাহক সংখ্যা ৩০ হাজারের মতো। গত সপ্তাহেই লাপাত্তা হওয়া টু লাইকের কাছে প্রতারিত হওয়া হায়দার বাবু নামের এক ভুক্তভোগী জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ভাই, এমনটা হবে ভাবি নাই। ভাবছিলাম অন্তত জমা দেয়া টাকাটা পামু। টু লাইকওয়ালারা আবার সানটোন নামে কাজ শুরু করছে। জানি, কিন্তু কিছু করতে পারতেছি না।’ কয়েকজন গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবার প্রচারপ্রক্রিয়া প্রায় একই রকম। অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা জানান, ২০ ডলার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ডলারের প্যাকেজ ছিল টু লাইকে। এছাড়া বিন্দাসওয়ার্ক ডটকম নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এটির গ্রাহক সংখ্যাও ছিল ৬০ হাজারের বেশি। ২০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন একেকজন গ্রাহক।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেট বা দেশের অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার হয়নি। প্রতারকরা বাইন্যান্স (ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ) নামের একটি প্ল্যাটফরম ব্যবহার করেছে। বাইন্যান্সে একটি এ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে প্রথমে টাকার সমপরিমাণ ডলার ঢোকায় গ্রাহক। বাইন্যান্স এ্যাপের ভেতরেই পরামর্শ দিয়ে দেয় কারা অনলাইনে ডলার বিক্রি করে। এদের মাধ্যমে গ্রাহক তার বাইন্যান্স ওয়ালেটে টাকার বিনিময়ে ডলার ঢোকায়। এরপর টু লাইক, গোল্ড রাশ বা গোল্ড লাইন এ্যাপসে বিনিয়োগকারীকে বাইন্যান্সের কিউআর কোডটি দিয়ে দেয় চক্রটি। সেই এ্যাকাউন্টে প্যাকেজ অনুযায়ী টাকার সমপরিমাণ ডলার পাঠিয়ে দেয় গ্রাহক। বিনিয়োগকারী ওই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই বাইন্যান্স এ্যাকাউন্ট থেকে সমপরিমাণ ডলার চলে যায়। এরপরই এ্যাকাউন্ট চালু হয়ে যায়। ওই এ্যাকাউন্ট থেকে ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনে ক্লিকের কাজ করা শুরু করে গ্রাহক। দিন শেষে অর্জিত ডলার গ্রাহক তার বাইন্যান্স এ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে এবং ক্যাশ আউট করার সুযোগ থাকে। এদিকে দেশের কিছু ইউটিউব চ্যানেলের মালিক প্রতারণার ওই পুরো প্রক্রিয়াকে প্রমোট (প্রচার) করেছেন। টাকা মেরে এ্যাপসগুলো গায়েব করা হলেও এখনও অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল এই এ্যাপসগুলো থেকে টাকা কামানোর উপায় সংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।

জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টু লাইকিতে ক্লিকেই ডলার আয়ের বিজ্ঞাপন এখনও প্রচার করছে জিকস টিচ, প্রফুল্ল ড্রিম, ইজি সোশ্যাল টিপ, টিচ অল২৪সহ বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেল। গোল্ড রাশের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এ্যাপস কারিকুলাম বিডি, অনলাইন জবস বিডি, টি টিচ বাংলা, বিডি আর্ন মানি, টেকনিক্যাল ৩৬০ ডিগ্রী ও মানি মিনিং টিচ নামের ইউটিউব চ্যানেল। গোল্ড লাইনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ক্রিয়েটিভ টিভ, এসআর মাল্টি মিডিয়া, টিচ বিডি প্রো ও মুরসালিন অফিশিয়ালসহ অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল। গত কয়েক দিনে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিডি লাইক, ইফোর্ডবিডি, জিওনেস, লাইক এইচএমপি ওয়ার্ল্ড, টু লাইক ওয়েব, বিডি ক্যাশ রিওয়ার্ডস, স্টারস ফেয়ার২৫.কম, ওয়ালমার্ট গ্রুপ, জিএসসিবিডি, ইউকে লাইক, টু লাইকসিজি, এয়ারড্রপ, ল্যাকবিট। সূত্র: যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত